বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ মাস সংগ্রাম ও প্রতিরোধের মাস হিসেবে অমর হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল মার্চের কথা সবারই জানা। এবারের মার্চ মাসও বিশেষভাবে তাৎপর্যময়। গত ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ’ শুরু হলো। ‘মুজিববর্ষ’ শেষ হবে আগামী বছর ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে। আর আগামী স্বাধীনতা দিবসেই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে পদার্পণ করবে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরেই দেশের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শততম বার্ষিকী উদযাপিত হবে। এই ধারাবাহিকতায় তার পরের বছর ২০২২ সালে ভাষা আন্দোলনের ৭০তম বার্ষিকীতে পা রাখবে বাংলাদেশ। এভাবে কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক আবর্তনে উপস্থিত হয়েছে। ইতিহাসের এই আবর্তন জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহত্তম ঘটনাবলিকে ফিরে দেখার, নতুনভাবে মূল্যায়নের, নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার এবং নতুন প্রত্যয়ে জেগে উঠবার প্রেরণা জোগাতে পারে দেশের মানুষকে।
কিন্তু মহাকাল আজ শুধু বাংলাদেশ নয় সারা পৃথিবীকেই এক অভূতপূর্ব মহাদুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর কবল থেকে জনগণকে বাঁচাতে পৃথিবীর প্রায় দুই শত রাষ্ট্রকে এখন এক মরণপণ লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই মহামারী কয়েক ধাপে আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমনি রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষকরাও ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে, করোনা মহামারীতে মানুষের মৃত্যু ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে এর প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা। বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা মহামারীর অর্থনৈতিক অভিঘাতে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য এবং রূপরেখাও পাল্টে যেতে পারে। আবার করোনা মহামারীতে বিশ্বব্যাপী আকাশপথ, নৌপথ ও স্থলপথের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং দেশে দেশে সর্বাত্মক সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় পৃথিবীব্যাপী অভাবনীয় মাত্রায় পরিবেশ দূষণ কমে গেছে। একইসঙ্গে সামনে চলে আসছে দেশে দেশে মানুষের সহমর্মিতা, ঐক্য ও সম্মিলিত প্রয়াসের অভূতপূর্ব সব দৃশ্য। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনা মহামারীর এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিলে মানুষ হয়তো এই মহাদুর্যোগ কাটিয়ে উঠে আগামীর এক নতুন পৃথিবী গড়ার অনুপ্রেরণা পেতে পারে।
করোনা মহামারীর কারণে যেমন এবার মুজিববর্ষের বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানমালাও আড়ম্বরহীন ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে সারা দেশকে ইতিমধ্যেই প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সব ধরনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় সভা-সমাবেশ ও জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। একইসঙ্গে চলছে, করোনা মহামারীর নানাবিধ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু একটা বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট যে, অত্যন্ত সংক্রামক এই মহামারী মোকাবিলায় বাংলাদেশের সন্তোষজনক ও সমন্বিত জাতীয় প্রস্তুতি ছিল না। এই দুর্যোগে একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের ভঙ্গুর দশা, চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। ক্ষুদ্র আয়তনে বিপুল জনঘনত্ব ও বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে এমন কোনো স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা যে কতটা অপ্রস্তুত সম্ভবত তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে করোনা।
দুর্যোগ তা প্রাকৃতিকই হোক কিংবা মানবসৃষ্ট, মানুষকে সম্মিলিতভাবেই সেটা মোকাবিলা করতে হয়, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। আজ এই বৈশ্বিক মহামারীর কালে ইতিহাসের এই শিক্ষা আমাদের মনে রাখতে হবে। সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে সঠিকপথে পরিচালিত করে সরকার শক্ত হাতে এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করবে দেশের মানুষ সেটাই আশা করে। সরকারকে যেমন এই কঠিন সময়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সক্ষমতার পরীক্ষা দিতে হবে, তেমনি জনগণকেও যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়ে নিজেদের রক্ষায়, দেশের মানুষকে রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়ে লড়াই করতে হবে। আশঙ্কার কথা হলো, আমরা কেউই এখনো জানি না যে করোনা মহামারীর অভিঘাত এদেশে কতটা মারাত্মক হতে পারে। আর আশার কথা হলো, কোনো দুর্যোগই চিরস্থায়ী নয়; সরকার ও জনগণ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে একত্রিত হলে সম্মিলিত জাতীয় সক্ষমতায় অবশ্যই এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে, মুজিববর্ষে দাঁড়িয়ে আজ ইতিহাসের এই আবর্তন আর বর্তমানের এই মহাদুর্যোগ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সক্ষমতা এবং প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব আমাদের করতেই হবে। এই মহাদুর্যোগ কাটিয়ে উঠে আমরা কি আবারও পুরনো পথেই হাঁটব, নাকি নতুন এক বাংলাদেশ, নতুন এক পৃথিবী গড়ার মহাযজ্ঞে শামিল হব, সে সিদ্ধান্ত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকেই নিতে হবে। সবাইকে মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।
