ব্যাংকার্স মিটিং আজ

সরকারের ঋণ বাড়ছেই উল্টো চিত্র বেসরকারিতে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:২৫ এএম

আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকলেও ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে সরকার ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনাসহ নানা উদ্যোগের কথা বললেও তা হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিতে গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ও চলতি বছরের জুন শেষে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাক্কলন করা হলেও ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে সরকার পুরো বছরে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫ মাস ২৯ দিনেই নিয়ে গেছে ৪৬ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড বাদে সব ধরনের ব্যাংক ঋণে ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় খুঁজতে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) নিয়ে আজ বৈঠকে বসছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির। সভাটি ব্যাংকখাতে ‘ব্যাংকার্স সভা’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটারি পলিসি ডিপার্টমেন্ট থেকে তৈরি করা আজকের সভার কার্যপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ায় চিন্তিত বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অবস্থায় সভায় ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। যদিও ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করছেন, এপ্রিল থেকে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর হলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ ব্যাংক মালিকদের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সব ধরনের ঋণে ৯ শতাংশ ও আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর করতে কঠোর নির্দেশনা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ব্যাংর্কার্স সভায় গভর্নর ক্ষোভ প্রকাশের পর ঋণ ও আমানতের সুদহার এক অঙ্কে নামেনি।

মুদ্রা ও ঋণ পরিস্থিতি তুলে ধরে সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, আগের অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ১৩ শতাংশ। ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ আর জুন পর্যন্ত প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকারি খাতের ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে গত ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাস ২৯ দিনে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারি খাতে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা। অথচ ১২ মাসে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও কাক্সিক্ষত মাত্রায় রাজস্ব আহরণ না হওয়া সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধির কারণ বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া প্রসঙ্গে কার্যপত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সার্বিক ঋণ প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলেছে। সার্বিক ঋণ প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বরের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধারা নিম্নমুখী রয়েছে। ২০১৯ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ১৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মুদ্রানীতিতে প্রক্ষেপিত ডিসেম্বরে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ও জুনে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ নিরুৎসাহিত করা ও বিদ্যমান কুঋণের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতামূলক ও সংযত নীতি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমাতে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্যশস্যের ভালো উৎপাদন ও বিশ্বমন্দার কারণে রপ্তানি চাহিদা হ্রাসের কারণে আমদানি ব্যয় কমেছে। এটিও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

সুদহার পরিস্থিতি সম্পর্কে কার্যপত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম ছিল। এ কারণে সুদহার পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। গত ডিসেম্বর শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত রিজার্ভের (দৈনিক ভিত্তিক সিআরআর ৫ শতাংশ অনুযায়ী) পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ফলে ডিসেম্বর শেষে আন্তঃব্যাংক কলমানি সুদহার দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশেরও কম। আন্তঃব্যাংক কলমানি সুদহার বাড়লেও তার সুদহার করিডোর (রেপো ৫.৭% ও রিভার্স রেপো ৬%) এর মধ্যে থাকায় অর্থবাজারে তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে চলতি অর্থবছর কলমানি সুদহারের পাশাপাশি আমানত সুদহারেও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, গত অক্টোবর শেষে ভারিত গড় আমানত ও ঋণের সুদহার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গত জুন শেষে ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এ সময়ে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (ইন্টারেস্ট রেট স্প্রেড) কিছুটা কমেছে। মূলত সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদহার বিদ্যমান থাকার কারণে ব্যাংক আমানত প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী প্রবণতা রোধে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়াতে অনেকটা বাধ্য হয়। এখন আমানতের সুদহার না কমিয়ে পরিচালন ব্যয় হ্রাস ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর আরও তৎপর হওয়া জরুরি বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ, আমদানি ব্যয় কমেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তা সত্ত্বেও এ সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২৪০ কোটি ডলার। ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স আরও বৃদ্ধি ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হওয়ার আশা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, নিকট ভবিষ্যতে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে আরও উন্নতি হবে।

নভেম্বর শেষে সার্বিক লেনেদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার, এটি আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি কমলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টাকার বিনিময় হারের ওপর এখনো চাপ অব্যাহত রয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা সাড়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান। একই সময়ে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য দাঁড়ায় ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮৩ টাকা ৯৫ পয়সা। টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে গত ১ জুলাই থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে ৪২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত