জীবনযাত্রার ব্যয় ও বসবাসযোগ্যতার দ্বৈরথ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২০, ১১:২১ পিএম

ঢাকা মহানগর যেন এক অসহনীয় জাঁতাকল। এখানে বসবাস করা, চলাফেরা, লেখাপড়া, চিকিৎসা সবকিছুর ব্যয়ই দিন দিন বাড়ছে। মুদির দোকান থেকে কাঁচাবাজার, বিপণিবিতান যারা যান সবাই-ই তা জানেন। বাড়িভাড়া, নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে গণপরিবহনের ভাড়া সবকিছুতে বাড়তি ব্যয় করেও থাকতে হয় এক বিশৃঙ্খল ও দূষিত নগরে; যেখানে নাগরিক পরিষেবা থেকে শুরু করে বসবাসের পরিবেশ সবকিছুর মান অধোমুখী। এজন্য কোনো গবেষণা কিংবা পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। অবশ্য না চাইলেও সব পরিসংখ্যান সামনেই আছে। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলোÑ ঢাকা মহানগরের এই নিদারুণ বাস্তবতা এতটাই প্রকট যে নাগরিক সমাজ, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা কিংবা সরকারে মন্ত্রীরা পর্যন্ত সবাই এ বিষয়ে প্রায় একমত। পেছনে ফেলে আসা ২০১৯ সালের কিছু প্রতিবেদন-পরিসংখ্যান-মন্তব্য-বিবৃতি দেখে নিলেই লাগাতার জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি আর বসবাসযোগ্যতার বিচারে ঢাকা মহানগরের পশ্চাৎমুখী অবস্থানের দ্বৈরথ স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। 

 

গত মঙ্গলবার কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রাজধানী ঢাকার ১৫টি বাজার থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও ১৪টি সেবার তথ্য পর্যালোচনা করে ক্যাব এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের জীবনযাত্রায় ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। আর পণ্য ও সেবামূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালে এসব ক্ষেত্রে ব্যয়বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৬ শতাংশ ও ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এই হিসাব শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয়বহির্ভূত। অন্যদিকে, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক পর্যালোচনায় উঠে আসে, গত এক বছরে পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও নানা সুস্বাদু মসলার দাম সাড়ে চার শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি আগুনের ওপর বসে রয়েছেন এবং দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ না থাকা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ নেওয়ায় মানুষ তার পদত্যাগ চাচ্ছে।    

 

ক্যাবের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯ সালে শাক-সবজির দাম বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ, গরু-খাসির মাংসের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। তরল দুধের দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ, চা পাতার দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। খেজুর গুড়ের দাম বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ,  নারিকেল তেলের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। দেশি থান কাপড়ের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ; বিদেশি থান কাপড়ের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ; গেঞ্জি, গামছা, তোয়ালের দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। একই সময়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বাড়িভাড়া বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। বস্তির ঘরভাড়া ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও মেসের ভাড়া বেড়েছে ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। বাসাবাড়িতে বার্নার গ্যাসের চুলার ব্যয় বেড়েছে ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ওয়াসার পানির দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। কিন্তু হাইওয়ে সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি তেলের মূল্য কমলেও যাত্রী ও পরিবহন ব্যয় কমেনি।  দেশে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ ঘটলেও চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের দাম দুটোই বেড়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪২টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করলেও দেশে ব্যাপকভাবে নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। 

 

এভাবে লাগাতার ব্যয় বাড়লেও ঢাকায় মানুষের জীবনমান কি বাড়ছে কিংবা বসবাসের পরিবেশ কি উন্নত হচ্ছে? দুঃখজনকভাবে এর উত্তরÑ না। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক গবেষণা বলছে, বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে ঢাকা। আর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছেÑ বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এদিকে, গত বছরের শেষদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীও বলেছেন, ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।  পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত আট বছর ধরে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজের কারণে ক্রমাগত বায়ুদূষণ বাড়ছে ঢাকায়। 

 

প্রশ্ন হচ্ছে, এসব গবেষণা, পরিসংখ্যান কিংবা বক্তব্য-বিবৃতি থেকে কতটা শিক্ষা নিচ্ছি আমরা? সংকটের প্রতিকারেই বা কী করছে সরকার? অতিরিক্ত মুনাফার কাছে লাঞ্ছিত ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কি জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে? সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করতে কি ক্যাবের দাবি অনুসারে ‘ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করা হবে?

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত