ক্রনিয়ে কেলেঙ্কারিতে স্তব্ধ ক্রিকেটবিশ

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২০, ০১:২৯ এএম

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত সফরে এসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দল। সেই সময় একটি অপহরণের ঘটনার তদন্ত করছিল দিল্লি পুলিশ। সেটা করতে গিয়েই ফোনে আড়ি পাতেন পুলিশের এক বড় কর্তা। কী শুনেছিলেন তিনি? ক্রিকেট বিশ্বকে স্তব্ধ করা সেই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কাহিনী।

সেদিন আড়ি পেতে অন্য একটা ফোনের লাইন পেয়েছিলেন দিল্লি পুলিশের বড় কর্তারা। আর তাতেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়েছিল। পুলিশ কর্তারা জানতে পারেন আড়ি পাতা ফোনের এক প্রান্তে ক্রিকেট জুয়াড়ি সঞ্জীব চাওলা, অন্য প্রান্তে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট অধিনায়ক হানসি ক্রনিয়ে। চাওলা কাউকে বলছেন, ‘আমার ঘরে এখন ক্যাপ্টেন আসবে।’ পুলিশকর্তা প্রমে বুঝতে পারেননি কোন অধিনায়ক। ক্রমাগত চাওলার ফোনে আড়ি পেতে পুলিশ জানতে পারে সেই ‘অধিনায়ক’ আসলে ক্রনিয়ে। সেই সময় তিনি এমন কেলেঙ্কারিতে জড়াতে পারেন, কেউ ভাবতেই পারত না।

দিল্লি পুলিশের ট্যাপ করা ফোনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২০০০- এর ৭ এপ্রিল। সেই সময় ইউনাইটেড ক্রিকেট বোর্ড অব সাউথ আফ্রিকার ম্যানেজিং ডিরেক্টর আলি বাখার দিল্লি পুলিশের অভিযোগ শুনে বলেছিলেন, ‘ক্রনিয়ের সততা ও বিশ্বস্ততা প্রশ্নবাতীত। ক্রনিয়ের ভাষ্য ছিল ‘অভিযোগ ভিত্তিহীন’। এর চার দিন পর অর্থাৎ ২০০০ সালের আজকের দিনে আলি বাখারের কাছে দোষ স্বীকার করলে ক্রনিয়েকে অধিনায়কের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তখন বাখার বলেছিলেন, ক্রনিয়ে পুরোপুরি সৎ নন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিশ্বস্ততার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সেই ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে যুক্ত ছিলেন আরও তিন দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার হার্শেল গিবস, হেনরি উইলিয়ামস ও নিকি বোয়ে। তিনজনকে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ক্রনিয়েকে নিষিদ্ধ করা হয় আজীবনের জন্য। ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর জোহানেসবার্গের ‘বেল ইক্যুইপমেন্ট’ কোম্পানির হিসাবরক্ষকের চাকরি নিয়েছিলেন ক্রনিয়ে। এক সাপ্তাহিক ছুটির দিন স্ত্রীর সঙ্গে কাটাবেন বলে যাচ্ছিলেন জর্জিতে। ছোট কার্গো প্লেনের একমাত্র যাত্রী ছিলেন ক্রনিয়ে। অন্য দুজন পাইলট। ২০০২ সালের ১ জুন বিমানটি ভেঙে পড়েছিল এক পবর্তের মাঝে। চিরদিনের মতো হারিয়ে গিয়েছিলেন ক্রিকেটের ট্র্যাজিক নায়ক ক্রনিয়ে। যে স্কুল থেকে ক্রিকেট শিখেছিলেন, ব্লুমফন্টেইনের সেই গ্রে স্কুল অ্যান্ড কলেজে হয়েছিল শেষ কৃত্যানুষ্ঠান।

আশির দশকে ব্লুমফন্টেইনের সবচেয়ে অভিজাত গ্রে কলেজে পড়তেন দুই ভাই ফ্রান্স ও হানসি ক্রনিয়ে। ছোট ভাই হানসি ছিলেনক্রিকেট এবং রাগবি দলের অধিনায়ক। তুখোড় ছাত্র হিসেবেও তার সুনাম ছিল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভলসটেডকে বলেছিলেন, ‘আমি লর্ডসে খেললে আপনার জন্য বিমানের টিকিট পাঠাব স্যার!’ ১৯৯৪ সালে লর্ডসে খেলেছিলেন ক্রনিয়ে। কলেজের প্রধান শিক্ষকের ঠিকানায় বিমানের টিকিটও পাঠিয়েছিলেন। অথচ ক্রনিয়ে যখন স্বপড়ব দেখছেন তখনো বর্ণবৈষম্যের অভিযোগে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকা। নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর গৌরবময় স্বপ্ন -পূরণের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নামটি ছিলক্রনিয়ে। দেশের হয়ে ১৯৯২- এর বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল তার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনিতে ব্যাট করার সুযোগ পাননি। ৫ ওভারে একটি মেডেনসহ ১৫ রানে উইকেটশূন্য ছিলেন। সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা জিতেছিল ৯ উইকেটে। দক্ষিণ আফ্রিকা নির্বাসন কাটিয়ে প্রম টেস্ট খেলে উইন্ডিজের বিপক্ষে। সেই ম্যাচেই টেস্ট অভিষেক ক্রনিয়ের। দুই ইনিংসে করেছিলেন ৫ ও ২ রান। ভারতের বিপক্ষে ১৯৯২- ৯৩ মৌসুমে তাকে প্রম চিনেছিল ক্রিকেট দুনিয়া। ১৩৫ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে নির্বাসনের পর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রম টেস্ট জয় এনে দেন। এরপর কেবলই উত্থানের গল্প। নিয়মিত অধিনায়ক কেপলার ওয়েসেলসের ইনজুরিতে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে। নিয়মিত হতেও দেরি হয়নি। কম সময়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৮টি টেস্ট সিরিজে নেতৃত্ব দিয়ে জয় পেয়েছেন ১৩টিতে। মাত্র ৪টি সিরিজে হার। একটি ড্র। ওয়ানডেতে ১৩৮ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৯৯টি জয়। হার ৩৫ ম্যাচে। এমন তুঙ্গস্পর্শী সাফল্য আর বব উলমারের সঙ্গে অসাধারণ বোঝাপড়ার সুবাদে ‘ক্রিকেট ইনোভেশনের’ নতুন তরঙ্গ যখন আছড়ে পড়ছিল ক্রিকেট মাঠে, ঠিক তখনই ‘ফিক্সিংয়ের’ বজ্রপাতে স্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু। সতীর্থ গ্যারি কারস্টেনের ‘গ্রেট ক্রিকেটার, গ্রেট পারফরমার ও গ্রেট অন-ফিল্ড লিডার’ হারিয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য।

দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা উইকেটরক্ষক, বর্তমানে কোচ মার্ক বাউচার তার জীবনী ‘থ্রু মাই আইস’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ক্রনিয়েকে বোঝা সহজ ছিল না। এই হাসছেন, রসিকতা করছেন, আবার পরক্ষণেই রেগে আগুন। একবার মজাচ্ছলে ক্যালিস, ক্লুজনার এবং আমাকে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে দুই লাখ ডলার দিতে চেয়েছিল। আমরা সবাই ব্যাপারটা রসিকতা বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।’ এরপর সন্দেহ করে বাউচার লিখেছেন, ‘নাগপুরের ওই ম্যাচে ক্রনিয়ে আমাকে ঠিক স্টাম্পের পেছনে দাঁড় করিয়ে লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে বল করছিল। উদ্দেশ্য বাই চার। নিখুঁত লাইন-লেংথের জন্য ও বিখ্যাত ছিল। তার পক্ষে লেগ স্টাম্পের এত বাইরে বল করা অসম্ভব। এই অনিশ্চিত মনোভাব দেখে আমার সন্দেহ হতো।’ ফিক্সিং তদন্তে গঠিত কিং কমিশনের কাছে পরেও দোষ স্বীকার করেছিলেন ক্রনিয়ে। দিল্লি পুলিশও তাকে দোষী সাব্যস্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল। তিনি দোষীও হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো এক অনির্দেশ্য কারণে মনে হতো, ‘ঘটে যা তা সব সত্য নহে!’ হয়তো তাই ক্রিকেটের গভীরতম রহস্য হয়ে মৃত্যুর পরেও বেঁচে আছেন ক্রনিয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত