আগামী জুলাইয়ে ২০তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করবেন ব্রিটিশ দম্পতি এলেইন ও জন স্পেন্সার। তার আগেই সমুদ্রে এক মাসের জন্য ভেসে বেড়াবার সিদ্ধান্ত নেন তারা। এজন্য চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর থেকে ডায়মন্ড প্রিন্সেস প্রমোদতরীতে চড়ে বসেন তারা। কিন্তু কে জানত এই আনন্দভ্রমণে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক নির্মম অভিজ্ঞতা। এলেইনের ডায়েরি থেকে সেসব অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পরাগ মাঝি
ডায়মন্ড প্রিন্সেস প্রমোদতরী
এই জাহাজে ৫০টিরও বেশি দেশের প্রায় ২৭০০ নাগরিক অবস্থান করছিলেন। ডায়মন্ড প্রিন্সেস যখন সাগরে ভাসছিল সেই সময়টিতেই পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি দেশের বন্দরে নোঙর করতে চাইলেও জাহাজটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত জাপান ইয়োকোহামা বন্দরে ‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’কে নোঙরের অনুমতি দেয়। অনুমতি দিলেও সব যাত্রী এবং ক্রুকে জাহাজের মধ্যেই অন্তত দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিন করে রাখা হয়।
কোয়ারেন্টিনের পুরো দুই সপ্তাহ ব্রিটিশ দম্পতি এলেইন এবং জন স্পেন্সার জাহাজের একটি জানালাবিহীন কেবিনে রুদ্ধদ্বার সময় কাটান। বলা যায়, দিনের প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ওই কক্ষটির ভেতরে বন্দির মতো জীবন কাটিয়েছেন তারা। কারণ, জাহাজের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত এই জাহাজে প্রায় সাড়ে ছয়শো যাত্রী প্রাণঘাতী ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আর জাহাজের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন ৩ জন।
অবরুদ্ধ দিনগুলোর কথা নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন ৫৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী নারী এলেইন স্পেন্সার। এই সময়টিতে স্বামী জন স্পেন্সার ছিলেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ডায়েরি লেখা শুরু করেছিলেন। সেদিনই তারা জানতে পারেন জাহাজের একজন যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। ডায়েরির শুরুতেই তিনি লিখেন, ‘প্রায় চার সপ্তাহ ধরে আমি আর জন ডায়মন্ড প্রিন্সেসে অবস্থান করছি।’ তিনি এও জানান, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরটি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রথম জানতে পেরেছিলেন। তারা আশা করছিলেন তাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে টোকিও এবং এর মধ্য দিয়েই তাদের সমুদ্রযাত্রার সমাপ্তি টানা হবে।
তিনি লেখেন, ‘অবশ্যই আমরা দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। ভাইরাসটি জাহাজের মধ্যে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে কি?’
বিগত দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এলেইন লিখেন, ‘আমরা দারুণ সময় কাটিয়েছিÑ ভিয়েতনাম, হংকং থেকে শুরু করে তাইওয়ান এবং ওকিনাওয়ার দারুণ কিছু জায়গা আমরা দেখেছি। শরীর হিম করে দেওয়া শীতল দিনগুলো পাড়ি দিয়ে পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে আমরা থাইল্যান্ড এবং দুবাইয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল সময় কাটানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলাম।
আতঙ্ক বাড়তে শুরু করেছে
ডায়েরি লেখার দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারি জাহাজ কর্র্তৃপক্ষের একটি ঘোষণা ব্রিটিশ দম্পতিকে আতঙ্কিত করে তোলে। এলেইনের ডায়েরি থেকে জানা যায়, সেদিন তারা জাহাজের একটি রেস্তোরাঁয় বসে সকালের নাস্তা সেরে নিচ্ছিলেন। এমন সময়ই মাইকে ঘোষণা করা হয় জাহাজের মধ্যে থাকা আরও অন্তত ১০ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘোষণায় যাত্রীদের বলা হয় সবাইকে নিজ নিজ কেবিনে অন্তত ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন অবস্থায় প্রত্যেককে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান করতে হবে।
এলেইন লেখেন, ‘আমরা যখন জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেই সময়টিতে এমন একটি ঘোষণা আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।’
তিনি আরও লিখেন, ‘এখনো সবাই সবার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করছে, সময় কাটাচ্ছে। তাই সংক্রমিত যাত্রীদের দ্বারা বিপুল সংখ্যক যাত্রীর শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সেদিন জাহাজটিতে থাকা সব যাত্রীকেই একটি করে থার্মোমিটার দেওয়া হয় এবং নিয়মিত শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এও জানানো হয়, কারও শরীরের তাপমাত্রা যদি কোনোক্রমে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়, তবে অবশ্যই তিনি যেন জাহাজে থাকা চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
শুরু হলো কোয়ারেন্টিন
৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যত জাহাজে থাকা যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন দশা শুরু হয়। তাই এলেইন স্পেন্সার এই দিনটিকেই কোয়ারেন্টিনের প্রথম দিন হিসেবে তার ডায়েরিতে চিহ্নিত করেন। এদিন নিজেদের কেবিনটিকে একটি জেলখানার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। কেবিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেন, ‘আমাদের জানালাবিহীন কেবিনে একটি ডবল বেড রয়েছে। থাকার জন্য খুবই সীমিত জায়গা। আর বাথরুমটাও খুবই ছোট। এটা এখন এক জেলখানা।’
কেবিনের ভেতর অন্য কারও প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। গ্লাভস পরা কেবিন ক্রুরা প্রতি কেবিনের দরজার সামনে খাবার এবং মাস্ক দিয়ে যায়। এছাড়াও পরিষ্কার বিছানাপত্র ও অ্যান্টিসেপ্টিক জাতীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করেছে তারা। ওই অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে প্রতিনিয়ত বাথরুম পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এলেইনের ডায়েরি থেকে জানা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারিতেই ডায়মন্ড প্রিন্সেসে থাকা যাত্রীরা একটি ফেইসবুক গ্রুপ খোলেন একে অপরকে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন খবরাখবর শেয়ার করার জন্য। এলেইন লিখেন, ‘এই ব্যাপারটি আমাদের মধ্যে আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’
এলেইন জানান, কোয়ারেন্টিন দশার দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৬ ফেব্রুয়ারি থেকেই জাহাজের সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দেয়। কোনো খাবার অর্ডার না করলেও দেখা যেত কেবিন ক্রুরা খাদ্য রেখে যাচ্ছে। আবার এক ঘণ্টার মধ্যে চারবারও খাবার রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে দীর্ঘ সময় খাবার সরবরাহ না করার ঘটনাও।
৬ ফেব্রুয়ারির ডায়েরিতে এলেন জানান, কেবিনের ভেতর দ্বিতীয় দিনেই তাদের হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায়। মুক্ত বাতাসে যাওয়ার জন্য তাদের মন আনচান শুরু করে। কিন্তু সেই উপায় না থাকার ফলে কেবিনের ভেতরেই বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং ইন্টারনেটে খবরাখবর পড়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। ইন্টারনেটে তারা এও দেখতে পান তাদের ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজটিকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশ করছে। ওই পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত আলোচনায় জাহাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এই ব্যপারটি ওই ব্রিটিশ দম্পতিসহ জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
তবে ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই একটি ঘোষণা শুনে এলেইন ও জন স্পেন্সারের মন আনন্দে নেচে ওঠে। কারণ সেদিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাহাজের ক্যাপ্টেন ঘোষণা করেন, কেবিনের ভেতরে থাকা যাত্রীদের কেবিনের বাইরে ব্যায়াম করার জন্য ডাকা হবে। একেক সময় একেক তলার যাত্রীদের এই সুযোগ দেওয়া হবে। শারীরিক অনুশীলনের ওই ক্লাসটি অনুষ্ঠিত হবে জাহাজের ১২ তলায়। ডায়েরিতে এলেইন লিখেছেন, ‘দুঃখজনক হলো প্রথম কলে আমাদের ডাক পড়েনি।’
বিষাদগ্রস্ত সময় পাড়ি দেওয়ার জন্য স্পেন্সার দম্পতি হুইস্কি এবং কোক পান করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং রুম সার্ভিসকে এগুলো সরবরাহ করার অর্ডার দেন। কিন্তু সেখান থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়- মদ সরবরাহে আপাতত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে, একটি ডায়েট কোক দিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে, কোয়ারেন্টিন অবস্থায় থাকলেও জাহাজটিকে মাঝেমাঝেই খোলা সমুদ্রে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরিয়ে আনা হয় এর মধ্যে সতেজ বায়ু সরবরাহ করার জন্য।
কোয়ারেন্টিন দশার তৃতীয় দিন অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি আরও একটি দুঃসংবাদ শোনেন স্পেন্সার দম্পতি। জাহাজের যাত্রীদের ফেইসবুক গ্রুপেরই তিন সদস্যের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেদিন দুপুরেই আরও ৪১ জনের শরীরে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার কথা ঘোষণা করেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেদিনই প্রথমবারের মতো কেবিনের ভেতর থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার জন্য বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পান ওই ব্রিটিশ দম্পতি। তবে, তাদের মুখের মাস্ক ও হাতের গ্লাভস পরার কথা বলা হয়। এও বলা হয়, তারা যেন অন্য যাত্রীদের চেয়ে অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করেন। ইয়োকোহামা বন্দর এলাকায় সেদিনের তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই হিমশীতল আবহাওয়ায় কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে পেরে দুজনই খুব ভালো বোধ করেছিলেন। তারা দেখেছিলেন, মাথার ওপর বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার একটু পর পর চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। কর্র্তৃপক্ষ ছাড়াও এসব হেলিকপ্টারে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ওপর থেকে ভিডিও করছিল। এসব পরিস্থিতি দেখে স্পেন্সার দম্পতি বুঝতে পারেন কী ভয়াবহ সময় তারা পাড়ি দিচ্ছেন। তারা এও দেখতে পান, কেবিনের বাইরে বের হওয়া অনেক যাত্রী কাশছিলেন। কাশি দেখে ভীত হয়ে পড়েছিলেন তারা। তবে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন।
৮ ফেব্রুয়ারি এলেইন ও জন দম্পতি একে অপরের বেশ কয়েকটি ছবি তোলেন। দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে জীবনে এর আগে এমন আয়োজন করে তারা কখনো ছবি তোলেননি। সেদিন রুমের ভেতরেই টানা এক ঘণ্টা জগিং করেন জন। শেষের ত্রিশ মিনিট তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এলেইন। সেদিন দুপুরে এক ঘোষণায় জানিয়ে দেওয়া হয়, জাহাজে আরও দুজনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দেখা গেছে এবং জাহাজটিতে ১৬ জন ডাক্তার এবং ১২ জন নার্সের একটি দল আসবেন। বিকেলের দিকে নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করেন এলেইন এবং জন। এলেইনের শরীরের তাপমাত্রা ছিল ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ এর বেশি হলেই তাকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া লাগত।
৯ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুক গ্রুপের চ্যাট থেকে এলেইন জানতে পারেন, যাদের কেবিনের সঙ্গে একটি বারান্দা আছে তারা দেখেছেন, বন্দরে অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো আছে। এসব দেখে চোখের জলে ভেসে যান এলেইন। এদিনও স্পেন্সার দম্পতি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এক ব্যক্তি এক মিটার দূরত্বে থাকার নিয়মটি অমান্য করে কাছাকাছি চলে এলে তারা সেই স্থান থেকে দ্রুত সটকে পড়েছিলেন। সেদিন তারা একটি সুসংবাদও পান। তারা জানতে পারেন, ভ্রমণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ তারা ব্যয় করেছিলেন তার পুরোটাই আবারও ফিরিয়ে দেবে কর্র্তৃপক্ষ।
১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে এক ঘোষণায় জাহাজের ক্যাপ্টেন যাত্রীদের যার যা প্রয়োজন অর্ডার করার পরামর্শ দেন। তবে অবশ্যই অ্যালকোহল, তামাক এবং ইলেক্ট্রনিক জাতীয় বস্তু বাদে। সেদিনই স্পেন্সার দম্পতির পুত্রসন্তান তাদের একটি মেইল পাঠান। এই মেইল থেকে তারা জানতে পারেন, জাহাজের মধ্যে আরও ৬০ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। যদিও এ সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা জাহাজ কর্র্তৃপক্ষ ঘোষণা করেনি। ফেইসবুক গ্রুপে এই খবরটি নিয়ে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যদিও এর কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ ভেসে আসে এবং তিনি জানান, সেদিন জাহাজে আরও ৬৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে।
কোয়ারেন্টিনের সপ্তম দিন অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি ছিল জাপানের জাতীয় ছুটির দিন। সেই দিনটাও সিনেমা দেখে, ব্যায়াম করে এবং ডেকে কিছু সময়ের জন্য ঘুরাঘুরি করেন স্পেন্সার দম্পতি। সেদিন সন্ধ্যায় জাহাজের ক্যাপ্টেন আরও ৬৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর দেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টার দিকেই তাদের ঘুম ভেঙে যায় রেড অ্যালার্ট শব্দের মাধ্যমে। অনবরত বেজেই চলেছিল এই সংকেত। আতঙ্কে কেবিনের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু করেন স্পেন্সার দম্পতি। শব্দটি থামছে না কেন তা ভেবেই তারা অস্থির হয়ে পড়েন। তবে শব্দটি থেমে যাওয়ার পর এক ভুতুড়ে নীরবতা নেমে আসে চারপাশে। সারাটি দিনই সেদিন তাদের বিক্ষিপ্ত অবস্থায় কাটে। আরও ৩৮ জন যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাস আক্রমণের খবর জানতে পারেন তারা। কোনো লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় তখন পর্যন্ত তাদের করোনাভাইরাস আছে কি-না এমন কোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়নি। এলেইন লিখেছেন, ‘আমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ একজন ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয় তবে, কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে। এই চিন্তাকে কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছি না।’
১৩ ফেব্রুয়ারি পাশের কেবিনেই এক মহিলাকে ডুকরে কেঁদে উঠতে শোনেন স্পেন্সার দম্পতি। সেদিন কয়েকজন জাপানি তাদের কেবিনের সামনে এসে হাজির হন এবং তাদের শরীরের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। যাওয়ার আগে বলে যান, তিন দিনের মধ্যে তাদের নমুনার ফলাফল জানানো হবে। ফলাফল ভালো এলে তাদের এই জাহাজ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
শেষ সপ্তাহটি
১৪ ফেব্রুয়ারিকে একটি নিরানন্দ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন এলেইন। এই দিনটাও তারা একটি রোমান্টিক সিনেমা দেখে কাটান। পরদিনও তাদের মন খুব খারাপ ছিল। ১৬ ফেব্রুয়ারি তারা ১ ঘণ্টার জন্য কেবিনের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পান। সেদিন অবশ্য ৭০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে শনাক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে সেদিন পর্যন্ত জাহাজে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫৫ জনে। সেদিন রাতেই তারা জানতে পারেন জাহাজে থাকা মার্কিন নাগরিকদের পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। ১৮ ফেব্রুয়ারি জাপানের ব্রিটিশ অ্যাম্বাসি থেকে যোগাযোগ করা হয় স্পেন্সার দম্পতির সঙ্গে। জানানো হয়, তাদেরও বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে, যুক্তরাজ্যে ফেরার পর তাদের লিভারপুলের একটি ক্যাম্পে আরও ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে। এই সময়ের মধ্যে অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন তারা। কিন্তু আরও ১৪ দিন নিজ দেশেই বন্দি জীবন কাটাতে হবে শুনে মন ভেঙে যায় তাদের। বাড়িতে থাকা চার সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে তাদের প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে।
১৯ ফেব্রুয়ারি কোয়ারেন্টিনের জন্য নির্ধারিত ১৪ দিন শেষ হয়ে গেলেও স্পেন্সার দম্পতিকে কেবিনের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে তারা জানতে পারেন ২০ ফেব্রুয়ারি একটি বিমানে করে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাবেন তারা। সেদিন সকাল সাড়ে ৮টায় তাদের কেবিনের দরজায় কেউ এসে টোকা দেয় এবং জানায় যেসব নমুনা তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল তার কোনো কিছুতেই করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়নি। তাই তারা নিরাপদ।
