চলচ্চিত্রে স্বল্প দিনের ক্যারিয়ার সালমান শাহর। হিসাবটা ৩ বছর ৫ মাস ১২ দিনের। এ অল্প সময়েই বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গন কাঁপিয়েছেন। অভিনয় করেছিলেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই রহস্যঘেরা মৃত্যু হয় সালমান শাহর। গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সালমান শাহর মৃত্যুর চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ সময় পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, দীর্ঘ তদন্তে সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে ২৪ বছর আগের সালমান শাহর লেখা সুইসাইড নোট তুলে ধরে পিবিআই। তাতে লেখা রয়েছে আমি চৌধুরী মো. শাহরিয়ার। পিতা কমরুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী। ১৪৬/৫ গ্রিনরোড ঢাকা #১২১৫ ওরফে সালমান শাহ। এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে, আজ অথবা আজকের পর যেকোনো দিন আমার মৃত্যু হলে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে-সুস্থ মস্তিষ্কে আমি আত্মহত্যা করছি।
সালমান শাহ নামটি নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক ধূমকেতুর নাম। যিনি হুট করে এসে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের মন জয় করে দ্রুতই চলে গিয়েছিলেন। তার বেশিরভাগ সিনেমাই ছিল সুপারহিট। সাবলীল অভিনয়ের সঙ্গে আধুনিক ফ্যাশন ও নায়কোচিত ব্যক্তিত্ব নিয়ে তিনি সহজেই সবার মন জয় করেন। পাননি তেমন কোনো বড় পুরস্কার বা সম্মান। কিন্তু সহজ-সরল অভিব্যক্তি আর ঢালিউডকে একধাপ আধুনিক করে যাওয়ার জন্য চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে তিনি আজও মহানায়ক। এজন্য এখনো সালমান শাহকে নিয়ে ভক্তদের আগ্রহের শেষ নেই। তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র জগৎ কিংবা সরকার কোনো আয়োজন না করলেও ভক্তরা নিয়মিত স্মরণ করে নানা আয়োজনের মাধ্যমে। সেখানে উপচে পড়ে দর্শকের ভিড়। সম্প্রতি এক ভক্ত গাজীপুরে এ নায়কের স্মরণে তার সিনেমার নামে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ রিসোর্ট বানিয়েছেন। সেখানে শোভা পাচ্ছে সালমান শাহের একটি মূর্তি।
সালমান শাহ ১৯৭১ সালে সিলেট জেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। তার মূল নাম চৌধুরী সালমান শাহরিয়ার ইমন, কিন্তু চলচ্চিত্র জীবনে এসে হয়ে যান ‘সালমান শাহ’। তার দাদার বাড়ি সিলেট শহরের শেখঘাটে আর নানার বাড়ি দারিয়াপাড়ায়। যে বাড়ির নাম এখন ‘সালমান শাহ হাউস’। নানার মূল বাড়ি ছিল মৌলভীবাজারে। সালমান শাহ ১২ আগস্ট ১৯৯২ বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম সামিরা।
১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় কথার কথা নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। এর কোনো একটি পর্বে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামে একটি গানের মিউজিক ভিডিও পরিবেশিত হয়। হানিফ সংকেতের স্বকণ্ঠে গাওয়া এ গান এবং মিউজিক ভিডিও দুটোই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। একজন সম্ভাবনাময় সদ্য তরুণ তার পরিবারের নানারকমের ঝামেলার কারণে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়, এই ছিল গানটার থিম। গানের প্রধান চরিত্র অপূর্বের ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়াতে প্রথম আলোচিত হন। তখন অবশ্য তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয়তা পেলেও নিয়মিত টিভিতে না আসার কারণে দর্শক ধীরে ধীরে ইমনকে ভুলে যায়। আরও কয়েক বছর পর অবশ্য তিনি আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় পাথর সময় নাটকে একটি ছোট চরিত্রে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন।
সালমান শাহ অভিনীত সিনেমাগুলো হলো কেয়ামত থেকে কেয়ামত, তুমি আমার, অন্তরে অন্তরে, সুজন সখী, বিক্ষোভ, স্নেহ, প্রেমযুদ্ধ, কন্যাদান, দেনমোহর, স্বপ্নের ঠিকানা, আঞ্জুমান, মহামিলন, আশা ভালোবাসা, বিচার হবে, এই ঘর এই সংসার, প্রিয়জন, তোমাকে চাই, স্বপ্নের পৃথিবী, সত্যের মৃত্যু নেই, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া, প্রেম পিয়াসী, স্বপ্নের নায়ক, শুধু তুমি, আনন্দ অশ্রু ও বুকের ভেতর আগুন। সর্বাধিক মুভির নায়িকা ছিলেন শাবনূর (১৪টি)।
