করোনায় ‘লকডাউনে’ দেশ বেপরোয়া মাদকাসক্তরা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২০, ০৫:২১ এএম

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘরের বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সারা দেশের সঙ্গে সড়ক, নৌ ও রেলপথে যাত্রী পরিবহন বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গা-ঢাকা দিয়েছে মাদকের খুচরা বিক্রেতারাও। দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। তবে অনেক কারবারি নতুন কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদকের মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে ও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, এ পরিস্থিতিতে সংকটে পড়েছে দীর্ঘদিনের মাদকসেবীরা। নেশার জন্য মাদক না পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। গত ২৭ মার্চ রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীরহাজীরবাগে মাদকাসক্ত সজীবের (১৭) ছুরিকাঘাতে নিহত হন তার মা সুরাইয়া আক্তার (৪৫)। প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গৃহকর্মীর কাজ করে ছেলেকে মানুষ করছিলেন সুরাইয়া। তবে সজীব মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার রাতে নেশার জন্য মায়ের কাছে টাকা চায় সে। টাকা না দেওয়া অনেকক্ষণ ঝগড়া করার পর বাসার সামনের রাস্তায় সুরাইয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। অধিকাংশ মাদকসেবীই মাদকের সংকটে অনেকটা সজীবের মতো আচরণ করছে। তাদের অনেককেই চিকিৎসা দিতে নিতে হচ্ছে নিরাময় কেন্দ্রে। 

মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মাদকসেবীরা যদি হঠাৎ করে মাদক সেবন করতে না পারে তবে ভয়ংকর হয়ে উঠবে। যারা ইয়াবা খায় তারা ইয়াবা খেতে না পেলে এক টানা ২৪ ঘণ্টা ঘুমাবে। তাদের হেল্পলেস লাগবে। শরীর দুর্বল লাগবে। হেরোইন, হেরোইন জাতীয় ইনজেকশন ও ঘুমের ইনজেকশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেবে। যারা হেরোইন খায় তাদের পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া হবে, নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়বে, খুব বেশি হাই উঠবে, শরীর কামড়াবে, মানসিক অস্থিরতা তৈরি হবে। এছাড়া ঘুম হবে না, ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাবে, পালস রেট বৃদ্ধি পাবে, শরীরের লোম খাড়া হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতি তারা নিজেরা সামাল দিতে পারে না। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই তাদের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। না হলে অস্থিরতা থেকে যেকোনো ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে তারা।  এ প্রসঙ্গে কথা হয় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতালের সাবেক মনোচিকিৎসক ডা. আকতারুজ্জামান সেলিমের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সরকার যখন কঠোর অবস্থান নেয়, আসক্তরা যখন মাদক হাতের নাগালে না পায়; তখন মাদক নিরাময় হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে যায়। কারণ যারা মাদক সংগ্রহ করতে পারে না তাদের ‘উড্ডয়ন’কালীন (মাদকদ্রব্য প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ) যন্ত্রণা সহ্য করা সম্ভব হয় না। এ সময় বাড়িতে একার পক্ষে নিজেকে সামলানো বেশ কষ্টকর ব্যাপার।

‘উড্ডয়নের’ ব্যাখায় তিনি বলেন, এ সময় মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়। কেউ যখন ইয়াবা খাওয়া বন্ধ করে তখন সে দুই-তিন দিন ঘুমের ওপর থাকবে। টানা ২৪ ঘণ্টাও ঘুমাতে পারে তারা। সাধারণত ইয়াবা খাওয়া বন্ধ করার দুই দিন পর থেকে উড্ডয়নের উপসর্গ দেখা দেবে। যারা হেরোইন খায় অথবা হেরোইন ও আফিম জাতীয় ইনজেকশন নেয় তাদের প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ মারাত্মক হবে। যারা ঘুমের বড়ি বা ওই জাতীয় ইনজেকশন নেয় তাদের ক্ষেত্রেও প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ মারাত্মক হতে পারে। আমরা হেরোইন খাওয়া রোগী কম পাই। ইয়াবা, গাঁজা ও ঘুমের বড়ি খাওয়া রোগীই বেশি পাই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে ‘লকডাউন’ পরিস্থিতির মধ্যেও সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে মাদক কারবারিরা। খুচরা বিক্রেতারা গা-ঢাকা দিলেও বড় কারবারিরা স্থল ও নৌ সীমান্ত দিয়ে মাদক আনছে। সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে রাজধানীকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা যানবাহনে মাদক বহন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচামালের পিকঅ্যাপ ভ্যানও। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে তারা মাদকের মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গত ২৬ মার্চ রাজধানীর পান্থপথে একটি পিকআপ থেকে ৪৪৩ বোতল ফেনসিডিলসহ দুজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাবের ভাষ্যমতে, আটকরা মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচামাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিয়ে আসে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা পিকআপের সিলিন্ডারের চেম্বারে মাদক বহন করছিল। এই মাদক কারবারীদের নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, মার্চ মাসের ১ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন থানা-পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে মাদক সেবন ও বিক্রির অপরাধে ১ হাজার ৬০১ জনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।

র‌্যাব সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে রাজধানী থেকে ২২৪ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত সমুদ্রপথে মাদক পাচারের সময় ১০ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কোস্টগার্ডের সহকারী পরিচালক (গোয়েন্দা) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম হামিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ওপর আমাদের নজরদারি চলছে। লোকাল অপারেশনে ব্যবসায়ী আটকের হার কমেছে, কারণ লকডাউনের ফলে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা বাইরে বের হতে পারছে না। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ইয়াবার মজুদ করতে পারে এমন শঙ্কা থেকে টেকনাফ অঞ্চলে টহল বাড়ানো হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত