যুদ্ধকালীন যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনোবল অটুট রাখা হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। এখন আমরা ভিন্ন ধারার যুদ্ধে আছি। দৃষ্টির অগোচর প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যোদ্ধা দেশের সব মানুষ। ফলে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে দেশের প্রত্যেক মানুষকে স্ব স্ব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, সবাইকেই ভাইরাসমুক্ত থাকার প্রতিবিধানগুলো মানতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, নিয়মমতো ঘনঘন হাত ধোয়া। ঘরে নিজেকে আবদ্ধ রাখা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এসব হচ্ছে সবার পালনীয় সাধারণ নিয়ম। এরপর পেশাভিত্তিক দায়িত্বও আছে। মানুষ যাতে মনোবল না হারায় তেমন প্রচারণার দায়িত্ব রয়েছে সংবাদ মাধ্যমের এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের। ডাক্তারদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা প্রদান করা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব তেমনি ডাক্তারদেরও হতে হবে প্রকৃত যোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দানে বীর যোদ্ধা যেমন মৃত্যুভয়ে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায় না। তেমনিভাবে পেশার প্রকৃতির কারণেই ডাক্তাররাও রোগীর সেবাদানে পিছ-পা হবেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং হোম কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউনকে নিশ্চিত করায় ভূমিকা পালনের জরুরি দায়িত্ব সব বাহিনীর। নিম্নআয়ের ঘরবন্দি মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সরকার থেকে শুরু করে দেশের সব সামর্থ্যবান মানুষের। এভাবে প্রত্যেকেই যদি যার যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন তবে করোনা যুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিন্তু খুব বেশি সময় নিয়ে ফেইসবুক চর্চা করার সময় হয় না আমার। তাই অনেক ‘জ্ঞান’ অজানা ছিল আমার কাছে। এখন ঘরবন্দি অবস্থায় ফেইসবুক চর্চা বেড়েছে। আমি আহত হয়েছি যখন দেখছি দায়িত্বশীলরা এই দুঃসময়ে যেখানে তাদের নানা পোস্টের মাধ্যমে মানুষের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করবেন সেখানে দায়িত্ব পালনরত সরকারি নানা সংস্থার খুঁত ধরতে ব্যস্ত। আমি দেখলাম ফেইসবুকে একশ্রেণির মানুষ প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানের সমালোচনা করছেন। বলছেন আসল আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি, মৃত্যুর সংখ্যা এত কম হতে পারে না। আমরা জানি না প্রশাসন আড়াল করছে কি না। তবে যারা সমালোচনা করছেন তাদের কাছে কী প্রামাণ্য তথ্য আছে আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যদি কিছুটা কমিয়ে বলার কৌশলী সিদ্ধান্ত থেকেও থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। এমন তথ্য দেওয়া উচিত হবে না যা মানুষের সন্দেহ বাড়াবে কিংবা অতি নিরুদ্বিগ্ন করে ফেলবে। যেমন যখন মৃত্যু সংখ্যা দেখাচ্ছে ৬ জন একই সময়ে টেলিভিশন সংবাদে দেখা যাচ্ছে, দেশের নানা অঞ্চলে করোনা লক্ষণে মারা গেছেন আরও ৪-৫ জন। তাদের নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে। প্রতিদিন এ ধরনের সংখ্যা বাড়ছে। এদের পরীক্ষা রিপোর্ট আর জানা হয় না দর্শকের। এভাবে অবশ্য সন্দেহ আরও জমাট হয়। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এক নারী মারা গেলেন। পরীক্ষা রিপোর্টে জানা গেল তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। প্রশাসন লকডাউন করে দিয়েছে সেই মহল্লার ১০০টি বাড়ি। টেলিভিশনে সচিত্র রিপোর্টও প্রকাশিত হলো। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের রিপোর্টে মৃতের সংখ্যা ৬-এই রয়ে গেল। দায়িত্ববানদের এ ধরনের অমেধাবী আচরণ মানুষকে বরঞ্চ আরও বেশি সন্দেহে ফেলে দেবে। যদি প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ১০ হয় তবে ব্রিফিংয়ে বিশ্বাস হারানো মানুষ ভাববে ৩০ জন। এতে মনোবল দুর্বল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
যেখানে ইতিবাচক সংবাদ প্রচার করা যুদ্ধের কৌশল সেখানে আমরা নেতিবাচক আলোচনা করতেই বেশি মজা পাই। যশোরের মনিরামপুরের ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে আমরা সময় কম ব্যয় করিনি। যশোরের মনিরামপুরের তরুণী ম্যাজিস্ট্রেট নিন্দাযোগ্য কাজ করেছেন বয়সী নাগরিককে হেনস্তা করে। এ নিয়ে হইচই অনেক হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এখন আর এদিকে মনোনিবেশের প্রয়োজন কি! আমরা তো চাইলে পজিটিভভাবেও দেখতে পারি। তরুণ অফিসারের সামান্য বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া বাস্তব অভিজ্ঞতা তো তেমন হয়নি। বরঞ্চ তারা দেখে এসেছেন বা তাদের শেখানো হয়েছে যে প্রশাসনিক আমলারাই সবার ওপরে এবং বেশি ক্ষমতাশালী। নানাভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা দেখেছে বা সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখেছেও। তাই হয়তো করোনা নিয়ন্ত্রণে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে না লাগিয়ে কঠোরভাবে আদেশ প্রয়োগকে দায়িত্বের অংশই মনে করেছিলেন। এই ঘটনার পরে প্রশাসন নিয়ন্ত্রকরা নতুনভাবে তরুণ অফিসারদের প্রশিক্ষণ নিয়ে ভাবতে পারেন।
কিন্তু একই সময় ইতিবাচক খবর কি প্রকাশিত হয়নি? অনলাইন পোর্টালে পড়লাম লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার ইউএনও সাবরিন চৌধুরী এবং রামগঞ্জ উপজেলার ইউএনও মুনতাসির জাহান ছুটে বেড়াচ্ছেন মানুষের কল্যাণে। নিজ বেতনের টাকায় ফুটপাতের হকার, রিকশাচালক, ভিক্ষুক ও দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য সহযোগিতা নিয়ে যাচ্ছেন। একই রকম আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপপুর উপজেলার ইউএনও মমতাজ বেগম নিজের সমুদয় বেতন ও বৈশাখী উৎসবভাতা তুলে দিয়েছেন জেলা প্রশাসকের ত্রাণ তহবিলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের এসব নিয়ে ফেইসবুক তেমন মুখরিত হয় না। এই দুঃসময়ে আমাদের নেতিবাচক আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসে আনন্দময় এবং ইতিবাচক ভাবনা ছড়িয়ে দিতে হবে।
অধিকাংশ অঞ্চলেই স্থানীয় প্রশাসন আন্তরিকতার সঙ্গে যার যার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা দুর্যোগে হতাশ হয়ে পড়ে না। বেশি পেছনে না যাই, ঔপনিবেশিক শাসন যুগের দিকেই যদি দৃষ্টি দিই ১৭৭০ এং ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল বাংলায়। তারপরেও বাঙালি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ১৮৯৫ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে বাঙালি ভয়াবহ প্লেগ রোগ ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়। সে-সময় পঞ্চাশ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বৃহত্তর বাংলায়। এরপরও হতাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েনি এদেশের মানুষ। এসবের তুলনায় করোনাভাইরাস অতটা ভয়ংকরভাবে আসেনি এদেশে। তাই আমাদের হতাশ হয়ে অন্ধকার খোঁজার দরকার নেই।
শুধু ভয়, এদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্যকে ঠিকমতো বুঝতে চাইছে না। আমাদের মানতে হবে এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগ এটি। আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে অনেকেই আক্রান্ত হবে। তাই আত্মরক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা নিজেকে রক্ষার যেসব নিয়ম বাতলে দিয়েছেন তাকে অক্ষরে অক্ষরে মান্য করতে হবে। ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। অবস্থা ভেদে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি বর্জন করে শপথ নিতে হবে একান্ত জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে যাব না। ঘরে নিজেকে বন্দি রেখে ভাইরাসকে ফাঁকি দিতে হবে।
সতর্ক থাকতে হবে গুজব নিয়ে। ফেইসবুকে এখন গুজবের ছড়াছড়ি। নানা কিসিমের চিকিৎসকের অভাব নেই। নিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসার বাইরেও আছেন কেউ ধর্র্মীয় চিকিৎসক, কেউ হারবাল চিকিৎসক। আর বাঙালি প্রত্যেককেই চিকিৎসক বলা যায়। কেউ অসুস্থতা প্রকাশ করলে পাশে থাকা মানুষটি কোনো না কোনো ওষুধ বাতলে দেবেন। আমরা আবার অতিবেশি বিশ্বাসীও। এসবের সুযোগ নেয় গুজব রটনাকারীরা। করোনাভাইরাস একটি বৈশ্বিক সংকট। এসময় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য পরিষেবায় যারা নিয়োজিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের বাইরে অন্য সব ‘বিশেষজ্ঞের’ মতামতে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ মতামতের ছড়াছড়ি। চিকিৎসা বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট নন এমন বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষও হরদম চিকিৎসকের মতো জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছেন। আমার মনে হয় মিডিয়া পরিচালক ও সরকারি প্রশাসনের এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন পরামর্শ যাতে সব চ্যানেল ও সংবাদপত্র প্রচার করে তা নিশ্চিত করতে হবে। নানা মুনির মতামত সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
পুনর্বার বলতে চাই যে, যেহেতু ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশে ভাইরাস-মহামারী এখনো প্রকট হয়নি তাই দুঃসময়ের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই এর প্রতিবিধানের জন্য সতর্ক হতে হবে। যা অতিআক্রান্ত দেশগুলোর জন্য সহজ নয় আমাদের জন্য এখনো অনেকটা সহজ। আর তিনটি সপ্তাহ যদি আমরা নিজেদের আটকে রাখি ঘরে এবং সুরক্ষার যাবতীয় নিয়ম মান্য করি তাহলে করোনাকে জয় করা খুব কঠিন হবে না। এই যুদ্ধ জয়ে প্রত্যেককেই যার যার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
লেখক
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
