শুধু সচিবালয়ে ব্যর্থ হয়ে বৃত্ত আরও বড় করছে সরকার

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৫৯ এএম

হর্ন বাজানো নিষিদ্ধের বর্তমান এলাকাটি খুবই ছোট। রাজধানীতে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের তিন পাশের রাস্তায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করেছে সরকার। পূর্ব পাশের মুক্তাঙ্গনের সামনের রাস্তায়, দক্ষিণে ওসমানী মিলনায়তনের সামনে ও পশ্চিমে শিক্ষা ভবনের সামনের রাস্তায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়। ছোট জায়গায় সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে ব্যর্থ হলেও নিষিদ্ধের বৃত্তটি আরও বড় করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হর্ন বাজানো নিষিদ্ধের এলাকাটি ছোট হওয়ার কারণেও কিছু সমস্যা হয়েছে। গাড়িচালকরা বুঝতে না বুঝতেই সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে হর্ন বাজাচ্ছেন। এলাকাটা বড় হলে এ সমস্যা হবে না। আমরা পরবর্তী বৈঠকে এলাকাটি সম্প্রসারণ করব। দক্ষিণে গুলিস্তান, উত্তরে পল্টন বা কাকরাইল মোড় আর পশ্চিমে বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করি।’

এদিকে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধের বিষয়টি কার্যকর করতে না পারার তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পুলিশের অসহযোগিতা। সময়মতো প্রয়োজনীয় পুলিশ পাওয়া যায়নি। তাদের অভিযোগ পুলিশের পক্ষ থেকে সাড়া ছিল খুবই কম। পুলিশ না পাওয়ার কারণে এক দিন আনসার সদস্যদের সহায়তায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এরপরই বিষয়টি হাস্যকর পর্যায়ে নেমেছে। পরিবেশমন্ত্রী শাহাবউদ্দিন প্রয়োজনীয় পুলিশ দেওয়ার জন্য নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে অনুরোধ করেছেন। তারপরও পুলিশের সহায়তা পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল কম। অধিদপ্তরে মাত্র দুজন ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন। এনফোর্সমেন্ট শাখার এ দুই ম্যাজিস্ট্রেটকে ঢাকার চারপাশের অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হচ্ছে। তাদের পক্ষে নিয়মিত সচিবালয়ের সামনে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আর ব্যর্থতার তৃতীয় কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন স্থাপনা হিসেবে সচিবালয়কে বেছে নেওয়া ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালকে বেছে নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের সাড়া আরও বেশি পাওয়া যেত বলে তারা মনে করছেন।

গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে সচিবালয়ের চারপাশে গাড়ির হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। গত নভেম্বরে এ ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েকটি প্রস্তুতি সভা করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রস্তুতি সভা করলেও সার্বিক প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। যে পরিমাণ প্রচার দরকার ছিল তা হয়নি। গণমাধ্যমগুলো নিজ থেকে যেটুকু প্রচার করেছে তাতেই সীমিত ছিল প্রচার। এ কারণে নিষিদ্ধের বিষয়টি বেশিরভাগ চালকেরই ছিল অজানা।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১৭ ডিসেম্বর থেকে গত ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তামজীদ আহমেদ এবং মো. মাকছুদুল ইসলাম এসব আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় ৬৪ ব্যক্তিকে ১৪ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালত জরিমানার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই শৈথিল্য দেখিয়েছে। জরিমানা পরিশোধ করতে না পারলে জেল-হাজতে পাঠানোর কথা। কিন্তু আইনভঙ্গের দায়ে কোনো আসামিকে জেলহাজতে পাঠানো হয়নি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বা পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সচিবালয়কে নীরব এলাকা বা হর্নমুক্ত এলাকা ঘোষণা করায় সরকারকে ধন্যবাদ। শব্দদূষণ যে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে তা সরকার বুঝতে পেরেছে। কিন্তু শুধু সচিবালয়ের চারপাশে হর্ন বাজানো যাবে না এটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনতে হবে। সচিবালয়ের চারপাশে হর্ন বাজানো যাবে না তাহলে কি হাসপাতালের সমানে হর্ন বাজানো যাবে? আসলে কিছু নির্দিষ্ট জায়গা আছে যেখানে হর্ন বাজানো যাবে না। ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে কোথায় হর্ন বাজানো যাবে আর কোথায় যাবে না। বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করা হয়েছে ২০০৬ সালের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায়। এত সুন্দর আইন ও বিধি থাকতে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি। এসব আইন ও বিধির প্রয়োগ হলেই শব্দসন্ত্রাস বন্ধ হবে। সময় এসছে এ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। কারণ এক-তৃতীয়াংশ মানুষ শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে। সর্বস্তরে শব্দদূষণের ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত করা না হলে সুফল পাওয়া যাবে না। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই শব্দদূষণের মতো নীরব ঘাতককে রুখে দেওয়া সম্ভব।’

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সালের আলোকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধিমালায় শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ এলাকার মধ্যে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প বা নীরব এলাকা চিহ্নিত করে স্ট্যান্ডার্ড সংকেত বা সাইনবোর্ড স্থাপন ও সংরক্ষণ করার কথা। যাতে করে মানুষ বুঝতে পারে সে কোথায় কী করতে পারবে। নীরব এলাকা অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, উপাসনালয় রয়েছে এমন এলাকায় চলাচলের সময় যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো যাবে না।

এদিকে আইন অমান্য করলে প্রথমবারের অপরাধের জন্য এক মাস কারাদন্ড বা অনধিক ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড আরোপ করা যাবে। পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ দেখা যায় না। আইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ আরও কিছু বিষয়ে ব্যতিক্রম আছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে শব্দের মানমাত্রা পরিমাপবিষয়ক জরিপ করা হয়েছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, নির্ধারিত সব স্থানেই শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেল শব্দে সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট আর ১০০ ডেসিবেলে চিরতরে তা হারাতে হতে পারে। অথচ রাজধানী ঢাকার অনেক জায়গাতেই শব্দ ১০৭ ডেসিবেল পর্যন্ত ওঠে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) গত বছর ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, নীরব এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে দেড় থেকে দুইগুণ, আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা দেড়গুণ ও রাতে শব্দের মাত্রা দেড় থেকে প্রায় দুইগুণ, মিশ্র এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা দেড়গুণ ও রাতে শব্দের মাত্রা দেড় থেকে দুইগুণেরও বেশি। এছাড়া বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা দেড়গুণ বেশি। নীরব এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ইডেন মহিলা কলেজের সামনে, ১০৪ দশমিক ৪ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পল্টনে ১০৫ দশমিক ৫ ডেসিবেল। আর রাতে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি কলাবাগানে ১০৬ দশমিক ৪ ডেসিবেল। অন্যদিকে বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে, ১০৮ দশমিক ৯ ডেসিবেল।

বিশ^সাস্থ্য সংস্থার মতে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, বধিরতা বাড়ে, হৃদরোগ হয়, মেজাজ খিটখিটে থাকে। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকা সন্তানও শব্দদূষণে ক্ষতির শিকার হয়। বয়স্ক এবং রোগীরা এই শব্দদূষণের বড় শিকার। বিশেষ করে হার্টের রোগীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এছাড়া শব্দদূষণের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে। কারণ শব্দদূষণে মেজাজ খিটখিটে ও মনোযোগ নষ্ট হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত