অনাদরে কেটেছে সুপারহিট তাপসের শেষ জীবন

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:৩৬ পিএম

বাংলা সিনেমার দর্শকের অন্যরকম এক আবেগের নাম তাপস পাল। ১৯৮০ সালে প্রথম ‘দাদার কীর্তি’ সিনেমায় অভিনয় করেই বাঙালির মন জয় করে নেন ২২ বছরের তরুণ অভিনেতা তাপস পাল। এই সিনেমায় তার নায়িকা ছিলেন মহুয়া রায় চৌধুরী। কেদার চরিত্রে অভিনয় করে কোটি হৃদয়ে প্রেমের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ‘দাদার কীর্তি’র পর ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ নামের আরকটি সিনেমায় দেবশ্রীর বিপরীতে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন তিনি। পরের সিনেমাটিও সুপারহিট হয়। ১৯৮১ সালে ‘সাহেব’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তাপস পাল। এরপর দীর্ঘ সময় বাংলা সিনেমায় রাজত্ব করেছেন এই অভিনেতা। একে একে উপহার দিয়েছেন অনেক সুপারহিট সিনেমা। সুরের ভুবনে, মায়া মমতা, সমাপ্তি, চোখের আলো, অন্তরঙ্গ, সাহেব, পর্বতপ্রিয়, দিপার প্রেম, মেজ বউ, পথভোলা, আশীর্বাদ, পরশমণি, সুরের আকাশ, শুধু ভালোবাসাসহ তার সিনেমার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। সে সময় তার বেশির ভাগ সিনেমার নায়িকা ছিলেন দেবশ্রী রায়। শেষের দিকে দেবের কয়েকটি সিনেমাতেও দেখা যায় তাকে। কলকাতা তো বটেই, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এক উল্লেখযোগ্য নাম তাপস পাল। অভিনয় করেছেন বলিউডের সিনেমাতেও। ১৯৮৪-তে মাধুরী দীক্ষিতের প্রথম সিনেমা ‘অবোধ’-এ নায়ক ছিলেন তাপস। ওই সিনেমায় তাপস পাল মাধুরীর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এতে মাধুরীর চরিত্রের নাম ছিল গৌরী আর তাপস পালের নাম ছিল শঙ্কর। সুপারহিট এই অভিনেতার শেষ জীবনটা কেটেছে অবহেলা, অনাদর এবং নানা বিতর্কের দায় মাথায় নিয়ে। অনেকেই বলছেন, সবার কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রাখার এ জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন এই অভিনেতা। যে তাপস পাল ছিলেন কলকাতার সিনেমার মধ্যমণি, কেন তার জীবনে নেমে এলো নিঃসঙ্গতা? সেই প্রশ্নের জবাবে বারবার উঠে আসছে তার রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি। ভালোই ছিলেন তিনি অভিনয় নিয়ে। হঠাৎ করে মমতা ব্যানার্জির ডাকে ২০০৯ সালে রাজনীতিতে আসেন তাপস পাল। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিতও হন কৃষ্ণনগর থেকে। এরপর অভিনেতা তাপস পাল হারিয়ে গেলেন বলা চলে। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হলো ২০১৪ সালে। কেন্দ্রীয় নির্বাচনের কিছুদিন আগে এক নির্বাচনী প্রচার সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাপস পাল বলেছিলেন, গু-া পাঠিয়ে বিরোধী দলের মেয়েদের ধর্ষণ করাবেন। এই বাক্য তার মুখ থেকে হজম করতে পারেননি কেউ। তার কট্টর ভক্তরাও ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন। বিতর্ক বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়লে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান তিনি। মূলত সে থেকেই তাপস পালের একলা হয়ে যাওয়ার শুরু। চারদিক থেকে সবাই সরে দাঁড়াতে লাগল। আর ২০১৬ সালের শেষ দিকে তাপস পালের জীবনে শেষ ঝড়টা বয়ে গেল রোজ ভ্যালি নামে একটি চিট ফান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর। দীর্ঘদিন ভুবনেশ্বরের জেলে বন্দি ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বেরোনোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর স্বাভাবিক হতে পারলেন না। চলে গেলেন ৬১ বছর বয়সে। শেষ জীবনটা অনেক কষ্টে কাটল তার। জেল, অপমান, লাঞ্ছনা এরপর অসুস্থ হয়ে পড়া। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সুপারহিট, তবু অনাদরে কাটল তাপস পালের শেষ জীবন এ বিষয়টা সত্যি বেদনার তার ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য। আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না তিনি। শুধুই থাকবেন তার সিনেমায় স্মৃতি হয়ে।  উল্লেখ্য, চিকিৎসার জন্য গত ২৮ জানুয়ারি তাপস পালকে মুম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই অভিনেতা। মুম্বাইয়ের ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রেখে চলছিল তার চিকিৎসা। এরপর মুম্বাই থেকে তাপস পালকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তার পরিবার। কিন্তু চিকিৎসার আর সেই সুযোগ হলো না। তার আগেই না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন এই অভিনেতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত