আক্রান্তের সংখ্যা দুই অঙ্ক ছুঁয়েছে

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ০২:৩১ এএম

বাংলাদেশে নতুন করে আরও দুজনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এদের একজন ইতালিফেরত এবং অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রফেরত একজনের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে দুজনকেই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল মঙ্গলবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। এ নিয়ে বাংলাদেশে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১০ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে  প্রথম দফায় তিনজন সুস্থ হয়ে ইতিমধ্যেই বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন সাতজন।

অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, নতুন আক্রান্ত দুজনই পুরুষ। তাদের মধ্যে একজন ইতালি থেকে ফেরার পর কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। তিনি সেখান থেকেই উপসর্গ নিয়ে এসেছেন। অন্যজন দেশেই ছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন এমন মানুষের সংস্পর্শে এসে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। সেই প্রবাসীর শরীরে সামান্য জ¦র ছিল, তবে তিনি রিপোর্ট করেননি। তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন। তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানানো হবে।

এ নিয়ে ১০ দিনে দেশে আক্রান্ত হলেন ১০ জন। এদের মধ্যে গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানায় আইইডিসিআর। আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন। ওই তিনজনের মধ্যে দুজন ইতালি থেকে এসেছিলেন। ইতালিফেরত একজনের পরিবারের সদস্য ছিলেন আক্রান্ত তৃতীয়জন। এরপর ১৪ মার্চ রাতে দেশে আরও দুজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্তের তথ্য দেওয়া হয়। এরপর গত ১৬ মার্চ সোমবার দেশে তিনজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানায় আইইডিসিআর। তিনজনের মধ্যে দুজন শিশু, একজন নারী। তারা সবাই ১৪ মার্চ আক্রান্ত এক বিদেশফেরত পরিবারের সদস্য। তার থেকেই তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান আক্রান্ত হয়। গতকাল মঙ্গলবার আক্রান্ত হলেন আরও দুজন।

আইইডিসিআর জানায়, বর্তমানে দেশে ১৬ জন আইসোলেশনে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে ৪৩ জন। আইইডিসিআরের নির্দেশনা : গতকালের সংবাদ সম্মেলন থেকে আইইডিসিআর রোগটি প্রতিরোধে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়। পরিচালক বলেন, পারিবারিকভাবে সেলফ কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি খুব শক্তভাবে পালন করার জন্য আমরা বারবার বলে আসছি। এখন পর্যন্ত রোগটি কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়ায়নি। বিদেশে থেকে এসেছেন বা আক্রান্ত হয়েছেন এমন ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।

আরেক নির্দেশনায় বলা হয়, বিদেশ থেকে এসেছেন এবং জ¦র, গলাব্যাথা অথবা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিয়েছে, কিংবা বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে এসেছেন  এমন কারও মধ্যে কভিড-১৯ রোগের উপসর্গ দেখা দিলে সরাসরি কোনো হাসপাতালে না গিয়ে আইইডিসিআরের হটলাইনে (০১৯৪৪৩৩৩২২২) ফোন করতে হবে।

কারও মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে তাকে নিজ উদ্যোগে আইইডিসিআরে না আসার জন্য অনুরোধ করা হয়। আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, এ ক্ষেত্রে আপনারা গণপরিবহনও ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে আপনাদের নিয়ে আসা হবে। প্রয়োজন হলে আইইডিসিআরের টিম গিয়ে বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে।

তবে হাঁচি, কাশি, সর্দি হলেই করোনাভাইরাস ধরে নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন নেই। অর্থাৎ রোগটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। এ কারণে হাঁচি-কাশি, সর্দি, গলাব্যথা এসব দেখা দিলেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না।

বিদেশি ক্রেতাদের না আসার পরামর্শ : বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সতর্কতা হিসেবে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে আইইডিসিআর। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, তৈরি পোশাক মালিকরা এ পরিস্থিতিতে করণীয় জানতে চেয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় বিদেশি ক্রেতারা আসেন। তারা যেন এই মুহূর্তে না আসেন। এ সময় বিদেশি ক্রেতারা এলে তাদের মাধ্যমেও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তারা যদি এসেও থাকেন তাহলে যেসব জায়গায় আমাদের অনেক কর্মী একসঙ্গে কাজ করেন সেসব জায়গায় যেন না যান।

গার্মেন্টসকর্মীদের জন্য সতর্কতা : আইইডিসিআর পরিচালক আরও বলেন, শুধু তৈরি পোশাক নয়, যেখানেই জনসমাগম হয় অথবা খুব কাছাকাছি বসে কাজ করতে হয় এসব কর্মস্থলের জন্য তাদের পরামর্শ আগে থেকেই রয়েছে। গার্মেন্টসগুলোয় যখন কর্মীরা প্রবেশ করে তখন তাদের পরীক্ষা করা হয়। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে জ¦র, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট আছে কি না তা পরীক্ষা করা দরকার। যদি এ ধরনের উপসর্গ থাকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে।

এসব উপসর্গ থাকা শ্রমিকদের সবেতন ছুটি মঞ্জুর করতে কারখানা মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, তাহলে তারা এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। তা না হলে জীবিকা হারানোর ভয়ে হয়তো তথ্য গোপন করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

তিনি বলেন, অন্যান্য অফিস বা প্রতিষ্ঠানের সেসব জায়গায় বা বস্তুতে মানুষের হাতের স্পর্শ লাগে, হাঁচি-কাশি দিলে সংক্রমণ হতে পারে। সেসব জায়গা কিছুক্ষণ পরপর পরিষ্কার করতে হবে এবং কিছুক্ষণ পরপর সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে। এ সময় অফিস বা বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান আইইডিসিআর পরিচালক। বিদেশফেরত, জ¦র আক্রান্তদের মসজিদে না যাওয়ার পরামর্শ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিদেশফেরত ব্যক্তি, করোনার লক্ষণযুক্ত ব্যক্তি এবং জ¦র-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মসজিদে না যাওয়াসহ জনসমাগম পরিহারের পরামর্শ দিয়েছে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় দেশে একটি বিশেষ অবস্থা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধসহ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সীমিত করা হয়েছে। বিশ্বে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে এবং নতুন নতুন লোক করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণাসহ বেশকিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কর্মসূচি সংকুচিত করা হয়েছে। জনসমাগম পরিহারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। গুজব-আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে জনমনে ভীতির সঞ্চার করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

আনিস মাহমুদ বলেন, ‘এ পটভূমিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিসহ সমগ্র মানবজাতিকে সুরক্ষা, নিরাপদ ও সতর্ক করার লক্ষ্যে এ বিষয়টি দেশের সব মসজিদে জুমার খুতবায় গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা এবং করোনাভাইরাস থেকে হেফাজতের জন্য মহান আল্লাহর দয়া, ক্ষমা ও করুণা প্রার্থনা করে বিশেষ দোয়া করার জন্য মসজিদের সম্মানিত খতিব ও ইমাম সাহেবদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত