ব্যাংকিং খাতে সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। ওটা খেতাব পেয়ে গিয়েছিল ‘নয়-ছয়’ হিসেবে আর তা কার্যকর হওয়ার তারিখ ধার্য হয়েছিল সামনের ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ থেকে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সুদের হার তার অনেক আগেই প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আদেশ জারি করায় এই আলোচনা আরও সরব হয়ে উঠেছিল। ফলে অর্থমন্ত্রী বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যাবে কি না, তা পর্যালোচনা করে দেখার কথা বলেছিলেন। অর্থ বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে যে, পুনর্নির্ধারিত সুদ-হার কেবল ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের বেলায় প্রযোজ্য, সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নয়। সর্বশেষ ২৬ ফেব্রুয়ারি ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সুদ-হার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কেন এই সুদ-হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার তাগিদ? এর উত্তর খুব যে কঠিন তা নয়; উচ্চ-সুদে আমানত সংগ্রহ করা হলে অফিসের ক্ষয়-খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভের জন্য আরও উচ্চ-সুদে ঋণ সরবরাহের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। ফলে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয় না; কিছু হলেও তাতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, তাতে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কমে যায়। এতে শিল্পপতিদের লাভ তো হয়ই না, বরং লোকসান গুনতে হয়; শিল্প-কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়ে, ঋণ পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায়। পরিণামে ব্যাংকে মন্দ ঋণের পরিমাণ হু হু করে বাড়তে থাকে। এভাবে বাড়তে বাড়তে ব্যাংকের অকার্যকর ঋণের পরিমাণ লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ প্রণোদনায় এখন সেটা নাকি এখন ‘৯৪ হাজার কোটি টাকায়’ নেমে এসেছে। এখন তো আর এটাকে বাড়তে দেওয়া যায় না; আবার উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এখন এর হার জিডিপির ৩২.৭৬ শতাংশ। আমাদের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা- ২০২১-২০৪১ অনুযায়ী একে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নীত করতে হবে কমপক্ষে ৪০.৬০ শতাংশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪৬.৮৮ শতাংশে। আর এই কর্মযজ্ঞে বেসরকারি কুশীলবদের বসাতে হবে প্রবৃদ্ধির চালকের আসনে। এজন্য স্বল্প সুদে তাদের পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু সরকারি সঞ্চয় স্কিমগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করায় ব্যাংকগুলো স্বল্প সুদে তহবিল গঠন করতে পারছে না। এই জন্য মন্ত্রী প্রথমে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদ-হার কমিয়ে নিজ ঘর থেকে শুদ্ধাচার শুরু করতে চেয়েছিলেন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার উদ্দেশ্য যে অযৌক্তিক, তা কেউ বলতে পারবে না।
এখন প্রশ্ন হলো সুদের উচ্চ হারই কি মন্দ ঋণের একমাত্র কারণ? এ কথা ঠিক যে, আমানতের ওপর দেয় সুদের হার আমাদের দেশে অনেক বেশি; অন্য কোনো দেশে আমানতের ওপর এ জাতীয় লোভনীয় মুনাফা লাভের সুযোগ নেই। মন্দ ঋণের এটাই একমাত্র কারণ নয়; অনেকগুলো কারণের একটি। প্রধান কারণ আর্থিক খাতে বড় বড় খলনায়কদের শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সংস্কৃতি। পাঁচ হাজার টাকার কৃষিঋণ ফেরত দিতে না পারার অপরাধে এখানে প্রায়শই হাতকড়া পড়ে, কিন্তু পাঁচশ বা পাঁচ হাজার কোটি ফেরত দিতে না পারলে খেলাপির কোনো সমস্যা নেই; পুনঃতফসিলিকরণ দিয়ে তা শুদ্ধ করা যায় এবং পরিশেষে অবলোপনের মাধ্যমে কালো তালিকা হতে নাম ধুয়ে ফেলা যায়। এই সংস্কৃতি চালু থাকলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মন্দ ঋণের পরিমাণ যে জ্যামিতিক হারে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
এর পরের প্রশ্ন হলো সুদ কমিয়ে আনা হলে ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটবে কিনা? একই অর্থবাজারে আমানতের বিপরীতে দুই ধরনের সুদ-হার বজায় রাখা হলে মানুষ নিশ্চিতভাবে বেশি লাভের দিকে ধাবিত হবে। তবে স্কিমভিত্তিক বিনিয়োগের ঊর্ধ্ব সীমাসহ নানা ধরনের বিধিনিষেধ থাকলে অতিরিক্ত আমানতের একটা অংশ ব্যাংকে আসতে পারে। তবে তার পরিমাণ খুব একটা বেশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আর সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সে অর্থ সংগ্রহ করার সামর্থ্যও রাখে না। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ওপর, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বোধগম্য কারণে এখন মানুষের আস্থা অনেকটা শূন্যের কোঠায়। পরিবর্তিত সুদে গড়পড়তা ৬ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির বাজারে কর ও পরিচালন-খরচ কাটার পর আমানতকারী নিয়মিতভাবে মূলধন খোয়াতে থাকবেন। এ পরিস্থিতিতে আস্থাহীন বেসরকারি ব্যাংক ব্যবস্থায় চরম তারল্য সংকট দেখা দেবে; লাভের পরিবর্তে নিয়মিত পুঁজি হারালে সরকারি ব্যাংকেই বা কেন টাকা রাখা? ফলে ব্যাংকের প্রথমে তারল্য সংকট ও পরিণামে অস্তিত্ব সংকট দেখা দিতে পারে। স্বল্প মেয়াদে আমানত গ্রহণকারী ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে জড়ালে পরিণতি এরূপ হতে বাধ্য।
এখন প্রশ্ন হলো মানুষের উদ্বৃত্ত অর্থ তাহলে যাবে কোথায়? উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ সাধারণত চলে যায় পুঁজি বাজারে। তাতে রাষ্ট্রের জন্য দায় সৃষ্টি না করেই দেশে শিল্পায়ন হয়, কর্মসংস্থান হয়, উন্নয়নে জনসাধারণের অংশীদারিত্ব বাড়ে, আয় বৈষম্য কমে; মোটকথা সবার জন্য একটা জয়জয়কার অবস্থা (win win situation) তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের দেশে নানা কারসাজি, অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর অবহেলা-অযতেত্নে পুঁজিবাজারকে পরিণত করা হয়েছে মানুষকে সর্বস্বান্ত করার মতো জুয়ার আখড়ায়। এ অবস্থায় উদ্বৃত্তের একটা ভাগ প্রথমেই সীমান্ত পাড়ি দিতে উদ্যত হবে। যাদের সেটা করার সামর্থ্য নেই, লাভের আশায় তারা উদ্বৃত্তের বড় অংশ বিনিয়োগ করবে ব্যাংক বহির্ভূত বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ও কায়-কারবারে; একটা অংশ চলে যাবে রিয়েল এস্টেট ও জমি ক্রয়ে। দ্রুত উন্নয়নশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে ভূমির মতো অনুৎপাদনশীল লাভজনক সম্পদ দ্বিতীয়টি নেই। ফলে ভূমির দাম বাড়বে দ্রুতগতিতে। আর সেই সঙ্গে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো বাড়বে ব্যবসা করার খরচ। এই অবস্থা আমাদের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যের সঙ্গে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরে ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে গড়পড়তা ১০০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এখন তার পরিমাণ মাত্র ৩০০ কোটি ডলারের মতো। তাহলে আমাদের যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা আসবে কোত্থেকে? এ প্রশ্নের জবাব পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেই দেওয়া আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, এই বিনিয়োগের ৭৬ শতাংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে, আর বাদবাকি ২৪ শতাংশের জোগান দেবে সরকারি খাত। একথা ঠিক যে, উপযুক্ত প্রণোদনা ও নিশ্চয়তা পেলে দেশি-বিদেশি সব উৎস থেকে উদীয়মান এই অর্থনীতিতে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো পুঁজির সমাবেশ ঘটতে পারে।
ব্রিটিশ-ভারতের শেষের দিকে মুর্শিদাবাদ জেলায় এক কিংবদন্তিতুল্য আইসিএস জেলা প্রশাসক ছিলেন। জেলা থেকে সাপের উপদ্রব দূর করার জন্য অকৃতদার এই কর্মকর্তা নিজ পকেট থেকে প্রতিটা মরা সাপের জন্য মোটা পুরস্কার ঘোষণা করেন। কিছুদিনের মধ্যে সাপের উপদ্রব ও সরবরাহ- দুটোই কমলেও তারপর আবার ধীরে ধীরে সাপের সরবরাহ বেগবান হয়ে পড়ে। এতে পুরস্কারের তহবিলে শূন্যতা সৃষ্টি হলে তার প্রকল্পটি ভেস্তে যায়। সাপের উপদ্রব কমার পরও কীভাবে সাপের সরবরাহ বেড়ে গেল, সেটা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায় যে, বুনো সাপ শেষ হওয়ার পর পুরস্কারের লোভে লোকজন সাপ চাষ শুরু করেছে। এটাই লাভের কারিশমা।
বৈদেশিক বিনিয়োগ দুই ধরনের ক. সরাসরি বিনিয়োগ এবং খ. পোর্টফোলিও বিনিয়োগ। বিদেশিরা কোনো দেশে বিনিয়োগ করার আগে যে দুটি বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, তা হলো সহজে ব্যবসা করার সূচক ও পুঁজিবাজারের সূচক। কাজেই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে এ দুটি সূচকের উন্নতি আবশ্যিক শর্ত। এটা করা সম্ভব হলে দেশি পুঁজি পাচারের আশঙ্কাও কমে যাবে। এজন্য এ দুটি সূচকের উন্নতির লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিগত এক বছরে সহজে ব্যবসা করার সূচক ৮ ধাপ এগিয়ে গেছে, কিন্তু এ সময়ে পুঁজিবাজারের প্রধান সূচক ১০০০ বেশি পয়েন্ট হারিয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, দেশের প্রধান নির্বাহীর কার্যালয় উন্নয়নে পুঁজিবাজারের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক অবহিত।
বিগত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে পুঁজিবাজারে দরপতনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বৈঠক শেষে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঐ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও আস্থা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্যগুলো ছিল প্রধানত বাজারে অর্থ সরবরাহ ও ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আসা সংক্রান্ত। এতে সাময়িকভাবে দরপতন রোধ হয়। এরপর বাজারে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অর্থের প্রবাহ ও ভালো মানের শেয়ার বাড়াতে কিছু ব্যবস্থার কথা বলা হলেও আস্থা সৃষ্টি করার জন্য দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাছাড়া ব্যাংক নিজেই যেখানে মন্দঋণ ও তারল্য সংকটের সম্মুখীন, তখন সে পুঁজিবাজারে আলাদা অর্থ জোগাবে কোত্থেকে? এই মুহূর্তে পতনোন্মুখ পুঁজিবাজারে নতুন ‘স্ক্রিপ’ আনা হলে তা বাজারের গভীরতা বাড়ানোর পরিবর্তে সূচককেই বরং টেনে নামাতে ভূমিকা রাখবে। এ অবস্থায় সামনে পুঁজিবাজারের পতন ঠেকানো কঠিন।
আসলে পুঁজিবাজার হলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গা। এটি মানুষের আস্থাশীলতার বিমূর্ত প্রতীক। আস্থা ফিরে এলে অসংখ্য মানুষ তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় নিয়ে বাজারে হাজির হয়ে অর্থের মহীরুহ তৈরি করে; বাজারকে কৃত্রিমভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার সীমিত অর্থ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না, সে নিজস্ব বলে বলীয়ান হয়ে উন্নয়নের অভিযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে। আর আস্থা ফিরে আনার জন্য দরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের দক্ষতা ও সক্ষমতা। বিগত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. শামসুল আলমের বক্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, নতুন এই পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এগুলো হলো সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। পুঁজি বাজারে এই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আগে তদন্ত করে এক্ষেত্রে সংঘটিত অপরাধমূলক কাজে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে এবং যোগ্য লোককে উপযুক্ত স্থানে আসীন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য ব্যাংকিং খাতের মতো পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশনও গঠন করা যেতে পারে। তখনই কেবল রাহুমুক্ত হয়ে পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চক্রনাভি হিসেবে কাজ করবে, তার আগে নয়। এটা সংশ্লিষ্ট মহল যত তাড়াতাড়ি আমলে নেবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।
লেখক
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
