কক্সবাজার সাগরে ভেসে আসা মৃত ডলফিনকে হত্যা করা হয়েছে নাকি আত্মহত্যা করেছে এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক কতটি ডলফিন ভেসে আসে এ নিয়েও তথ্যের ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
ডলফিনটি আত্মহত্যা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার সাগরে ১২টি নয়, শুধু একটি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে এসেছে।
খালেকুজ্জামান বলেন, ওই ডলফিনটির মৃতদেহ ময়নাতদন্ত হয়েছে। তবে এখনো প্রতিবেদন হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে টেকনাফ শামলাপুরে সমুদ্র সৈকতে একটি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসে। খবর পেয়ে আমরা দ্রুত মৃত ডলফিনটি মৎস্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নিই এবং ময়নাতদন্ত শেষে সমাহিত করি। এ পর্যন্ত আর কোনো ডলফিনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
এই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘পৃথিবীতে যত প্রাণী রয়েছে এর মধ্যে মানুষ, বানর ও ডলফিন বুদ্ধিমান। এই তিনটি প্রাণীর বুদ্ধি বেশি এবং দুনিয়ার সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। শান্ত প্রকৃতির এই নিরীহ প্রাণী কারও ক্ষতি করে না।’
তিনি বলেন, ডলফিন এমন একটি নিরীহ প্রাণী সাগরে কোনোভাবে জালে আটকা পড়লে তিন ঘণ্টার অধিক সময় পার হলে মারা যেতে পারে। আবার নির্দিষ্ট সময়ে যন্ত্রণা ভোগ করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে পারে। হার্ট ব্লক হয়েও মারা যেতে পারে। বয়সের কারণে মারা যেতে পারে এবং আঘাত প্রাপ্ত হয়েও মারা যেতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে জানা যাবে উক্ত ডলফিনের মৃত্যুর রহস্য।
তবে এই কর্মকর্তার গবেষণামূলক বক্তব্য ও বিভিন্ন যুক্তির বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। তারা বলছেন, সাগরে একের পর এক ডলফিন মারা যাচ্ছে জেলেদের জালে আটকা পড়ে। অশিক্ষিত ও অসচেতন জেলেরা সাগরে মাছ ধরার সময় জালে আটকা পড়লেই ডলফিনকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলসের প্রধান নির্বাহী রাশেদুর মজিদ বলেন, ‘আমাদের হাতে তথ্য রয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ১০ থেকে ১২টি ডলফিনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জেলেরা। ডলফিনগুলো জেলেদের জালে আটকা পড়ার পর জাল বাঁচাতে ডলফিনগুলোকে হত্যা করা হয়। এই রকম টেকনাফ, ইনানী ও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভেসে এসেছে ডলফিন। তাদের শরীরে আঘাতে চিহ্ন রয়েছে।’
কক্সবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘সাগরে ডলফিনগুলো বাঁচাতে হলে জেলেদের প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। জেলেদের বোঝাতে হবে যে মাছ ধরার সময় যদি কোনো ডলফিন জালে আটকা পড়ে, তাহলে দ্রুত সময়ে ডলফিনগুলোকে উদ্ধার করে সাগরে ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে কক্সবাজার বঙ্গোপসাগর চ্যানেলে যে সমস্ত ডলফিন দেখা যায় তা এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বায়োলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘ডলফিন হচ্ছে মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা বাতাসের অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে। মাছের মতো বেশিক্ষণ পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকতে পারে না। পানির উপরিভাগে ডলফিনের বিচরণ। স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি পছন্দ করে।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু ডলফিন পানির উপরিভাগের প্রাণী, সেহেতু জেলেদের জালে আটকা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি কোনো কারণে জালে আটক পড়ে তাহলে ডলফিনকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও কিছু লোভী জেলে তাদের হত্যা করে। কারণ, ডলফিনের পাখনা ওষুধ এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।’
মুহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘আমি এই পর্যন্ত যতগুলো মৃত ডলফিন দেখেছি, বেশির ভাগ ডলফিনের পাখনা কাটা। কেটে ফেলার কারণ দুটি হতে পারে। এর মধ্যে একটি জীবিত অবস্থায় এবং মৃত অবস্থায়ও কেটে ফেলা হতে পারে।’
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক শাখার উপপ্রধান ড. মোহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, ‘কক্সবাজার সৈকতে মৃত ডলফিন ভেসে আসার খবর আমি পেয়েছি। তবে আমার মনে হয়, জেলেরা এত নিষ্ঠুর নয় যে ডলফিন হত্যা করবে। কারণ, ডলফিন সাগরে কারও ক্ষতি করে না।’
‘তবে ইঞ্জিনচালিত বোট বা ট্রলারে সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও এসব প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। এই মুহূর্তে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কিছু মন্তব্য করা কঠিন’ যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসে প্রাদুর্ভাবের কারণে গত তিন সপ্তাহ ধরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ নিষিদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে মাছধরার নৌকা বা ট্রলার প্রবেশ নিষিদ্ধ। প্রকৃতির নির্জনতায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হঠাৎ দেখা মিলে একদল ডলফিনের। সাগর উপকূল থেকে কিছু দূরত্বে এসব ডলফিনের খেলার দৃশ্যটি স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
গত ২৩ মার্চ বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে ১০ থেকে ১২টিরও বেশি ডলফিনের একটি দল উপকূলের খুব কাছাকাছি চলে আসলে স্থানীয়রা এসব ডলফিনের খেলা করার দৃশ্যটি ভিডিও করে।
