বিরোধীদের প্রতি সক্রিয় ক্ষমতাসীনদের প্রতি নমনীয় দুদক: টিআইবি

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৭:০৫ পিএম

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে তা বলা যাবে না বলে মনে করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটি বলছে, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় সরকারের বিপরীতে তাদের বিরুদ্ধে দুদক সক্রিয়। তবে সরকার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তাদের শুধু দুদকের করিডোর পর্যন্ত যেতে হয়। এরপরে তার অগ্রগতি থাকে না।

মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ: বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি ফলোআপ গবেষণা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ শেষে এসব বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের তিন বছরের তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদনটি করেছে টিআইবি।

সংস্থাটির গবেষণা অনুসারে, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৬০ স্কোর পেয়েছে দুদক। যা মধ্যম শ্রেণির। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৬৭ স্কোর থেকে ১০০ পর্যন্ত উচ্চ শ্রেণি বিবেচনা করা হয়। উচ্চ শ্রেণিতে উঠতে গেলে দুদককে এখনো সাত স্কোর পেতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করতে দুর্নীতি অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, সম্পদ আত্মসাৎসহ এ ধরনের দুর্নীতি মোকাবিলায় আরও উন্নতি করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গবেষণায় দুদকের কর্মকাণ্ডের ছয় ক্ষেত্র ভাগ করে ৫০ নির্দেশক বিবেচনায় নিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কমিশনারদের নিয়োগ ও অপসারণ, কাজের আওতা, আইনি স্বাধীনতাসহ ২১টিতে উচ্চ শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে দুদকের সক্ষমতা বেশ ভালো।

অন্যদিকে ১৮টি নির্দেশক মধ্যম ও ১১টি নিম্ন শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এসব এক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে সংস্থাটি। 

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের এই নির্দেশকটি সবচেয়ে কম নম্বর পেয়েছে।

টিআইবি বলছে, তাদের গবেষণার তথ্য সংগ্রহ মেয়াদকাল ৩ বছরে দুদকে মোট ৪৭ হাজার ৫৩৯টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২০৯টি তদন্তের জন্য আমলে নেওয়া হয়, যা মোট অভিযোগের ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ অভিযোগই আমলে নেয়া হয়নি।

টিআইবি বলছে, অনুসন্ধান, ও তদন্ত কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।

স্বাধীনতা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দুদকের ক্ষমতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার-বিরোধীদলের রাজনীতিকদের হয়রানি এবং ক্ষমতাসীন দল ও তাদের জোটসঙ্গীদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। এই নির্দেশকে নিম্ন স্কোর অর্জন করেছে দুদক।

জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার এই ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত নয়টি নির্দেশকের মধ্যে তিনটি নির্দেশক নিম্ন স্কোর করেছে।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে বলা হয়েছে, দুদকের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা সমানভাবে না চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

সহযোগিতা ও বাহ্যিক ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে শুণ্য সহনশীলতার (জিরো টলারেন্স) ওপর জোর দেওয়া হলেও সরকারের কোনো কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এর কথা উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতির অভিযোগ পেলে পূর্বানুমতি ছাড়া তাদের গ্রেফতার না করার যে বিধান রাখা হয়েছে তার সমালোচনা করে টিআইবি বলছে, আইনটি অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক। 

অন্যদিকে প্রতিরোধমূলক, শিক্ষামূলক ও আউটরিচ কার্যক্রমে দুদক সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। এই ক্ষেত্রের আওতাভূক্ত আটটি নির্দেশকের মধ্যে চারটি স্কোর উচ্চ ও চারটি মধ্যম মান অর্জন করেছে সংস্থাটি। তবে এখানেও সমালোচনা রয়েছে দুদকের।

এখানে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত দুদকের দুর্নীতি বিষয়ে নিজস্ব গবেষণা নেই। ২০১৮ সালে তিনটি গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনোটিই সম্পাদন ও প্রকাশ করা হয়নি। 

টিআইবির প্রতিবেদনে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে প্রথম দফার পর্যালোচনার পর (টিআইবি কর্তৃক) দুদকের বাজেট বাড়ানো হয়েছে। যদিও বা তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি। দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন-১০৬ চালু কিন্তু অভিযোগের বড় অংশই আমলে নেওয়া হয় না।

সার্বিক বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১৫ সালের গবেষণায় প্রাপ্ত স্কোরের তুলনায় ২০১৮ সালের স্কোরে দুদকের কর্মদক্ষতার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। বড় দুর্নীতির চেয়ে ছোটখাটো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংস্থাটির আগ্রহ অনেক বেশি। দুর্নীতি অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা করার ক্ষেত্রে সংস্থাটির ওপর রাজনৈতিক চাপ আছে। বেসিক ব্যাংকসহ বড় লুটপাটের অনেক ঘটনা এখনো তদন্তের বাইরে রয়ে গেছে। এতে দুদকের প্রতি জনগণের একধরনের অনাস্থার জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এমন উচ্চ ব্যক্তিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে নমনীয়। কিন্তু সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত রাজনীতিকদের নানাভাবে হয়রানী করে।

এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী প্রধান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারাও সরকারের ইচ্ছের বাইরে কাজ করতে পারে না। তবে আইনের শাসনের ওপর নির্ভর করে এসব প্রতিষ্ঠান ভালো করছে।

তিনি বলেন, অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও দুদক তাদের কাজের অগ্রগতি বজায় রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে।

দুদক শক্তিশালী করতে টিআইবির প্রতিবেদনে ১৬টি সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্চ এন্ড পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ড. পারভীন হাসান ও উপদেষ্টা সুমাইয়া খায়ের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত