রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ধস

আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলার ছাড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২০, ০৭:০৭ এএম

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেশের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে ডলার সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানি সচল রাখতে স্থানীয় মার্কেটে ডলার বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক বিপুল পরিমাণের ক্রয়াদেশ হারিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিভিণ্ণ দেশে লকডাউনের কারণে প্রবাসী আয়ও কমে গেছে। চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে বিশ্বঅর্থনীতিতে যে ঝাঁকুনি তৈরি হয়েছে তাতে গত মার্চে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমেছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ ও ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর চলতি এপ্রিলের প্রম ১৩ দিনে প্রবাসী আয় নেমেছে ৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫১ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

এদিকে বিশে^র বিভিণ্ণ দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গতকালও দেশে এই ভাইরাসে ৯ জন মারা গেছেন। আর নতুন করে সংক্রমণের শিকার হয়েছেন ৪৩৪ জন। এর ফলে দেশে এখন মোট সংক্রমণের শিকার ৩ হাজার ৩৮২ জন।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার করোনাভাইরাসের সংμমণ রোধে গত মার্চ থেকে এক মাসের সাধারণ ছুটির পাশাপাশি বিভিণ্ণ জেলা লকডাউন ঘোষণা করেছে। বন্ধ হয়ে গেছে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে গেলেও আমদানি দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। এছাড়া লকডাউন-পরবর্তীতে শিল্পকারখানা চালুর ক্ষেত্রেও কাঁচামাল আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার কারণে ডলারের সরবরাহ কমে গেছে। এতে করে বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় মার্কেটে সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি শুরু করেছে। টাকার মান ধরে রাখতে গত ২ এপ্রিল থেকে ইতিমধ্যে ১৪ কোটি ডলার স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করেছে। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির পরিমাণ কম। টাকার মান ধরে রাখতে হলে তাদেরকে বাজারে আরও ডলার ছাড়তে হবে।

যদিও এক মাস আগেই বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছিল। গত মার্চে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় ডলারের সরবরাহ বাড়ে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে দেশে তারল্য জোগানের অংশ হিসেবে গত মাসে শিডিউল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার ক্রয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৭ সালের পর ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এক মাসের ব্যবধানেই এ চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন উল্টো ডলার ছাড়তে হচ্ছে।

বর্তমানে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা। টাকার বিপরীতে ডলারের এই দর অনেক দিন ধরেই স্থির রয়েছে। তবে এখন আমদানি ব্যয় মেটাতে বেশ কিছু ব্যাংকে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা হারে ডলার কিনতে হয়েছে। জানা গেছে, সম্প্রতি জ্বালানি তেল বাবদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধ করার কারণেও ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনার প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ধস নামার কারণেই ডলারের সরবরাহ কমে গেছে। অপরদিকে ব্যাংকগুলোতে আমদানি বিল পরিশোধের চাপ রয়েছে। এছাড়া রমজানের সময় বিভিণ্ণ পণ্যের আমদানি বাড়ায় প্রতি বছরই এ সময়টাতে ডলারের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। এসব কারণেই এখন ডলারের চাহিদা বেড়েছে। তবে কিছু ব্যাংকে সংকট থাকলেও আমাদের ব্যাংকে উদ্বৃত্ত ডলার রয়েছে। আমরা অন্যান্য ব্যাংকে সাপোর্টও দিতে পারছি। আর ব্যাংকগুলো চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকও সাপোর্ট দিয়ে থাকে। সংকটের কারণে কোনো ব্যাংক আমদানি বিল পরিশোধ করতে পারেনি, এমন নজির কিন্তু এখন বাংলাদেশে নেই। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে বাজারে ডলারের সরবরাহ আরও বাড়ানো যাতে করে বিনিময় হার ধরে রাখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনে। এই ১০ দিন ছাড়া ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় ব্যাংকগুলোকে ডলার বিক্রি করেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৬৩ কোটি ডলার বিক্রি করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত