মুজিববর্ষে শুরু হোক মুক্তির নয়া সংগ্রাম

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ১২:১৮ এএম

‘মুজিব’ বলতে আমি কী বুঝি, মুজিববর্ষের অর্থ আমার কাছে কী সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়। তার সাহস, সংগ্রাম ও উঁচু তর্জনীর প্রতি জানাই প্রণতি। তার বুকের দিকে তাক করা ঘাতকের বন্দুক, ২৯টি গুলি শরীরে নিয়ে ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে নিষ্প্রাণ পড়ে থাকা তার শবদেহের ইতিহাস মনে রেখে মস্তক নত করি লজ্জায়।

এক মাফিয়া-উপদ্রুত কালে আমরা পালন করতে যাচ্ছি মুজিববর্ষ।  পালন করছি বাঙালির মুক্তিদূতের জন্মতিথি। পালন করছি ইতিহাসের মহানায়কের জন্মশতবর্ষ। উদযাপনের এই ক্ষণেই জানতে চাই, ‘মুজিব’ বলতে আপনি কী বোঝেন? আপনার কাছে মুজিববর্ষের অর্থ কী? প্রশ্ন করছি, মুজিব কেন প্রয়োজন?  জাতির পিতার জন্মোৎসব আনন্দের বিশেষ উপলক্ষ। তবে, উৎসব যেন কেবলি উদযাপনের আড়ম্বর, আলোকপ্রভা আর পাঞ্জাবির ওপরে কোট পরে বেশধারনের মওকা না হয়। মুজিব আছেন তার দর্শনে।  রাজনীতি বলতে তিনি বুঝতেন মানুষের কল্যাণ। তিনি বুঝতেন, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সুদিন।

আসুন, পড়ি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ কয়েক পঙ্ক্তি: “খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে।’  আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।’ আমার চোখে পানি এলো। আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।’ টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেইদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।”

প্রাণ দিয়েছেন। তবু, ধোঁকা তিনি দেননি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কারারুদ্ধ থেকেছেন। পূর্ব থেকে পশ্চিম ঢাকা থেকে মিয়ানওয়ালি কারাপ্রকোষ্ঠে বন্দি থেকেছেন। কিন্তু, আপোস করেননি। নিজের আখের নিয়ে ভাবেননি। দেশের মানুষের কথা ভেবেছেন। তাই, জনতাকে কেবল তিনিই বুঝি বলতে পারেন ‘আমার মানুষ’। মুজিব বলতে আমি বুঝি, বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহস ও সততা।  কালে-কালে সময়ের দাবি পাল্টায়, স্বপ্ন পাল্টায়। সময়ের দাবি বুঝে নিয়ে স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজেই নিজের রাস্তা রচনা করে চলতে পারার প্রেরণার নামই শেখ মুজিবুর রহমান।

জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের এই ঐতিহাসিক লগ্নে সত্যিকার অর্থে যদি মুজিবচর্চা হয়, তাহলে এদেশে মাফিয়ারা টিকবে না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোনো মাফিয়াই টিকবে না। চেতনা ও দর্শনে তার ছাপ না থাকলে, কেবল মুজিবকোট পরে মুজিবের অনুসারী হওয়া যায় না। বিষয়টা রবীন্দ্রনাথের গানের মতন: ‘পারি যদি অন্তরে তার ডাক পাঠাব, আনব ডেকে।’ শুধু বহিরাঙ্গে ধারণ করলে চলবে না। শেখ মুজিব আমাদের ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’। মুক্তিকামী মানুষের আকাক্সক্ষার ভাষা তিনি বুঝেছিলেন। তাই, তার নামেই জনসমুদ্রে জেগেছে কল্লোল: ‘তোমার নেতা, আমার নেতা/ শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।’ সাধারণের ভেতর থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক। আজ যে শিশু বড় হচ্ছে দুর্গম চরে, যে শিশু বেড়ে উঠছে সুদূর পল্লীতে তাকে দিতে হবে স্বপ্ন দেখার অদম্য দুঃসাহস। ‘রাজনীতি মানে কেবল মসনদে যাওয়ার সিঁড়ি নয়, রাজনীতি মানে মানুষের কল্যাণ’। এই সত্য তরুণদের মনে গেঁথে দিতে পারাটাই হবে মুজিববর্ষের সার্থকতা।

‘জেলের ভেতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে’। এই কথা বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন কারাগারের রোজনামচায়। ঠিক তেমনি, পত্রিকার পাতাগুলো দেখলে মনে হয়, দেশের ভেতরেও আছে ছোট ছোট সালতানাত। জেলের দুর্নীতির অনেক চিত্র তিনি রোজনামচায় লিখেছিলেন। সেখানেই উল্লেখ করেন: ‘সমস্ত দেশটায় যাহা চলছে এখানেও সেই একই অবস্থা। দেখার লোকের অভাব। কেহ ভালো হতে চেষ্টা করলে তার সমূহ বিপদ।’ তিনি লিখেছেন: ‘এক থানায় একজন কর্মচারী খুব সৎ ছিলেন। ঘুষ তিনি খেতেন না। কেহ ঘুষ নিক তিনি তাহাও চাইতেন না। সকলে তাকে বোকা বলতে শুরু করে। [...] তার এক সহকারী তাকে বলেছিল, সাধু হলে চাকরি থাকবে না। বড় সাহেবের কোটা তাকে না দিলে খতম করে দিবে। তিনি তাহা শুনলেন না। [...] কিছুদিন পরে দেখা গেল ঘুষ খাওয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এই মিথ্যা মামলায় তাকে চাকরি হারিয়ে কোর্টে আসামি হতে হয়েছিল।’

এসব জানতেন বলেই স্বাধীনতার পর একটা সময়ে দুর্নীতিবাজদের তিনি টেনে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকেরা তার দিকেই তাক করেছিল বন্দুক। অবশ্য তিনি জানতেন, মানুষ বেইমান হয়। কারাগারে সেলে বন্দি থাকা অবস্থায় মাসের পর মাস তিনি একাকী ছিলেন।  তখন কাক-পক্ষী আর বই ছিল তার সাথী। তখন তিনি লিখেছিলেন: ‘আমার মোরগটা আর দুইটা বাচ্চা আনন্দে বাগানে ঘুরে বেড়ায় আর ঘাস থেকে পোকা খায়। ছোট কবুতরের বাচ্চাটা দিনভর মোরগটার কাছে কাছে থাকে। ছোট মুরগির বাচ্চারা ওকে মারে, কিন্তু মোরগটা কিছুই বলে না। কাক যদি ওকে আক্রমণ করতে চায় তবে মোরগ কাকদের ধাওয়া করে। রাতে ওরা একসাথেই পাকের ঘরে থাকে। এই গভীর বন্ধুত্ব ওদের সাথে। একসাথে থাকতে থাকতে একটা মহব্বত হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ অনেক সময় বন্ধুদের সাথে বেইমানি করে।  পশু কখনো বেইমানি করে না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় পশুরাও বোধ হয় মানুষের চেয়ে একদিক থেকে শ্রেষ্ঠ।’

এই মাফিয়ার কালেই মুজিবের চর্চা প্রয়োজন। তাই, মুজিববর্ষ হয়ে উঠুক শুদ্ধিবর্ষ। ’৭২-এর সংবিধান ফিরিয়ে আনা হোক। বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে এনে শাস্তি কার্যকর করা হোক। দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হোক। যে পরিবেশে মাফিয়া জন্মায়, দুর্বৃত্তায়নের সংক্রমণ হয় সেই পরিবেশ ‘জীবাণুমুক্ত’ করা হোক। সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। সমাজে ও আইনে নারীর বিরুদ্ধে থাকা বৈষম্য দূর করা হোক। পোশাকের নিচে রয়েছে যে হৃদয়, মুজিবের আদর্শে- সততা, সাহস ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় সেই হৃদয় উজ্জীবিত হোক। তিনি বলেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।  স্বাধীনতা এসেছে। এবার মুজিববর্ষে শুরু হোক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মুক্তির নয়া সংগ্রাম।

লেখক : কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত