করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে আরও একজন মারা গেছেন। গত শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে তিনজনের আক্রান্তের কথা জানিয়েছিল, তাদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব এই ব্যক্তি ছিলেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। এর ফলে দেশে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল দুজনে। এ ছাড়া করোনায় গতকাল নতুন করে আরও চারজন আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াল ২৪। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কমিটির সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আক্রান্ত ও মৃত্যুর এ তথ্য জানান।
সত্তরোর্র্ধ্ব ব্যক্তির মৃত্যুর পর রাজধানীর মিরপুরের তার বাসাটিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) নির্দেশে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তি নিজে কিংবা তার পরিবারের কেউ বিদেশফেরত ছিলেন কি না এবং তিনি আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে ছিলেন কি না, তা এখনো জানতে পারেনি আইইডিসিআর। মৃত বৃদ্ধ একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। শনিবার তার মৃত্যুর পর ওই বাড়ির প্রায় ৪০ জন বাসিন্দাকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, বাড়িটি ‘লকডাউন’ করা হয়েছে। ওই ভবন ও তার আশপাশে চলাচলও সীমিত করা হয়েছে।
গতকাল মারা যাওয়ার পর ওই বৃদ্ধ তার বাসা সংলগ্ন যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, মৃত্যুর পর ওই হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়দেরও কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে হাসপাতাল বা আইইডিসিআরের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় স্থানীয়দের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেখানে বিদেশফেরতদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন শুধু ওষুধের দোকান এবং অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া বাকি সবকিছু বন্ধ থাকার নির্দেশ দেয়। এমনকি ওই উপজেলায় বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে পারবে না ও সেখানকার লোকজন বেরুতেও পারবে না।
গতকাল রাজধানীর মিরপুরের ওই ভবনের সামনে সাধারণ মানুষ ভিড় করে ছিলেন। কিছু পুলিশ সদস্যকেও সেখানে অবস্থান করতে দেখা গেছে। পুলিশের ভাষ্য, মিরপুরের ওই ভবনের বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মারা যাওয়া এক ব্যক্তির পরিবার রয়েছে ওই ভবনে। আইইডিসিআর থেকে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তারা কেউ বাইরে ঘোরাফেরা না করেন।
গতকাল শনিবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোস্তাক আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই ভবন সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক রোগী মারা গেছেন। ওই রোগীর পরিবারের ৫-৬ সদস্যকে হোম কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক পালনের নির্দেশনা দিয়েছে আইইডিসিআর। ভবনের অন্যদের বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা যেন বাসায় থাকে সে বিষয়টি দেখভালের জন্য পুলিশের কয়েকজন সদস্য ছিলেন।
করোনায় মারা যাওয়া বৃদ্ধ যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে বলে আইইডিসিআর জানিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, রোগী গত মঙ্গলবার কল্যাণপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। তার হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষ-নিরীক্ষার পরও রোগ ধরা পড়েনি। সেখানে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ১৭ মার্চ পৌনে ৫টার দিকে কল্যাণপুরের ওই হাসপাতাল থেকে থেকে তাকে মিরপুরের হাসপাতালটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়ায় তাকে একজন বক্ষব্যাধি চিকিৎসক পরীক্ষ-নিরীক্ষা করেন। তিনিই প্রথম আশঙ্কা করেন রোগী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
ওই হাসপাতাল এ বিষয়ে আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা নমুনা সংগ্রহ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বলা হয়, ওই ব্যক্তি বিদেশফেরত নন, তিনি বিদেশফেরত কারও সংস্পর্শেও আসেননি। ওই চিকিৎসক আরও বলেন, রোগী হাসপাতালে ভর্তির পর তার ব্যাপারে সরকারের উচ্চপদস্থ লোকজন খোঁজখবর করেন। তাদের তদবিরেই পরে পরীক্ষা করা হয়। গতকাল মিরপুরের ওই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয় রোগী করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন।
অবশ্য এসব ব্যাপারে কথা বলতে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাওয়া যায়নি। ফোন ধরলেও এ বিষয়ে আইইডিসিআর কথা বলবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেন ফোন ধরেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনায় মারা যাওয়া বৃদ্ধ কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিলেন কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। অবশ্যই তিনি কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে গেছেন।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, মৃত ব্যক্তি যে বাসায় ছিলেন, সে বাসার সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। তা ছাড়া তিনি (মৃত ব্যক্তি) ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই ভবনের অন্য কারও সঙ্গে মিশেছেন কি না, সেটা দেখতে ওই ভবনের অন্যদেরও সীমিত চলাফেরা করতে বলা হয়েছে। ওই ভবনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে ভবনটিকে ‘লকডাউন’ করা হয়েছে কি না, তা এই কর্মকর্তা বলতে পারেননি। তবে তিনি বলেছেন, অন্যদের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
হাসপাতালের ব্যাপারে এই কর্মকর্তা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, বিশেষ করে আইসিইউ বিভাগের কিছু চিকিৎসক ও নার্সকে আমরা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলেছি। খুঁজে দেখছি, আর কেউ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে গেছেন কি না। গেলে তাদেরও কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। তবে হাসপাতালের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি।
১৯ জন হাসপাতালে, তিনজন সুস্থ : সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, মোট আক্রান্ত ২৪ জনের মধ্যে তিনজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বাকি ১৯ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঠেকাতে শনাক্ত রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন, এমন সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বিদেশ ফেরত সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলছে কোয়ারেন্টাইন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গতকাল পর্যন্ত মোট কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৬৭৩ জনকে। এর মধ্যে বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৫ হাজার ১৭২ জন। গতকাল পর্যন্ত মোট আইসোলেশনে ছিলেন ১৪৭ জন। এদের মধ্যে বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন ৪০ জন। এই মুহূর্তে ৫০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। আর বিদেশফেরতদের মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার ২৬৪ জন।
মোট আক্রান্ত ২৪ : গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে তিনজন আক্রান্ত হন। এই তিনজনের মধ্যে দুজন ইতালি থেকে এসেছিলেন। ইতালিফেরত একজনের পরিবারের সদস্য ছিলেন আক্রান্ত তৃতীয়জন। এরপর গত ১৪ মার্চ আরও দুজন আক্রান্ত হন। এই দুজন ইউরোপের দেশ ইতালি ও জার্মানি থেকে এসেছিলেন। ১৬ মার্চ একই পরিবারের তিনজন আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে এক নারী ও দুই শিশু। এরা ১৪ মার্চ আক্রান্ত দুজনের মধ্যে একজনের মাধ্যমে সংক্রামিত হন। ১৭ মার্চ মঙ্গলবার আরও দুজন আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে বিদেশফেরত একজন হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন, অন্যজন বিদেশফেরত একজনের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হন। ১৮ মার্চ বুধবার নতুন করে চারজন একজন নারী ও তিনজন পুরুষের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তাদের মধ্যে একজন আগে আক্রান্ত একজনের পরিবারের সদস্য। বাকি তিনজন বিদেশফেরত, দুজন ইতালি থেকে এবং একজন কুয়েত থেকে আসা। ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার তিনজন আক্রান্ত হন। একজন নারী, বয়স ২২ বছর। আর দুইজন পুরুষ; একজনের বয়স ৬৫ বছর, অন্যজনের ৩২। এই তিনজনই স্থানীয়ভাবে সংক্রামিত হয়েছেন এবং একই পরিবারের সদস্য। তারা ইতালি ফেরত একজনের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তিনিও ওই পরিবারের সদস্য এবং আগেই আক্রান্ত হয়েছেন। ২০ মার্চ শুক্রবার আরও তিনজন আক্রান্ত হন। তিন জনের মধ্যে একজন নারী ও দুজন পুরুষ। আক্রান্ত নারীর বয়স ৩০ বছর। পুরুষ দুজনের মধ্যে একজনের বয়স ৩০ বছর, অন্য জনের ৭০ বছর। ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল এবং তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। আক্রান্ত নারীর সংক্রমণ ছিল মৃদু। আর পুরুষ যার বয়স ৩০, তার বার্লিন-বনসহ ইউরোপ ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার আরও চারজন আক্রান্ত হন।
