প্রশিক্ষণ নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি প্রয়োজনীয় বলেই স্বীকৃত। প্রত্যাশা থাকে দেশের বাইরে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা নিয়ে দেশে এসে তারা সে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োগ ঘটাবেন। জনসেবার ক্ষেত্রে আধুনিক ও যুগোপযোগী কর্মপদ্ধতি প্রয়োগ করবেন। কিন্তু বাস্তবে সরকারি এ সুযোগটির অপব্যবহার হচ্ছে হরহামেশাই। কোনো কোনো সফর স্রেফ প্রমোদভ্রমণ কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে। সম্প্রতি দেখা গেছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার অল্প কয়েক দিন আগেও বিদেশ সফরে গেছেন অনেক কর্মকর্তা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর ক্ষেত্রে অবসরের আগে ন্যূনতম চার বছর মেয়াদের শর্ত যুক্ত করার সুপারিশ করেছে বলে খবর মিলেছে। এ-সংক্রান্ত ‘চাকরির মেয়াদ ৪ বছর না থাকলে বিদেশে প্রশিক্ষণ নয়’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগ আছে, অনেক সরকারি কর্মকর্তা তথ্য গোপন করে বারবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ নেন। সাধারণত প্রশিক্ষণ, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনার জন্য কর্মকর্তারা বিদেশে যান। শিক্ষালাভের জন্যও অনেকে বিদেশ যান। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তব শিক্ষালাভের জন্যও বিদেশ যান অনেকে। আবার অতি সাধারণ কাজেও দলবেঁধে বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রশিক্ষণ শেষে সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। সরকারের নিয়মানুযায়ী একজন সচিব বছরে চারবার বিদেশ যেতে পারবেন। অথচ দেশে এক বছরে একজন সচিবের সর্বোচ্চ ৭৫ বার বিদেশযাত্রার রেকর্ডও তৈরি হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের একই সময়ে বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী-সচিবরাও এই নীতিমালা মানছেন না। এমনকি দেশে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও সরকারি টাকায় একাধিকবার বিদেশ সফরে গিয়েছেন এমন খবরও এসেছে।
কর্মকর্তাদের যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণের মারাত্মক প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে। অনেকে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন এক মন্ত্রণালয়ের জন্য, দেশে ফেরার পর তাদের সেখান থেকে অন্যত্র বদলি করে দেওয়ার নজিরও আছে। সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান সরকারের কোনো কাজে লাগে না। এভাবেই সরকারি অর্থের অপচয় হয়। সংবাদমাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ সফরের আশ্চর্য রোগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও কিছুতেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখলেও তা বন্ধ হয়নি। গত ১১ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ হয়। অনেকেই আবার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যাচ্ছেন। এ-সংক্রান্ত ‘মেয়াদান্তে ৭৫ সচিবের হার্ভার্ড সফর প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন গত ২২ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, একজন সচিব, যিনি প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করে চাকরি জীবনে শেষ সময়ে এসে হয়তো কিছুদিনের জন্য সিনিয়র সচিবের পদটি পেয়েছেন, তিনি মাত্র ১০ দিনের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন হার্ভার্ডে! এই ‘প্রশিক্ষণ’ তিনি কীভাবে কাজে লাগাবেন? তার তো প্রশিক্ষণের আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সে অনুসারে সেবাও তিনি দিয়েছেন। খোঁজ নিলে দেখা যাবে এসব কর্মকর্তার অনেকেই চাকরিজীবনে একাধিকবার বিদেশ থেকে ‘প্রশিক্ষণ’ নিয়েছেন। আবারও কেন ‘প্রশিক্ষণ’ নেবেন চাকরির শেষ সময়ে এসে! এটা শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং এক ধরনের দুর্নীতিও বটে!
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো গড়া জরুরি। একই সঙ্গে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসে তা যেন কাজ লাগাতে পারেন, সেটাও গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষণের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ হবে, সরকারের হবে অর্থের অপচয়। তাছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের জন্য যেমন সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়, তেমনি কোন কর্মকর্তা কোন দেশে কী কারণে কতদিন অবস্থান করেছেন তারও বিস্তারিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানোর বিধান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ইতিপূর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর নির্দেশনা জারি করেছিল। অথচ প্রায় কেউই এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না নিয়ে প্রমোদভ্রমণের ফলে শুধু দেশের অর্থই অপচয় হচ্ছে না, বাস্তব দক্ষতার বিকাশ থেকেও কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিভিন্ন প্রকল্প এবং দেশের ওপরই পড়বে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবশ্যই দেশের টাকার এমন অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশটি বিবেচনা করা হোক।
