সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ সময়সীমা আরও বাড়বে বলে সরকার জানিয়েছে। এই বন্ধ দেওয়া হয়েছে আমরা সবাই যেন ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘সঙ্গনিরোধ’ অবস্থায় বাসায় থাকি, নিরাপদে থাকি এবং আমাদের দ্বারা যেন কোনো সংক্রমণ না ঘটে বা আমরাও যেন সংক্রামিত না হই।
এই বন্ধ ট্যুরের জন্য না, সাজেক-বিছানাকান্দির জন্যও না কিংবা ক্রিমসন কাপ বা গুলশান-ধানমন্ডিতে আড্ডার জন্যও না। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা মানে এই নয় যে, এখন সর্বত্র তারা ঘুরে বেড়াবে এবং বেড়াতে যাবে’। প্লিজ এটা করতে যাবেন না। অভিভাবকরা এ ব্যাপারে সতর্ক হোন। কোচিং বন্ধ করা হয়েছে। প্রাইভেট শিক্ষকও বন্ধ করে দিন। আপনার ও আপনার সন্তানটির সুরক্ষা আগে দরকার। বাসায় যতটুকু পারেন সন্তানটিকে পড়াশোনা করান। আইসোলেশনে রাখুন।
দুই. যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধিবিষয়ক প্রধান ডা. অ্যান্থনি ফাউচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মানুষ বিপদের মাত্রা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি’। তিনি দুই সপ্তাহ বয়োবৃদ্ধ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের কাউকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। ৭৯ বছর বয়স্ক ফাউচি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ভিড়ের মধ্যে যাব না, রেস্তোরাঁয় যাব না। আমি এমন কিছু করব না, যার ফলে দুই সপ্তাহের জন্য নিজেকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়।’
একজন ইতালিয়ান ডাক্তার লিখছেন, ‘আমাদের দেশে এখন ঘটে চলছে ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডি। বৃদ্ধ রোগীরা মারা যাওয়ার আগে চোখের পানি ফেলছেন।’ এই ডাক্তারের লেখার মাধ্যমে সেখানকার মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল চোখের সামনে ভাসছে কী ভয়াবহ অবস্থা আমাদের বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে। করোনাভাইরাস মানুষকে এখন বাঁচার তাগিদে নিঃসঙ্গ করে তুলছে! করোনার এ সময় ব্যক্তিকে নিঃসঙ্গ থেকে আরও চরম একাকী করে তুলছে! মানুষ বস্তুত নিদারুণ অসহায়।
তিন. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যত দূর জানি ইতালিতে প্রয়োজনীয় কাজ, যেমন খাদ্য ও ওষুধ সংগ্রহ ছাড়া বাইরে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই নাগরিকদের ঘরের মধ্যে আইসোলেটেড করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে শুধু মসজিদে আজান দেওয়া হবে, মানুষ বাসায় নামাজ পড়বে। কাজেই আমাদের দেশেও এ ব্যাপারে সবার আত্মসচেতনতা দরকার। প্রয়োজনে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে নামাতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারসহ সবাইকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। যাদের অফিসের কাজ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, বাসায় থেকে অফিসের কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে, তারাও সতর্ক থাকুন। নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের। অন্তত দুটি সপ্তাহ নিজেকে কোয়ারেন্টাইনে রাখুন। এখন প্রিয়জনকে সময় দিন, প্রিয়জনের কাছেই থাকুন। নিশ্চয় সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আমরা এ মহামারী থেকে রক্ষা পাব।
সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে এসব কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশনা দিয়েছে, মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে টেলিফোন কনফারেন্স বা অনলাইনে এমন কাজ সারতে। ডেস্ক, টেবিল, টেলিফোন, কিবোর্ড ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। নিজেদের ঘর, ঘরের চারপাশকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। এক পোশাক এক দিনের বেশি পরবেন না। হাত ধোয়ার মতো পোশাকও প্রতিদিন ধুয়ে ফেলতে হবে।
যারা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন বা দেওয়ার কথা ভাবছেন, আপনি কি নিজে সুরক্ষিত? অথবা সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা রাখছেন? সাধারণ সতর্কতা, পরিকল্পনা ও তৎপরতায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের কর্মী এবং পুরো প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি একা সংক্রমিত হচ্ছেন না, আপনার সঙ্গে এ দেশটা সংক্রমিত হচ্ছে।
চার. বাংলাদেশে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর কারণ জনসংখ্যার ঘনত্ব, সাধারণ মানুষের মধ্যে অসচেতনতা ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মশিউল আলম লিখেছেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে আমরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাব না।’ কথাটা একদমই সত্য। পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্সদেরও রোগীদের সেবা দেওয়ার মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এর মধ্যে চীনসহ আক্রান্ত দেশ ও অঞ্চল ১৬০টির বেশি। তাই বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারকে আগাম ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাতে পরিস্থিতি সামলানো কিছুটা সহজ হবে এবং ঝুঁকি কমবে। তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও দরকার। এই ভাইরাসে আক্রান্ত জনগণকে শনাক্ত বরার প্রয়োজনে আগ্রহী সব নাগরিক যাতে বিনামূল্যে পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসার সুযোগ পান, সেই দাবি জানাচ্ছি। প্রথম আলোর সংবাদে জানা যায়, করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য যে টেস্টের প্রয়োজন, তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আগামী কয়েক দিনে এই পরীক্ষার সুযোগ বাড়াতে না পারলে মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে।
পাঁচ. করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এত বেশি এখন যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে যেখানে সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকায় ‘লকডাউন’ করার জন্য সরকারের প্রতি সুপারিশ করেছে। ইতিমধ্যে ‘শিবচর’ উপজেলায় ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সরকার আরও সিরিয়াস হতে পারে। আমরা সংবাদমাধ্যমে জানতে পারছি করোনার আক্রান্ত সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এটা আমাদের জন্য উদ্বেগের।
প্রবাসফেরতদের যথাযথভাবে ‘কোয়ারেন্টাইন’ করতে পারলে বা ‘ঘরবন্দি’ রাখতে পারলে, তাদের পরিবারগুলোকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারলেও করোনার বিস্তার অনেকটা রোধ করা সম্ভব হতে পারে। এটা সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে করতে পারবে নাকি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষের সহায়তা নিয়ে করবে, সেটা সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এদের দরকারি সব জিনিস স্থানীয়ভাবে নিরাপদ পদ্ধতিতে বাড়িতে সরবরাহ করতে হবে এবং এরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিল দেবে। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে এদের এবং এদের পরিবারের কেউ যাতে বাড়ির বাইরে না যায়। ইতালি, ফ্রান্সের মতো আমাদের দেশেও এ দুর্যোগ মুহূর্তে সরকার সেনাবাহিনীকে নামাতে পারে। তা না হলে লকডাউন কঠিন হয়ে পড়বে।
ছয়. করোনাভাইরাস নতুন সংকট বা নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে যাবে ভবিষ্যতের বাস্তবতা! ব্যয় সংকোচন করুন। করোনাভাইরাসের প্রভাব এতটা শোচনীয় যে, অর্থনীতিতে এর প্রভাব সারা বিশ্বে ইতিমধ্যে পড়ছে এবং আরও ভয়াবহ অভিঘাতের সমূহ আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধের দামামার প্রভাব এতটা পড়ে না, যতটা এ রোগের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সমগ্র বিশ্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন সর্বাত্মক প্রতিরোধ প্রস্তুতি দেখেনি বিশ্ব। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদের মনোনয়নের জন্য প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, এই মহামারীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আসন্ন বিশ^মন্দায় দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে। মন্দার দুর্যোগকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে ফায়দা লুটতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিন। এদের রুখে দিতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর
