জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পলাতক খুনি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সদস্যরা। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘মাজেদের বিষয়ে গোয়েন্দাদের কাছে সব তথ্য ছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দণ্ডপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।’ ভিডিওবার্তায় মাজেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি দেশবাসীর জন্য মুজিববর্ষের একটা শ্রেষ্ঠ উপহার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল সেনাসদস্য। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এরপর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারের পথ খোলে; মামলার পর বিচার শুরু হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর ফের শ্লথ হয়ে যায় মামলার গতি। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দণ্ডিত পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি। তারা হলো- সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি)। কিন্তু ফাঁসির দণ্ডাদেশ পাওয়া ছয় আসামি বিদেশে পলাতক থাকেন। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোল থেকে রেড নোটিস জারি করে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করা হচ্ছিল। এরা হলেন- খন্দকার আবদুর রশিদ, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান। তাদের মধ্যে মাজেদকে গতকাল কারাগারে পাঠানো গেল।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম খুনি মাজেদকে ধরতে বিশ্বের সর্বোচ্চ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। সোমবার রাত সাড়ে ৩টায় সিটিটিসি তথ্য পায়- মাজেদ মিরপুর সাড়ে ১১ এলাকায় অবস্থান করছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একটি টিম তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে মিন্টো রোডে সিটিটিসির অফিসে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, গতকাল দুপুরে কড়া পুলিশ প্রহরায় তাকে আদালতে নেওয়া হয়। আদালত তাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। পলাতক ছয় খুনির মধ্যে ক্যাপ্টেন মাজেদ ছিলেন অন্যতম। তার গ্রামের বাড়ি ভোলায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারতে ছিলেন।
আদালতের ধানম-ি থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) পুলিশের উপপরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মাজেদকে ধানম-ি থানার ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার (সন্দেহমূলক) মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ওই মামলায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে। বিচারক আবেদন মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। আসামি মাজেদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
সিটিটিসির উপ-কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, আবদুল মাজেদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এরপর আমাদের গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিটিটিসির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুনি আবদুল মাজেদ প্রায় ২৫ বছর ধরে ভারতে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে ছিলেন। সেখানে আবদুল মজিদ পরিচয় দিতেন। তাছাড়া তিনি লিবিয়া ও পাকিস্তানে কয়েক বছর কাটিয়েছেন। ওইসব দেশে সুবিধা করতে না পেরে আবারও ভারতে ফিরে আসেন। বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করার পর গত ৪ বছর ধরে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন তিনি। তিনি বলেন, এরই মধ্যে একবার খবর রটেছিলÑ কলকাতা পুলিশের হাতে মাজেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন। যদিও ভারত বিষয়টি স্বীকার করেনি। বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। করোনাভাইরাস আতঙ্কে সেখান থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশে চলে আসেন বলে আমরা তথ্য পাই। কিছুদিন মিরপুরে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। তাছাড়া মিরপুর ডিওএইচএস-এর এক নম্বর রোডের ১০/এ বাসায় কিছুদিন রাত্রিযাপন করেন।
‘গোয়েন্দাদের কাছে তার সব তথ্য ছিল’: ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দণ্ডপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তাদেরই একজন আবদুল মাজেদ। গ্রেপ্তারের পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তার স্ত্রী সালেহা বেগম। বাড়ি নম্বর ১০/এ, রোড নম্বর ১, ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকা। তিনি সেখানে বসবাস করতেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে তার বিষয়ে সব তথ্য ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানম-ির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আাবদুল মাজেদ, নূর ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের অবস্থান ছিল। মাজেদ তখন লেফটেন্যান্ট ছিলেন। এই খুনি শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনেই অংশগ্রহণ করেননি, তিনি জেলহত্যায় অংশ নিয়েছিলেন বলে আমাদের জানা আছে।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পরই জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বঙ্গভবনসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন মাজেদ। আমরা আশা করি, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার দণ্ডাদেশ কার্যকর করতে পারব। তাকে গ্রেপ্তারে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি, মুজিববর্ষের একটা শ্রেষ্ঠ উপহার আমরা দেশবাসীকে দিতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তৎকালীন জিয়াউর রহমানের সরকার বিচারের বদলে তাদের নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে তাদের যাতে বিচার না হয় সে ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত করেছে। এই খুনিকে আমরা দেখেছি সেই সরকারের আশীর্বাদে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরিরত অবস্থায়। তিনি দেশে এবং বিদেশে চাকরি করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে ১৯৯৭ সালে, তার আগেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। আমাদের গোয়েন্দারা তৎপর ছিলেন তাকে ধরার জন্য। তাছাড়া যেসব খুনি যেখানে যেখানে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাঝে মাঝে বিস্ময়ে হতবাক হই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দেশে না ফিরতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার কোন পর্যায়ে যেত।
