‘বড় লোকের বিটি লো’ গানের মূল স্রষ্টা রতন কাহার, নেপথ্যের গল্প

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২০, ১১:২১ পিএম

সম্প্রতি অন্তর্জালে ভাইরাল হয়েছে ‘বড় লোকেরে বিটি লো’ শিরোনামের একটি গান। বাংলা গানটি ঘষা মজা করে রিমেক করেছে ভারতের সনি মিউজিক ইন্ডিয়া। গানটি গেয়েছেন সংগীত তারকা বাদশা ও পায়েল দেব; গানের তালে কোমর দুলিয়েছেন বলিউডের অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ। প্রতিষ্ঠানটি গানটি লোকগীতি হিসেবে উল্লেখ করলেও জানা যায়, গানটির প্রকৃত গীতিকার লোক সংগীত শিল্পী রতন কাহার মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আর এ নিয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বিতর্ক।

‘বড়লোকের বেটি লো’ গানের স্রষ্টা ভারতের বীরভূমের নিভৃতচারী লোক সংগীতশিল্পী রতন কাহার ভারতীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন গানটির নেপথ্যের গল্প।

তিনি জানান, চাঁদপনা ছোট্ট মেয়েটার একঢাল চুলে লাল ফিতে দিয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে নিজের ট্র্যাজিক জীবনের কাহিনি তরুণ লোকশিল্পীকে শোনাচ্ছিলেন কুমারী মা৷ পিতৃপরিচয়হীন নিজের একরত্তি মেয়েটা সম্পর্কে কথায় কথায় বলেছিলেন কুমারী মা, ‘এই যে এত্ত চাঁদ রূপ মেয়ের৷ হবে না কেনে? ই বড়লোকের বিটি আছে বটেক’৷ এই গল্প থেকেই এর পর জন্ম নেয় ‘বড়লোকের বিটি লো’৷ ১৯৭২ সাল সেটা৷ সে দিনের সেই তরুণ শিল্পী রতন কাহার এখন অশীতিপর৷

১৯৭৬ সালে গানটির রেকর্ডিং করেন স্বপ্না চক্রবর্তী৷ অশোকা রেকর্ড কোম্পানির সেই গান লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে৷ জেতে গোল্ডেন ডিস্ক পুরস্কারও৷

রতন কাহার শুরু করেছিলেন আলকাপ দিয়ে৷ যাত্রার দলে ‘ছুকরি’ ও সাজতেন৷ পরে তৈরি করেন ভাদু গানের দল৷ বেঁধেছেন অজস্র ঝুমুর গানও৷ পুরস্কার-শংসাপত্র এতটাই পেয়েছেন, যে একচিলতে ঘরে তা আর রাখার জায়গা নেই৷ তবে সরস্বতীর বরপুত্রদের লক্ষ্মীলাভ হওয়া সহজ নয়৷ এমন ব্যস্ত মানুষটারই একসময় গানের প্রতি অনীহা চলে আসে সাংসারিক কারণে৷ নিরন্তর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে বন্ধ হয়ে যায় গান বাঁধা৷ তবে তা কাটিয়েও ওঠেন একসময়৷ কিন্তু খ্যাতি জোটেনি আর আগের মতো৷ বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা মানুষটা বিড়ি বেঁধে সংসার চালিয়েছেন৷ অনটন নিত্যসঙ্গী জীবনভর৷ তিন ছেলে এক মেয়ের কেউই মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকাতে পারেনি পয়সার অভাবে৷

রতন কাহার বলেন, ‘জীবনটা অনেক কষ্টে কেটেছে৷ ছেলেরা এখন বড় হয়েছে৷ মেয়েটা ভালো গান গায়৷ কিন্তু একটা হারমোনিয়ামও কিনে দিতে পারিনি৷ এখনো মেয়ের বিয়ে বাকি৷ সেটাই আমার দুশ্চিন্তা৷’

এখন আর বিড়ি বাঁধার ক্ষমতা নেই৷ সরকারি ভাতা এবং অনুষ্ঠান করে যা পান তাই দিয়ে চলেন।

রতন কাহার বলেন, ‘সেই কুমারী মা নিজের জীবনের সব গল্প বলেছিল আমায়৷ ওর আশ্রয়দাত্রী ছিল হরিদাসী৷ সেই প্রৌঢ়ার একটা ঝুমুরের দল ছিল৷ ওর কাছে সুর নিতে গিয়েছিলাম৷ তখনই আলাপ৷ সেই তরুণীর গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম, যে গানটা লেখার সময় ওই গল্পটাই মাথায় ঘুরছিল৷ ইশারায়-ইঙ্গিতে সেই মেয়েকে বাবুর বাগানে দেখা করতে বলত তার প্রেমিকটি৷ অল্প বয়সে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে মেয়ে৷ যখন টের পায় শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে, তখন পিতৃত্ব অস্বীকার করে প্রেমিক৷ সে তো তথাকথিত বড় ঘরের৷ তাই তার ঔরসে জন্মানো নিষ্পাপ শিশুটিকে উদ্দেশ করে লিখি, বড়লোকের বিটি লো৷ বাকিটা অবশ্য ওর মায়ের প্রেমকাহিনি৷ গুণীজন গানটির কদর করলেন৷ আমি কৃতার্থ৷’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত