করোনাভাইরাসের পরের দুনিয়া: ইউভাল নোয়াহ্‌ হারারি

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২০, ০৮:১৩ পিএম

মানবসভ্যতা এখন এক বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করছে। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট এটি। আগামী কয়েক সপ্তাহে সরকার ও জনগণ মিলে যেভাবে এ সংকট মোকাবিলা করবে সেভাবে তৈরি হবে আগামীর পৃথিবী। শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নয় এ সংকট কাল আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি সংস্কৃতিকেও নতুনভাবে বিন্যস্ত করবে। আমাদের উচিত এসব বিবেচনায় নিয়ে তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা। আমাদের এখনকার কর্মকাণ্ডের ফলাফল ভবিষ্যতে কী হিসাবে দেখা দেবে তা নিয়ে ভাবা উচিত। এই চলমান হুমকি মোকাবিলায় আমরা যখন কোনো বিকল্প উপায় বেছে নেব, তখন আমাদের অবশ্যই এটাও ভাবতে হবে, এ ঝড় থেমে গেলে আমাদের সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে। হ্যাঁ- এই ঝড় থেমে যাবে, মানবসভ্যতা টিকে থাকবে- আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই বেঁচে যাবে- কিন্তু আমরা তখন বসবাস করব এক নতুন পৃথিবীতে। এ সময়ে নেয়া অনেক ছোট ছোট জরুরি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের জীবনে অপরিহার্য হয়ে দেখা দেবে। এটা হলো জরুরি অবস্থার স্বভাব। এভাবে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়।    

সাধারণ সময়ের একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হতে হয়ত বছরখানেক সময় লাগত যা এখন ঘণ্টার ব্যবধানেই ঘটে যাওয়া সম্ভব। এখন অপ্রস্তুত এবং ভয়ংকর প্রযুক্তিকে জোর করে ব্যবহার করা হচ্ছে, কারণ কিছু না করা এরচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। গোটা দেশ একটা গিনিপিগের মতো অবস্থায় বড় ধরনের সামাজিক পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত। কী ঘটবে যখন সবাই ঘরে বসে কাজ করতে থাকবে আর দূরত্ব রেখে যোগযোগ করবে? কী ঘটবে যখন সব স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে চলে যাবে? স্বাভাবিক সময়ে সরকার, ব্যবসা, শিক্ষা বোর্ড কখনোই এমন অভিজ্ঞতা নিতে রাজি হতো না। কিন্তু এখন আর স্বাভাবিক অবস্থা নেই। এই সংকটের সময়ে, আমাদের দুটি বিষয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে, সর্বাত্মক নজরদারি এবং নাগরিকদের ক্ষমতায়নের মধ্যে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা ও বৈশ্বিক ভাতৃত্বের মধ্যে।  

চামড়ার নিচেও নজরদারির বিস্তৃতি

এই মহামারি থামাতে গোটা জনগোষ্ঠিকেই একটি সঠিক দিকনির্দেশনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এটা করার জন্য দুটি পদ্ধতি আছে মূলত। এর একটি হলো, সরকারকে সাধারণ মানুষের ওপর তদারকি চালাতে হবে এবং যারা এ নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদের শাস্তি দিতে হবে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ প্রথম প্রযুক্তি সম্ভব করেছে একই সময়ে সব মানুষকে নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার। পঞ্চাশ বছর আগে, কেজিবির (সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা) পক্ষে সম্ভব ছিল না ২৪০ মিলিয়ন সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির আওতায় রাখা, অথবা কেজিবি ভাবতেও পারত না কার্যকরভাবে সব তথ্য সাজিয়ে রাখার কথা। কেজিবি সর্বোচ্চ যা ভাবতে পারত তা হলো কোনো মানুষকে প্রতিনিধি বা বিশ্লেষক হিসাবে পাঠানোর কথা, কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে সব মানুষকে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব ছিল না। আর এখন সরকার রক্তমাংসের প্রতিনিধির পরিবর্তে আস্থা রাখতে পারছে সর্বব্যাপী সেন্সর অথবা শক্তিশালী অ্যালগরিদম ব্যবস্থার ওপর।     

মহামারি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অনেক সরকারই ইতিমধ্যে তাদের সার্ভিল্যান্স যন্ত্রপাতি মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি এটা ঘটেছে চীনে। তারা খুব কাছ থেকে মানুষের স্মার্টফোনের ওপর নজরদারি চালিয়েছে, চেহারা চিহ্নিত করা যায় এমন কয়েক মিলিয়ন ক্যামেরা তারা স্থাপন করেছে, উদ্যোগী হয়ে নাগরিকদের শারিরীক তাপমাত্রা পরীক্ষা করেছে, চিকিৎসার অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিয়েছে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে খুব দ্রুত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে তা নয়, উপরন্তু তাদের গতিবিধিও পরিমাপ করেছে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কার সংস্পর্শে এসেছে তাও জেনে নিয়েছে। মোবাইল অ্যাপস এর মাধ্যমে নাগরিকরা আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছে।

পূর্ব এশিয়াতেও এ ধরনের প্রযুক্তির উপস্থিতি অপ্রতুল নয়। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের নিরাপত্তা এজেন্সিকে সন্ত্রাসী খুঁজে বের করতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দিয়েছিল তা দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী খুঁজে বের করার অনুমতি দিয়েছে। যদিও সংসদে উপকমিটি যখন এ কর্তৃত্বের বিরোধিতা করেছিল, তখন নেতানিয়াহু জরুরি ডিক্রি হিসেবে তা জারি করেন। আপনি হয়ত যুক্তি দেখাবেন যে, এতে তো নতুন কিছু নাই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার এবং করপোরেশনগুলো এরচেয়েও সুক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করছে নজরদারি চালাতে, গতিবিধি চিহ্নিত করতে, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তারপরও আমরা যদি সতর্ক না থাকি, এই মহামারি সম্ভবত ইতিহাসে সার্ভিল্যান্সের এক গভীর দাগ হিসেবে থেকে যাবে। এটা শুধু এ কারণে ঘটবে না যে যেসব দেশে এতদিন ধরে সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা প্রয়োগের বিরোধিতা চলে আসছিল তাদের জন্যও বিষয়টা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, বরং আরো গুরুতর হলো এটা এখন চামড়ার ওপর থেকে চামড়ার ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মতো নাটকীয় পরিবর্তনকেও স্বাভাবিক করে তুলবে। এ যাবৎ, যখন আপনি স্মার্টফোনের কোনো লিংকে ক্লিক করবেন তখন সরকার জানতে চাইত কোন লিংকে আপনি আসলে ক্লিক করলেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের সময়ে বিষয়ের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন সরকার জানতে চায় আপনার আঙুলের তাপমাত্রা কত, চামড়ার নিচে থাকা ব্লাড প্রেসার কত।       

জরুরি নামের পুডিং

সার্ভিল্যান্সের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে আমরা সবাই একটা সমস্যায় পড়ি সেটা হলো, কীভাবে আমাদের ওপর নজরদারি চালান হচ্ছে তা আমরা কেউ জানতে পারি না, এবং এর ফলে ভবিষ্যতে কী ঘটবে। সার্ভিল্যান্স প্রযুক্তি চোখের পলকের মতো দ্রুত গতিতে উন্নত হচ্ছে, সায়েন্স ফিকশনে গত ১০ বছর আগে যা দেখা যেত তা আজ পুরানা খবর। যদি আমরা ভাবি এমন এক সরকারের কথা যে নাগরিকদের বাধ্য করবে এমন একটি বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে যা শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃদস্পনন্দন পরিমাপ করবে লাগাতার ২৪ ঘণ্টা। যার ফলাফল জমা পরবে সরকারের কাছে এবং তারা তার বিচার-বিশ্লেষণ করবে নিজস্ব পদ্ধতিতে। যে পদ্ধতিতে আপনি জানার আগেই সরকার জানতে পারবে যে আপনি অসুস্থ, এ ছাড়া তারা জানবে কোথায় আপনি ছিলেন আর কার সঙ্গে দেখা করেছেন।    

এভাবে সংক্রমণের ধারা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, হয়ত নিশ্চিহ্নই করে দেওয়া যাবে। এ ধরনের ব্যবস্থা কয়েক দিনে যৌক্তিকভাবে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে এ মহামারিকে স্তব্ধ করে দিতে। খুব দারুণ শোনাচ্ছে তাই না? কিন্তু এর অপর দিক হলো, অবশ্যই এর মাধ্যমে ভয় জাগানিয়া নতুন এক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনি হয়ত জানেন, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি যদি সিএনএন এর কোনো লিংক এর পরিবর্তে ফক্স নিউজের কোনো লিংক এ ক্লিক করি তাহলে আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিষয়ে আপনাকে তা কিছু একটা ধারণা দেবে এবং আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও। কিন্তু যদি আপনি মনিটর করেন আমার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, আর আমি কী ভিডিও দেখি, কী আমাকে হাসায়, কোনটা আমাকে কাঁদায়, আর কোন পরিস্থিতিতে আমি খুব, খুব রেগে যাই! 

এটা হয়ত ভাবা কষ্ট যে জ্বর বা সর্দির মতো রাগ, আনন্দ, বিরক্তি, প্রেম এগুলোও জৈবিক ঘটনা। যে প্রযুক্তি কফকে চিহ্নিত করতে পারে তা হাসিকেও চিহ্নিত করতে পারবে। যদি করপোরেশন বা সরকার গণহারে আমাদের তথ্য উৎপাদন করেই যেতে থাকে, তাহলে তারা আমাদের বিষয়ে আমাদের চেয়ে ভালো জানতে পারবে, তখন কিন্তু তারা আমাদের অনুভূতিগুলো শুধু অনুমান করেই বসে থাকবে না তারা এর ওপর নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করবে এবং তারা যা চাইতে বা আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারবে- হোক সেটা পণ্য অথবা রাজনীতিবীদ। 

বায়োম্রেট্রিক তদারকি

ভাবুন, ২০৩০ সালের উত্তর কোরিয়া, যেখানে নাগরিকরা ২৪ ঘণ্টা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরে আছেন। আর যখন বেজে উঠবে তাদের মহান নেতার ভাষণ, যা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কেউ রেগে উঠলেই তা ধরা পড়ে যাবে হাতের ব্রেসলেটে, তখন কী যে ঘটবে।

আপনি অবশ্যই এই বায়োমেট্রিক সার্ভিল্যান্সকে জরুরি অবস্থার সময়ের সমাধান হিসেবে মেনে নিতে পারেন। যা জরুরি অবস্থার সঙ্গে সঙ্গেই দূর হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু সাময়িক পদক্ষেপের একটা বাজে স্বভাব হলো জরুরি অবস্থার পরও তা থেকে যায়, যেহেতু নতুন একটা জরুরি অবস্থার আশঙ্কা সবসময়ই লুকিয়ে থাকে। আমার নিজের দেশ ইসরায়েলে, উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো যার আওতায় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ছিল এবং ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে পুডিং বানানোর বিশেষ ব্যবস্থাও (আমি কৌতুক করছি না)। স্বাধীনতার যুদ্ধ শেষ অনেক আগেই, কিন্তু ইসরায়েল কখনো জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় নাই, এবং ১৯৪৮ সালের অনেক সাময়িক ব্যবস্থা বাতিল করতেও ব্যর্থ হয়েছে (জরুরি পুডিং ডিক্রি সৌভাগবশত ২০১১ সালে বাতিল হয়।)

যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে, তখন কিছু তথ্য সংগ্রাহক সরকার হয়ত যুক্তি দেখাবে, বায়োমেট্রিক সার্ভিল্যান্স চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে তারা দ্বিতীয়বার করোনাভাইরাসের আক্রমণের আশঙ্কা করছে, অথবা নতুন করে ইবোলার অভিঘাত দেখা দিয়েছে আফ্রিকায় অথবা ধরুন অন্য কোনো অজুহাত তারা তুল ধরল। আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিরুদ্ধে একটা বিশাল যুদ্ধ হয়ে গেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। করোনাভাইরাস নিয়ে সংকট সম্ভবত এর সর্বোচ্চ বিন্দু। কারণ এ সময়ে মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় গোপনীয়তা না স্বাস্থ্য কোনটা তুমি চাও, তারা অবশ্যই জবাব দেবে স্বাস্থ্য।  

সাবান পুলিশ

মানুষকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা স্বাস্থ্যের মধ্যে যে কোনো একটি বিষয় বেছে নিতে বলা, মূলত এই সমস্যার গোড়ার সংকট। কারণ এভাবে নিজের পছন্দ বেছে নেয়ার পদ্ধতিটি প্রতারণার মতো। আমরা পারি এবং আমাদের উচিত স্বাস্থ্য এবং নিজস্বতা দুটোই উপভোগ করা। আমরা চাইলে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারি এবং মহামারি করোনাভাইরাসকে তাড়াতে পারি সর্বাত্মক নজরদারির ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত না করেই, বরং নাগরিকদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তা করতে পারি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরকে মহামারি করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সফল উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। যদিও এসব দেশে কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারে নজরদারি চালানো হয়েছে, তবে তারা নির্ভর করেছে বিপুল পরীক্ষা, যথাযথ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং তথ্যসমৃদ্ধ জনগণের স্বেচ্ছা সহযোগিতার ওপর।  

কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা এবং কঠোর শাস্তিই জনগণের উপকারের জন্য অপরিহার্য তরিকা নয়। যখন মানুষ বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ব্যাখ্যা জানতে পারবে এবং মানুষ জনপ্রশাসনের ওপর বিশ্বাস করবে এ বিষয়ে জানার জন্য, তখন নাগরিকরা সঠিক কাজটিই করতে পারবে তাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে নজরদারি চালানো বড় ভাইদের ছাড়াই। উদাহরণ হিসেবে ধরে নেয়া যাক হাত ধোওয়ার কথা। মানুষের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উদভাবন। এই সামান্য একটি কাজ প্রতিদিন লাখো মানুষেরর জীবন রক্ষা করছে। যখন আমরা এ বিষয়টি মেনে নিতে শুরু করি, সেই ১৯ শতকে বিজ্ঞানীরা সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার সুবিধা আবিষ্কার করার পর থেকে। এর আগ পর্যন্ত এমনকি চিকিৎসক, নার্সরাও এক অপারেশন থেকে আরেক অপারেশনে যাওয়ার আগে হাত ধুতেন না। আর এখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন তাদের হাত ধুচ্ছে, এর কারণ এটা নয় যে তারা সাবান পুলিশের ভয় পাচ্ছে, বরং তারা নিজেরা বুঝতে পারছে বলেই হাত ধুচ্ছে। আমি আমার হাত ধুয়ে নিচ্ছি কারণ আমি ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছি, আমি জেনেছি যে এসব ক্ষুদ্র জীব রোগের কারণ, এবং আমি এও জানি যে সাবান এদের দূর করে দেয়।  

কিন্তু এই পর্যায়ের বোঝাপড়া এবং সহযোগিতায় পৌঁছাতে প্রয়োজন হয় বিশ্বাসের। মানুষকে বিজ্ঞান বিশ্বাস করতে হয়, সরকারি প্রশাসনকে বিশ্বাস করতে হয়, গণমাধ্যমেও ভরসা রাখতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবীদরা বিজ্ঞানের ওপর বিশ্বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে নস্যাৎ করেছেন, কী প্রশাসনে থেকে, কী গণমাধ্যমের কল্যাণে। এখন সেসব দায়িত্বহীন রাজনীতিবীদরা কর্তৃত্ববাদের মহাসড়কে ওঠার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, এই যুক্তি দেখিয়ে যে সব মানুষ সবসময় সঠিক দায়িত্ব পালন করবে এর ওপর আস্থা রাখা যায় না। সাধারণত যে বিশ্বাস একেবারেই হাজির নেই তা একরাতে ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এখন সেই স্বাভাবিক সময় নয়। একটা সংকটের সময়ে, মন বদলে যেতে সক্ষম দ্রুতই। নিজের ভাইয়ের সঙ্গে আপনার বছরের পর বছর তিক্ত কথাবার্তা চলতে পারে, কিন্তু যখন কোনো জরুরি ঘটনা ঘটবে আপনি সহসা বুঝতে পারবেন যে আপনাদের মধ্যে কোথাও একটা পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের জায়গা থেকে গেছে এবং আপনারা দ্রুত একে অপরকে সাহায্য করার জন্য ছুটে যাচ্ছেন। একটা নজরদারিমূলক ব্যবস্থা কায়েম করার চেয়ে এখন উপযুক্ত সময় হলো বিজ্ঞান, সরকার, গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার।

আমরা অবশ্যই নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যহার করব, কিন্তু এসব প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে নাগরিকদের ক্ষমতায়নের জন্য। আমি নিজেই নিজের শরীরের তাপমাত্রা বা রক্তচাপের খবর নিতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করব, কিন্তু আমি চাইব না এসব তথ্য ব্যবহার করে একটা সর্বশক্তিমান সরকার গড়ে উঠুক। উল্টো আমি চাইব নিজের বিষয়ে এসব তথ্য আমাকে কোনো একটা সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে, এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তা কার্যকর হবে। আমি যদি নিজেই দিনে ২৪ ঘণ্টা নিজের শরীরের অবস্থা তদারকিতে সক্ষম হই এবং তাহলে আমি বুঝতে পারব যে কখন আমি অন্য মানুষের স্বাস্থ্যহানির জন্য দায়ী হব, আরো বুঝতে সক্ষম হব কোন অভ্যাস আমার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এ ছাড়া যদি আমি করোনাভাইরাসের বিস্তৃতির বিষয়ে বিশ্বস্ত পরিসংখ্যানে অবাধ প্রবেশের সুযোগ পাই, তখন আমি বুঝতে পারব যে সরকার আসলেই আমাকে সত্যটা বলছে কি না এবং এই মহামারি প্রতিরোধে তারা সঠিক ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না তা বুঝতে পারব।

যখনই মানুষ কথা বলে নজরদারি বিষয়ে, তখন এটা মনে রাখতে হবে যে এসব নজরদারির প্রযুক্তি কেবল সরকার যে ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করতে পারে তা নয়- ব্যক্তিও তার প্রয়োগ ঘটাতে পারবে সরকারের ওপর। সে জন্য করোনাভাইস মহামারি নাগরিকত্বেরও এক ধরনের পরীক্ষা। আসছে দিনগুলোতে, আমাদের প্রত্যেকের উচিত হবে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করা বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং স্বার্থপর রাজনীতিবীদদের দিকে মনযোগ না দিয়ে। যদি আমরা নিজেদের পছন্দ বেছে নিতে সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে যেতে না পারি, তখন আমাদের গাইতে হবে বিদায়ী স্বাধীনতার গান, এটাই ভাবতে বাধ্য থাকব যে এভাবেই একমাত্র সুরক্ষিত থাকবে আমাদের স্বাস্থ্য।   

আমাদের প্রয়োজন বৈশ্বিক পরিকল্পনা

দ্বিতীয় যে পছন্দের বিষয়ে বলা হচ্ছে তা জাতীয়বাদাী বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক সৌহার্দ্য নিয়ে। মহামারি স্বয়ং এবং এর ফলে অর্থনৈতিক সংকট এখন বিশ্বজুড়ে বিরাজিত দুই সমস্যা। এদের সমাধান একমাত্র হতে পারে বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে। প্রথমত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ভাইরাসকে পরাস্ত করতে আমাদের প্রয়োজন বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা।  এটা হবে ভাইরাসের ওপর মানুষের বিজয়ের সবচেয়ে বড় উপায়। চীনের এক করোনাভাইরাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা করোনাভাইরাস আলাদা নিয়মে মানব শরীরকে আক্রান্ত করবে না। কিন্তু চীন যুক্তরাষ্ট্রকে শেখাতে পারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করোনাভাইরাস বিষয়ে এবং একে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সে বিষয়ে। ইতালির মিলানে কোনো বিজ্ঞানী যা আজ সকালে আবিষ্কার করবেন তা সন্ধ্যায় তেহরানে একজনের জীবন রক্ষা করতে পারে। যখন যুক্তরাজ্য সরকার দোনামোনা করবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে, তারা কোরিয়ার উপদেশ গ্রহণ করতে পারে যারা মাসখানেক আগেও একই অবস্থায় ছিল। কিন্তু এ জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে বৈশ্বিক সহযোগিতার তাড়না এবং বিশ্বাস।

ইউভাল নোয়াহ্‌ হারারি: ‘স্যাপিয়েন্স’, ‘হোমো দিউস’ ও ‘টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস্‌ ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ গ্রন্থসমূহের রচয়িতা।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ সালাহ উদ্দিন শুভ্র। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত