দেশের সবচেয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলমার্ক গ্রুপ সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট সাপেক্ষে পুনঃতফসিল সুবিধা পাবে না বলে সাফ জানিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান। সম্প্রতি হলমার্ক গ্রুপের লোকজন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যাংক হিসাব উন্মুক্ত করাসহ জালিয়াতি করে নেওয়া অর্থ পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদে সুযোগ চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রীও সুর নরম করেন।
গতকাল সোনালী ব্যাংক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ঋণ পুনঃতফসিল বিষয়ে বলতে গিয়ে হলমার্ক এ সুবিধা পাবে না বলে জানান। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা ও খেলাপি আদায়ে বাড়তি তৎপরতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। টাকার অঙ্কে ব্যাংকটির বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মধ্যে সরকারের তরফ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষমাত্রা দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকটি আশা করছে ২০২০ সালের মধ্যেই খেলাপি ঋণের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২০ সালে সোনালী ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৯ সালে আমরা ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি। ফলে খেলাপি ঋণ প্রায় ২৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণ কমে এলে আমাদের মূলধন বাড়বে, অন্যান্য সূচকেও উন্নতি ঘটবে।
আতাউর রহমান বলেন, ২০১৯ সালে সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের শুরু থেকেই ঋণের সুদহার ১ অঙ্কে নামিয়ে আনায় গত বছর আমাদের নিট মুনাফা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা কমে গেছে। একই কারণে অন্যান্য খাত থেকেও মুনাফা কমে গেছে। এগুলো না হলে ২০১৯ সালে আমাদের মুনাফা ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। ২০১৮ সালে বড় একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত হওয়ার কারণে ধার্য করা সুদ আয় খাতে নেওয়ায় ২০১৮ সালে মুনাফা হয় ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। গত তিন-চার বছরে যাচাই-বাছাই করে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে খেলাপির হার খুবই কম। অতীতে কিছু ঋণ খেলাপি হলেও এখন থেকে যাতে কোনো ঋণ আর খেলাপি না হতে পারে, সে জন্য আমরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছি। প্রয়োজনীয় নজরদারিও করা হচ্ছে। ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ নিয়মিতকরণে আমরা প্রায় ২ হাজার ৮০০ আবেদন পেয়েছি, যার মধ্যে ২ হাজার ৫৮৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে এ সুবিধা হলমার্ক পাবে না।
সোনালী ব্যাংকের এমডি বলেন, আমরা শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকের সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে গিয়ে কাক্সিক্ষত সেবামানে আমরা হয়তো কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। তবে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অটোমেশনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাক্সিক্ষত সেবা দিতে চেষ্টা করছি। এখন অটোমেশনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে ঢাকায় রিয়েল টাইমে লেনদেনে সক্ষমতা অর্জন করেছে সোনালী ব্যাংক। বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ৫১ সেবার মধ্যে ৩৭টি সেবা বিনা মূল্যে দিচ্ছে সোনালী ব্যাংক। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আমরা জনগণকে একেবারে দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেব।
আতাউর রহমান বলেন, একসময় বেমিট্যান্সে আমরা শীর্ষে ছিলাম। এখন আমরা চার নম্বরে আছি। এখন আমরা রেমিট্যান্স আনায় জোর দিয়েছি। বৈধভাবে রেমিট্যান্স আনার জন্য যে প্রক্রিয়াগুলো শুরু করা দরকার, তা আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। সম্প্রতি ফ্রিল্যান্সারদের টাকা দেশে আনতে ইংল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক প্রবাসীর টাকা বৈধপথে আসে না। সেটা কীভাবে বৈধভাবে দেশে আনা যায়, সে প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
সরকারের সবচেয়ে বড় মেগা প্রজেক্ট রূপপুর প্রকল্পের ৯৪ হাজার কোটি টাকার এলসি খোলায় সহায়তার কথা জানিয়ে সোনালী ব্যাংক এমডি জানান, এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কমিশন ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা, যেটা আমরা নিইনি। আমরা বাংলাদেশ বিমানকেও সাতটি বিমান কিনতে দীর্ঘমেয়াদে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদহারে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকারি চিনিকলসহ অনেক লোকসানি প্রতিষ্ঠানকেও অর্থায়ন করেছে সোনালী ব্যাংক।
এক প্রশ্নের জবাবে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, এখন আমাদের মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যেহেতু সরকার আর টাকা দেবে না, তাই মূলধন ঘাটতি মেটাতে বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ঋণের নামে যে টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে, তা আমরা ফেরত আনার চেষ্টা করছি।
