খালেদার জামিনে মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়েছেন আইনজীবীরা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:১৬ এএম

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। গত দুই বছর উচ্চ আদালতে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর জামিন ও কারামুক্তির চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি তার আইনজীবীরা, যারা বিএনপির মূলধারার রাজনীতিতেও জড়িত। সহসাই তিনি জামিনে মুক্ত হবেন সে সম্ভাবনাও ‘শূন্য’ মনে করছেন তারা। খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে রাজপথেও জোরালো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি বিএনপি নেতারা। এখন সরকারের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ ও ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ কিংবা সাজা স্থগিত করে হলেও তার কারামুক্তি ও সুচিকিৎসার আশায় আছেন আইনজীবীরা। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্যারোলে কারামুক্তির বিষয়ে নিয়ে তার আইনজীবীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। প্যারোলের বিষয়টি বিএনপি চেয়ারপারসন ও তার পরিবারের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পর তাকে রাখা হয় পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারা কর্র্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মামলায় ওই বছরের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল ও জামিন আবেদন করা হয় গত বছর ১৪ মার্চ। তারপর ১০ মাসেও মামলায় আপিল ও জামিন শুনানির উদ্যোগ নিতে পারেননি বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবীরা। ২০১৮ সালেরই ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয় বিচারিক আদালত। এ সাজা থেকে খালাস চেয়ে গত বছর ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টে আপিল করা হয়। এটিও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। দুদকের এ মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর সর্বোচ্চ আদালতে গত বছর ১২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়। আইনজীবীরা জানান, এ দুটি মামলায় জামিন পেলে এবং অন্য কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার না দেখালে কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন খালেদা জিয়া। তবে জামিনে মুক্তি তাদের কাছে অসম্ভবই মনে হচ্ছে।

জামিনের আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং নিকটভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা নেই এমন মনে করে গত ৯ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুসারে খালেদার সাজা স্থগিতের বিষয়টি আলোচনায় আনেন। তারা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ওই ধারা অনুযায়ী কোনো আসামির সাজার কার্যকারিতা শর্তহীনভাবে স্থগিতের ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। এখন সরকার আইনগতভাবেই খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি দিয়ে দেশে বা দেশের বাইরে তার ‘পছন্দমতো’ চিকিৎসার সুযোগ দিতে পারে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিএনপি চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার চাইছে না বেগম খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে কারামুক্তি পান। তাই নিকটভবিষ্যতে তিনি জামিন পাবেন সে সম্ভাবনা দেখছি না। এখন শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা বা সরকারের সদিচ্ছায় তার কারামুক্তি সম্ভব। এটি আগেও বলেছি, এখনো বলছি। আর প্যারোলে কারামুক্তির বিষয়টি একান্তই বেগম জিয়া ও তার পরিবারের বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। আগে তার চিকিৎসা হোক। পরে রাজনীতি। ফৌজদারি আইনের ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে মানবিক কারণে সাজা স্থগিত করে হলেও তাকে মুক্তি দিতে পারে, যাতে তিনি উন্নত চিকিৎসা নিতে পারেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের জ্যেষ্ঠ এক আইনজীবী হতাশা প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের মামলায় রাজনৈতিক নেতাদের সাজা হলে কারামুক্তিতে তিন ধরনের পথ খোলা থাকে। একটি হলো তীব্র আন্দোলন, আরেকটি রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আর তৃতীয়টি হলো আইনি লড়াই। কিন্তু বিগত দুই বছরে আমরা (বিএনপি) এর কোনোটিই করতে পারিনি। যে কারণে তার কারামুক্তিও বিলম্বিত হচ্ছে। এখন সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া নিকটভবিষ্যতে তার জামিনের সম্ভাবনা নেই, এটি নিশ্চিত।’

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে এ সরকারের একাধিক মেয়াদে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকাসহ সারা দেশে হত্যা, দুর্নীতি, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুদকের দুটি মামলায় তার ১০ ও ৭ বছর করে ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। হত্যার ৩টি, নাশকতার ১৬টি এবং মানহানির ৪টি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজধানীর দারুসসালাম থানায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ১১টি নাশকতার মামলা থাকলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। দুদকের করা নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ তার বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। দুদকের যে দুটি মামলায় তার সাজা হয়েছে ওই দুটি ছাড়া আর কোনো মামলাতেই অভিযোগ গঠন হয়নি। ১২টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, বেশিরভাগ মামলায়ই জামিনে রয়েছেন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটির মূল দেখভাল করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, যিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার মূল দায়িত্বে রয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। অবশ্য উভয় মামলায়ই দলের অন্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরাও সমানতালে শুনানি করেন।

আপিল ও জামিন শুনানির দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন যখন নিজস্ব গতিতে চলতে পারে না তখন নানা কথাবার্তা উঠবে এটিই স্বাভাবিক। বিচারব্যবস্থায় সরকারের হাত অনেক লম্বা। যে কারণে এ ধরনের রাজনৈতিক মামলায় বেগম জিয়া জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন না। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশের নজির রয়েছে যে, রাজনৈতিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তরা অসুস্থতার দরুন মানবিক কারণে জামিন পেয়ে থাকেন। শুধু তিনিই সে অধিকারটুকু পাচ্ছেন না। কাজেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতেই পারে।’ তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি আইন অনুযায়ী সরকার চাইলে সাজা স্থগিত করে মানবিক কারণে তাকে জামিন দিতে পারে। এখন সরকারের যে আইনি ক্ষমতা সেটি আমরা দেখব। পাশাপাশি আইনি লড়াইও চালিয়ে যাব।’

বিএনপির চেয়ারপারসনের একজন আইনজীবী ক্ষোভের সঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বেগম খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের এত বড় বড় আইনজীবী কী করছেন, সেটিও প্রশ্নের। একটি মামলায় (অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা) আপিল বিভাগে আপিল ও জামিনের আবেদন করা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু আপিল শুনানির কোনো উদ্যোগ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা নেননি। এমন পরিস্থিতিতে তার জামিনের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়।’ বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোনো আইনি মারপ্যাঁচে নয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় কারাগারে আছেন। যেহেতু রাজনৈতিক বিবেচনাতে তিনি কারাগারে আছেন, তাই রাজনৈতিক বিবেচনাতেই তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং প্রক্রিয়াটা আইনি হবে বলে আশা করি। এখন রাজনৈতিক বিবেচনা কখন, কোন সময় কার কীভাবে হয়, সেটি সময়ই বলে দেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত