পথদ্রষ্টা জহুরুল ইসলাম

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৪০ এএম

বাংলাদেশের ‘সেরা ধনী’ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত নাম জহুরুল ইসলাম। দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতের পথ প্রদর্শক তিনি, যার কর্মগণ্ডি ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন রুবেল

বাংলাদেশের বড় ধনী কে? অনেকেই ছোটবেলা থেকে এ প্রশ্নের উত্তরে দু’ শব্দের একটি নামই শুনে আসছেন। তা হলো ‘জহুরুল ইসলাম’। পাকিস্তান আমল থেকে তাকে বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের সবচেয়ে বড় শিল্পপতি ও সবচেয়ে বড় ধনী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পদের পরিমাণ নিয়ে কথা উঠলেও কোনো মাপজোখ ছাড়াই নিঃসন্দেহে এখনো দেশের অনেক মানুষই জহুরুল ইসলামকেই বড় ধনী মনে করেন। সম্পদের দিক থেকে বড় শিল্পগ্রুপের নাম বলতে গেলে তার প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপের সঙ্গে নাম চলে আসবে আরও অন্তত ডজনখানেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের। তবে বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যবসায়ী হিসেবে জহুরুল ইসলামের নাম দেশের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
জহুরুল ইসলামের জন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারে। জন্মগতভাবেই জহুরুল ইসলাম এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ধারক ও বাহক। মুঘল আমলের মধ্য ভাগে জহরুল ইসলামের পূর্বপুরুষ তিন ভাই  বাজেত খাঁ, ভাগল খাঁ ও দেলোয়ার খাঁ মুঘলশাহের দরবারি আমলা হয়ে এই এলাকায় আসেন। পরে বাজেত খাঁর নামানুসারে বাজিতপুর, ভাগলখাঁর নামানুসারে ভাগলপুর ও দেলোয়ার খাঁর নামানুসারে বর্তমান দিলালপুর নামকরণ হয়। জহুরুল ইসলাম ভাগলখাঁর পরিবারের ত্রয়োদশ বংশধর। তার জন্ম কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার ভাগলপুরে ১৯২৮ সালের আগস্টে। তার পিতা আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন জেলার পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৮ সাল থেকে টানা ১০ বছর বাজিতপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। শৈশবে জহরুল ইসলামকে সবাই ‘সোনা’ বলে ডাকত ও যৌবনে পরিচিতরা ‘জহুর ভাই’ বলে সম্বোধন  করত। আর ব্যবসা ক্ষেত্রে সবার কাছে ‘চেয়ারম্যান সাহেব’ হিসেবে পরিচিতি পান জহুরুল ইসলাম।
ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জহুরুল ইসলাম ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। নিজের মেধা, সততা, একনিষ্ঠতা, আত্মবিশ্বাস, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে তার ব্যবসার বিস্তার ঘটান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের দুয়ারও খোলে তার মাধ্যমে। শুধু বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানেই নয়, তার জনহিতের হাত প্রসারিত হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, ব্যাংক, কৃষিতে।
জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশের মানুষদের শিখিয়েছেন কীভাবে পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করে মানুষের উপযোগী সব সুযোগ সুবিধা সংবলিত আধুনিক মানের শহর করা যায়। অপরিকল্পিত, দূষণযুক্ত, রাস্তাবিহীন শহরের বিপরীতে তিনি প্রথম গড়ে তুলেছেন বেশ কিছু আবাসিক প্রকল্প, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। তার প্রতিষ্ঠত ইস্টার্ন হাউজিং লি:, ইস্টার্ন টাওয়ার, ইস্টার্ন ভিউ, ইস্টার্ন পয়েন্ট, ইস্টার্ন ভেলি, ইস্টার্ন নিকুঞ্জের মাধ্যমে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে  বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন লাখ লাখ পরিবারকে। শহরের আশপাশে গড়ে তুলেছেন পল্লবী ইস্টার্ন মল্লিকা, আফতাব নগর আবাসিক প্রকল্প, রূপনগর আবাসিক, গোরান, বনশ্রী, নিকেতন, মহানগর, গাড়াডোগা, মাদারটেক, মায়াকুঞ্জ নামে আবাসিক প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ছোট, বড়, মাঝারি আকারের কয়েক হাজার প্লট রয়েছে। সে সব প্রকল্পে একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, শিশুপার্ক, সুপার মার্কেটসহ নানা নাগরিক সুবিধা রাখা হয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, ঢাকার নগরায়ণে একটা বড় অংশে জহিরুল ইসলাম অবদান অনেক। তিনি প্লট, ফ্ল্যাটের পাশাপাশি ঢাকা শহরে প্রাণকেন্দ্র গড়ে তোলেন ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, ইস্টার্ন প্লাসের মতো অত্যাধুনিক এসি মার্কেট। জহুরুল ইসলাম ঢাকার অদূরে সাভারে ১২’শ একর ও পাশেই ১৫’শ একর জমি খরিদ করেন।
এ আবাসন ব্যবসায়ী দেশের পাশাপাশি আবুধাবিতে ৫ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাকে বৈজ্ঞানিক প্রদ্ধতিতে অত্যাধুনিক ইট তৈরির কারখানা। ইরাকে বিখ্যাত সিটি সেন্টার ও আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মাজার শরিফ কমপ্লেক্সের পাশে একটি আধুনিক মানের গেস্ট হাউসসহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন। এই সময় তিনি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের শ্রমিক নেওয়ার পথ উন্মুক্ত করেন। মধ্যপ্রচ্যে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন।
তার নিজ জন্মস্থান বাজিতপুর হয়ে উঠেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাঝারি শিল্পের নগরী, কৃষি খাতে এনেছেন আমূল পরিবর্তন।
দেশবরেণ্য এ ব্যবসায়ী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বিনয়ী মিশুক ও দুরন্ত প্রকৃতির। সমবয়সীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো এবং খেলাধুলায় ছিল খুব আগ্রহ। গরিব দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করার স্বভাব ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিনের জন্য সরারচর শিবনাথ হাই স্কুলে পড়েন। সেখান থেকে স্কুল পরিবর্তন করে বাজিতপুর হাই স্কুলে ভর্তি হন। লেখাপড়ার এক পর্যায়ে চাচার সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। সেখানে রিপন হাই স্কুল থেকে ইংরেজি মিডিয়ামে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করে বর্ধমান কলেজে ভর্তি হন। পরে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হয়ে মেধা থাকা সত্ত্বেও  খরচ জোগাড় করতে না পারার কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা হয়নি তার।
১৯৪৮ সালে ৮০ টাকা মাসিক বেতনে সিঅ্যান্ডবি’র ওয়ার্ক অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে তিন বছর চাকরি করেন। এরপর তিনি নিজে ছোটখাটো ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। তিনি সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা সিটি করপোরেশন ভবন, হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল, জীবন বীমা ভবন, সাধারণ বীমা ভবন, টোয়েটা ভবনসহ বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ছাড়াও তিনি নাভানা গ্রুপ লিমিটেড, আফতাব অটোমোবাইলস, নাভানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ঢাকা ফাইবার্স লিমিটেড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড, দি মিলনার্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, ইস্টার্ন এস্টেটস লিমিটেড, ভাগলপুর ফার্মস লিমিটেড, এসেনশিয়াল প্রডাক্টস লিমিটেড, ইসলাম ব্রাদার্স প্রোপার্টিজ লিমিটেড, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড, আফতাব ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড, আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড রয়েছে তার। তিনি নিজ জন্মস্থান বাজিতপুরের মানুষদের কর্মস্থানের জন্য বাজিতপুরে গড়ে তোলেন অর্ধশতাধিক ফার্ম। জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, নার্সেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, আফতাব উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেগম রহিমা খাতুন গার্লস হাই স্কুল।
জানা যায়, শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম ১৯২৮ সালে ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামের মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন বাজিতপুর পৌরসভার সালের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১১ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। জহুরুল ইসলামের এক ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম (বাবলু) আর চার মেয়ে সাইদা ইসলাম (বেবী), মাফিদা ইসলাম (শিমি), নাইমা ইসলাম (ইমা), কানিতা ইসলাম (কানিতা)। দেশের শিল্প বিস্তারে ভূমিকা রাখে এ দেশবরেণ্য শিল্পপতি ১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর ৬৭ বছর বয়সে মারা যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত