মিয়ানমার, তুরস্কের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৫১ এএম

বাজারে আসতে থাকা মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ কমতে থাকার পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের শঙ্কা পেঁয়াজ নিয়ে ভোগান্তি চলতে পারে আরও দুই মাস। মূলত দেশি কয়েকটি দেশের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবং কয়েকটি দেশে পণ্যটির রপ্তানিমূল্য

কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে মার্চ নাগাদ দেশি পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করলে ভোক্তাদের স্বস্তি মিলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে গত সপ্তাহে বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৮ টাকা বেড়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা এখন যে দামে অপরিশোধিত সয়াবিন আমদানির (ঋণপত্র) এলসি খুলছেন, তাতে বর্তমানের চাইতে প্রতি লিটার ২১ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হবে তাদের। অর্থাৎ তখন প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম দাঁড়াবে ১৩১ টাকা। এ অবস্থায় ভোক্তাদের ওপর বাড়তি দামের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার, আমদানি মূল্যের পরিবর্তে টনপ্রতি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপসহ সরবরাহ ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট মওকুফের সুপারিশ করেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাজারে আসতে থাকা মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। পাশের দেশ মিয়ানমারও পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, তুরস্কও এখন আর রপ্তানি করছে না। একমাত্র মিসর ও চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ থাকলেও এসব দেশে গত দুই মাসে পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য টনপ্রতি ২৫০ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫০ ডলারে উঠেছে। ফলে পেঁয়াজের বাজার ফের অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে পণ্যটির এলসি খুললেও তা দেশে এসে পৌঁছতে সময় লাগবে অন্তত দেড় মাস। এ অবস্থায় গত রবিবার রাতে বাণিজ্যমন্ত্রীর বাসায় পেঁয়াজসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈঠক করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীন দপ্তরপ্রধানরা। তাতে সারা দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হলেও খুব একটা উপায় বের করতে পারেননি তারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যমন্ত্রীর বাসার ওই বৈঠকে বাণিজ্য সচিব, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রতিযোগিতা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে আমদানি মূল্য ও স্থানীয়ভাবে ক্রয়মূল্যের চেয়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারে অনেক বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি প্রতিরোধের বিষয়ে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দোকানে প্রকাশ্য স্থানে কেনা ও বিক্রয়মূল্য লিখে রাখতে হবে এবং ক্রেতা দেখতে চাইলে রসিদ দেখাতে হবে। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিতে পারে। তাই ক্রেতাদের ক্রয় রসিদ দেখানোর বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসার পক্ষে মত দেন মন্ত্রী। তবে বাজারে অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তিনি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অযৌক্তিকভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর দায়ে ৮ হাজার ১৫৬ জন অসাধু ব্যবসায়ীকে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এদিকে পেঁয়াজের বেসামাল বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে বাণিজ্যমন্ত্রীকে সাহস দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। রবিবার অর্থমন্ত্রী ফোন করে বাণিজ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, দাম যতই হোক দ্রুত পেঁয়াজ আমদানি করুন। পেঁয়াজ আমদানিতে যত ভর্তুকিই লাগুক, অর্থ মন্ত্রণালয় তা দেবে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২ জানুয়ারি বৈঠকে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও এসআলম গ্রুপকে দেড় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করে দেওয়ার অনুরোধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সে মোতাবেক এসব গ্রুপ আন্তর্জাতিক বাজারে খোঁজখবর নিয়ে জানিয়েছে যে, এখন শুধু চীন ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা সম্ভব। তুরস্ক ও মিয়ানমার রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। চীন ও মিসরের পেঁয়াজ দুই মাস আগেও সর্বোচ্চ ২৫০ ডলার টন ছিল, এখন তা ৮৫০ ডলার। চড়া দামেও আপত্তি নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সমস্যা হলো, এখন এলসি খুললেও ওই পেঁয়াজ দেশে আসতে দেড় মাস লাগবে। ততদিন পেঁয়াজ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।

বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আবদুল লতিফ বকসী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি বাজারে পর্যাপ্ত দেশি ও আমদানি পেঁয়াজের মজুদ রয়েছে। পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কোনো সংগত কারণ নেই। বাজারে পেঁয়াজ, তেলসহ নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মূল্য তদারকির জন্য ব্যাপকভাবে অভিযান চালানো হবে। জেলাপ্রশাসন দেশব্যাপী এ অভিযান জোরদার করবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি মূল্য, ক্রয় মূল্যের চালান বা রসিদ সংরক্ষণে রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দোকানে বিক্রয় মূল্যের তালিকা টানিয়ে রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইতিপূর্বে সিটি, মেঘনা ও এসআলম গ্রুপ মিসর ও তুরস্ক থেকে যে পেঁয়াজ আমদানি করেছে, তার বিপুল পরিমাণ এখনো মজুদ আছে। টিসিবি প্রতিদিন তিন টন করে পেঁয়াজ ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করছে। যে পরিমাণ মজুদ আছে, তাতে আগামী রোজা পর্যন্ত পেঁয়াজের সংকট হবে না টিসিবির। তবে কৌশলগত কারণে মজুদের পরিমাণ জানাতে রাজি হননি তিনি। তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা : দেশে ভোজ্যতেলের মিলমালিকরা এখন ৮৫০ ডলার দরে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির এলসি খুলছেন। এ তেল দেশের বাজারে ঢুকলে বিদ্যমান অন্যান্য খরচ যুক্ত করে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ১২৪ টাকা পড়বে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। মিলমালিকদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যালোচনা করে এক প্রতিবেদনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এ তথ্য জানিয়েছেন কমিশনের সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান। ওই প্রতিবেদনের একটি কপি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছে দেশ রূপান্তর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৩৫ ডলার দরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে, যা এখন প্রক্রিয়াজাত হয়ে বাজারে সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। বিদ্যমান রাজস্ব নীতির কোনো পরিবর্তন না হলে এই তেল পরিশোধন শেষে বোতলজাত হয়ে বাজারে বিক্রি করলে প্রতি লিটারের দাম পড়বে ১১৮ টাকা ২৩ পয়সা।

ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা এলসি খোলা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের এলসি মূল্য ছিল ৭৮৬ ডলার। এ তেল পরিশোধন করে বোতলজাত করার পর বাজারে ছাড়লে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম পড়বে ১২৪ টাকা ১ পয়সা।

আর মিলগুলো এখন প্রতি টন ৮৫০ ডলার দরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল বুকিং দিচ্ছে। এ তেল দেশে আসার পর প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে ছাড়া হলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম পড়বে ১৩১ টাকা ২৭ পয়সা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ভ্যাট কাঠামোতে আমদানি, উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। ইতিমধ্যে আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন তেল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট মওকুফ ও সরবরাহ এবং খুচরা বিক্রয়ে কমিশন ৮ টাকা নির্ধারণ করা হলে বোতলজাত সয়াবিনের মূল্য প্রতি লিটারে ১০৮ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

মিলগুলো এখন যে দামে এলসি খুলেছে তা প্রক্রিয়াজাত করলে বোতলজাত সয়াবিনের মূল্য দাঁড়াবে লিটারে ১২৪ টাকা। তবে ভ্যাট মওকুফ, অগ্রিম কর মওকুফ ও কমিশন ৮ টাকায় নামিয়ে আনা গেলে দাম ১১০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিশোধিত তেলের আমদানি মূল্য আরও বাড়লে বোতলজাত সয়াবিনের দাম আরও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ভ্যাট ও অগ্রিম কর মওকুফ ও কমিশন ৮ টাকায় নামিয়ে আনলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ১১৫ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ অবস্থায় ট্যারিফ কমিশন সুপারিশ করেছে যে, ভোজ্যতেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট মওকুফ এবং সরবরাহ ও খুচরা বিক্রয়ে কমিশন ৮ টাকা নির্ধারণে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বাড়তি মূল্য বিবেচনায় এনে সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে ভ্যাট মওকুফের সঙ্গে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর মওকুফ করা যেতে পারে। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকলে আমদানি মূল্যের পরিবর্তে টনপ্রতি ভ্যাট নির্ধারণ করা যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত