বাস-ট্রাকসহ গণপরিবহনের চালক ও তার সহযোগীদের (ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর) ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এ টেস্ট করাতে হবে। টেস্টে মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া কাউকে নিয়োগ দিতে পারবেন না পরিবহন মালিক। এছাড়া বিভিন্ন সময় সড়কে যানবাহন থামিয়ে চালক ও কন্ডাক্টরদের ডোপ টেস্ট করতে পারবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এসব বিধান রেখে ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০১৯’-এর খসড়া তৈরি করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বিধিমালায় সারা দেশের গণপরিবহনের চালক ও তার সহযোগীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। তবে এতে আপত্তি জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। তাদের যুক্তি, দুর্ঘটনার পর এমনিতেই চালকসহ ওই গাড়ির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জনরোষের মুখে পড়েন। শরীরে নির্দিষ্ট পোশাক থাকলে জনগণ খুব সহজে চিহ্নিত করে তাদের মারধর করতে পারবে।
ইতিমধ্যে খসড়া নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সাত দিনের মধ্যে লিখিত মতামত দিতে বলেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে বিধিমালা জারি করা হবে বলে গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
তিনি জানান, বিধিমালার খসড়ায় ড্রাইভার ও কন্ডাক্টরদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পরিবহন মালিকরাই তাদের ডোপ টেস্ট করাবেন। বিধিমালায় ড্রাইভার-কন্ডাক্টরদের নির্দিষ্ট পোশাকের কথা বলা হলেও তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মালিকরা। এখন তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো থেকে সাত দিনের মধ্যে লিখিত মতামত চেয়েছেন। এটি পাওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র দিয়ে শিগগিরই বিধিমালা জারি করা হবে বলে জানান সচিব।
২০১৮ সালে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর ব্যাপক আন্দোলন হয়। নিরাপদ সড়ক চাই নামে ওই আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাস করে সরকার, যা বিধিমালা ছাড়াই গত বছর নভেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে। তবে বিধিমালা না থাকায় মাঠপর্যায়ে আইনটি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের জন্য। এ প্রেক্ষাপটে জরুরিভাবে বিধিমালার খসড়া তৈরির পর তা চূড়ান্ত করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
এ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত করতে গত ২১ জানুয়ারি সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সেখানে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে সিভিল সার্জন নির্ধারিত অন্যান্য চিকিৎসকের মাধ্যমেও এটি করার সুযোগ চান মালিকরা।
সভায় বিধিমালায় চালক ও তার সহযোগীদের নির্দিষ্ট পোশাকের বিরোধিতা করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, খসড়া বিধিমালার ৬৭(ঞ) ধারায় চালক ও কন্ডাক্টরদের নির্দিষ্ট পোশাক পরার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চালক ও কন্ডাক্টররাই সবচেয়ে বেশি জনরোষের শিকার হয়। সে ক্ষেত্রে পোশাক নির্দিষ্ট করলে তাদের ওপর জনআক্রোশ বাড়বে। তাই বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।
বাংলাদেশে বাস-ট্রাকচালক, হেলপার ও কন্ডাক্টরদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি বলে প্রচার রয়েছে। সড়কে দুর্ঘটনার জন্য অন্যান্য কারণের মধ্যে তাদের মাদক গ্রহণকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার আশা করছে, ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর নিয়োগ হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সড়কে একই ধরনের পরীক্ষা অব্যাহত রাখলে, তাদের মাদক গ্রহণের প্রবণতা কমবে। এতে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হারও কমে আসবে। ইতিমধ্যে পুলিশ চালকদের ডোপ টেস্টের জন্য যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছে।
খসড়া বিধিমালার ১৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, কারও লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণের তিন বছর পর তা নবায়নের আবেদন করলে প্রত্যাখ্যান করা হবে। এতে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী বলেন, অনেকে শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কাজের জন্য যায়। এ বিধান থাকলে তারা বিদেশ থেকে আসার পর নবায়ন করার সুযোগ পাবে না।
খসড়া বিধিমালার ১২(৫) ধারায় বলা হয়েছে, আবেদন করার ৩০ দিনের মধ্যে নবায়ন করা লাইসেন্স সরবরাহ করবে বিআরটিএ। পরিবহন মালিকরা এ ধারা সংশোধন করে ১৫ দিনের মধ্যে তা সরবরাহ করার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
নতুন আইন ও প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের স্পেসিফিকেশনের বাইরে মোডিফিকেশনের সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের পরিবহন মালিকরা এ নিয়ম না মেনে মোডিফিকেশন করে পুরনো গাড়ি চালাচ্ছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহর হিসাবে, এ ধরনের গাড়ির সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। নতুন আইন ও বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পরও যেন এসব গাড়ি চালানো যায়, সেজন্য নির্বাহী আদেশ জারির প্রস্তাব করেছে মালিক সমিতি।
বিধিমালার আওতায় ড্রাইভিং দক্ষতা যাচাই কমিটি থাকবে। ওই কমিটি সপ্তাহে একাধিকবার চালকদের দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা করবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
অবৈধ পার্কিংয়ের দায়ে দেশের অন্য জেলাগুলোর তুলনায় ঢাকায় জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্র্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তিনি বলেন, দেশে পার্কিংয়ে সঠিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। আর মেহেরপুরে একটি গাড়ি অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য যে জরিমানা, ঢাকার ক্ষেত্রেও সেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট না থাকলে কোনো নির্দিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দণ্ড আরোপের ক্ষেত্রে অবারিত ক্ষমতা ভোগ করতে পারে।
