চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরাই যে করোনা যুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধা এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। করোনা মহামারীতে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়া পশ্চিমা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই এ বিষয়ে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিস্তার সামাজিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া এবং রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশকেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পরও করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এখনো যেমন স্বস্তিকর শৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে না, তেমনি চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না বলেও খবর মিলছে। দেশ-বিদেশের জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের ভাষ্যানুযায়ী বাংলাদেশ কেবল করোনার গণবিস্তারের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকার এ কেবল শুরু। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এরই মধ্যে দেশে করোনা আক্রান্তদের ২১ থেকে ২৫ শতাংশই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী। এই চিত্র ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে। কঠিনতম সময়ের আগেই যদি করোনাচিকিৎসার সম্মুখ যোদ্ধারা আক্রান্ত হয়ে হেরে যান এবং দেশের স্বাস্থ্য খাত এভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে আসন্ন মহাদুর্যোগ মোকাবিলা কীভাবে সম্ভব হবে?
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা এবং চিকিৎসা খাত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, এত কিছুর পরও চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই এত ব্যাপক হারে স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসছে যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক বা পিপিইর অভাবের কথা। সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে উঠে এসেছে, করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের ২৫ শতাংশ এবং নার্সদের ৬০ শতাংশ এখনো পিপিই পাননি। যারা পেয়েছেন তারাও ‘রেইনকোট’ সদৃশ এসব পিপিইর কার্যকারিতা নিয়ে ‘সন্দিহান’। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই জরিপের সঙ্গে একমত নয়। অধিদপ্তর বলছে, প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। পিপিই’র মান নিয়ে সংশয়কেও নাকচ করে দিয়ে তারা বলছেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব ক্রয় সম্পন্ন করেছে। তারপরও কোথাও ভুল বা অসততা থাকলে তার দায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহন করতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখযোদ্ধাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রশস্ত্র নিশ্চিত করতে না পারার দায় নিয়ে এমন দায়সারা কথাবার্তায় আর যাই হোক যুদ্ধ জেতা সম্ভব না।
সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিতদের ভাষ্য থেকেও মানহীন পিপিই, নকল এন-৯৫ মাস্ক, পলিথিনের গ্লাভস এবং পিপিই’র প্যাকেটের মধ্যে গগলস-গ্লাভসসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া এবং কোয়ারেন্টাইনে থাকা অনেক চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরাও বলেছেন, পিপিইসহ যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই তারা সংক্রমিত হয়েছেন। এরই মধ্যে দুই শতাধিক চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীর আক্রান্ত হওয়া এবং আরও দুই শতাধিকের কোয়ারেন্টাইনে থাকার মতো পরিস্থিতির জন্য সরকারের ভুল নীতিকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারাই। তারা বলছেন, সবার আগে উচিত ছিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য খাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা এবং হাসপাতাল আলাদা না করে সব হাসপাতালেই করোনার চিকিৎসা করা। এজন্য প্রথমেই সব হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই, এন-৯৫ মাস্ক, তাদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা ও ডিউটি শেষে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যবস্থা করা। তাহলে ধাপে ধাপে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেত। একই সঙ্গে সামনে উঠে আসছে, করোনাচিকিৎসায় কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে না পারার ব্যর্থতার কথাও।
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার অভাবের সঙ্গে সারা দেশে করোনার চিকিৎসার অপ্রতুল সুযোগের বিষয়টিও মিলিয়ে দেখা জরুরি। সামাজিক পর্যায়ে সংক্রমণের গতির তুলনায় করোনা পরীক্ষার হার আশানুরূপভাবে বাড়াতে না পারার কথা বারবার আলোচনায় এলেও পরীক্ষা সেভাবে বাড়ছে না। অন্যদিকে, যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা কীভাবে কতটা চিকিৎসা পাচ্ছেন সেটা ভেবে দেখাও জরুরি। সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার যে চিত্র উঠে এসেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। সেখানে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বরাতে জানা গেছে, আলাদা রুমে রাখা রোগীদের সেবায় চিকিৎসক-নার্সরা সময় দেন না। টয়লেট অপরিচ্ছন্ন এবং রোগীদের খাবার-দাবারও দেওয়া হয় দরজার বাইরে থেকে। অথচ এই সময়ে রোগীর মনোবল চাঙ্গা রাখা এবং তাদের যথাযথ সেবাযতœ জরুরি। অন্যদিকে, দেশ রূপান্তরে ‘৬ দিনেও ২৪ ঘণ্টা হয়নি আইইডিসিআরের’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে চেয়ে ছয়দিন ঘুরেও কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে এক ব্যক্তির করুণ মৃত্যুর কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, মহাদুর্যোগ শুরু হয়ে যাওয়ার পর এখনো যদি চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না যায় আর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এখনো যদি মানুষকে দ্বারে দ্বারে গিয়ে সুযোগ প্রার্থনা করতে হয় তাহলে করোনার মহামারী ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব হবে। করোনা চিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাতের এই বিপর্যয় রোধ করা না গেলে জাতিকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।
