করোনায় ধাক্কা খেতে পারে শি চিনপিংয়ের স্বপ্ন

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ১০:৪২ পিএম

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চীনের অর্থনীতি। এটি দেশের অভ্যন্তরে তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে সে বিষয়ে চীনের নেতৃত্ব ভালোই সচেতন। চীন সরকার করোনাভাইরাস মহামারীর (কভিড-১৯) ব্যবস্থাপনা করেছে খুবই আনাড়িভাবে। দুঃখজনকভাবে কয়েক হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছে এতে। এ বিষয়টি চীনের নাগরিকদের ক্ষুব্ধ করেছে। গত ২৮ মার্চ দেশটির হুবেই ও জিয়াংসি প্রদেশের মধ্যকার সীমান্তচৌকিতে যে দাঙ্গার ঘটনা ঘটে তা থেকে এ ক্ষোভের বিষয়টি স্পষ্ট। চীনের অর্থনীতির ওপর ভয়াবহরকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে করোনা মহামারী। টানা গত তিন মাস ধরে কার্যত দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ হয়ে পড়েছে বেকার। পরিষেবা খাতে প্রতি সপ্তাহে আনুমানিক ১৪৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। বেকারত্বের হার   বেড়ে ৬ শতাংশের ওপরে উঠেছে। আর্থিক বিষয় নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী চীনের অর্থনীতির সংকোচন ঘটেছে ৩০ শতাংশ।

চীনে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি খুব ধীর বলেই দেখা যাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতির কারণে ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এবং তথ্যপ্রযুক্তির বড় কোম্পানি লেনোভোর প্রতিষ্ঠাতা লিউ চুয়ানঝির মতো চীনা ব্যবসায়ীরা ব্যাপক সংস্কারের দাবি তুলেছেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কাছে পাঠানো সংস্কারের জন্য ৯ দফা দাবি সংবলিত চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন তারা। চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশটির প্রায় সব খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ব্লুমবার্গ ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে চীনের কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সরকারের আয়ের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ সংকোচনের কথা বলেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে এটি সবচেয়ে বড় পতন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর খাতে আয় ১১ শতাংশেরও বেশি কমেছে। কমে গেছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), করপোরেট আয়কর এবং গাড়ি কেনার কর। তবে স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এক বছর আগের তুলনায় এই  হ্রাস ২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীনের বাইশটি প্রদেশ, অঞ্চল এবং পৌরসভা ইতিমধ্যে তাদের ২০২০ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস করেছে। সরকারিভাবে তাদের ২০১৯ সালের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ১১টি অঞ্চল।

পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গুয়াংহুয়া স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট এবং চীনের বৃহত্তম কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ঝাওপিনের এক যৌথ সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। এতে দেখা গেছে, ২০২০ সালের প্রথম দুই মাস সময়কালে দেশে চাকরির সংখ্যা ৩০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলো হচ্ছে মিডিয়া, বিনোদন, খেলাধুলা এবং পরিষেবা। এরপরে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট খাত, যেখানে নিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি ।

চীনের নেতারা আরও একটি কারণে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য জোরেশোরে চেষ্টা করে আসছেন। কারণটি হলো, তারা (বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং) ২০২১ সালের মধ্যে “চীনা স্বপ্ন” পূরণ এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে দেশটিকে একটি “অগ্রণী বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন বড় বিশ্বশক্তি” হয়ে ওঠার জন্য সঠিক পথে রাখাটাকে অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। পরের লক্ষ্যটি বলতে বোঝায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এবং বিশ্ব সংস্থাগুলোকে প্রভাবিত করা তথা নতুন সংস্থা গঠন করার সক্ষমতা অর্জন। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থতা তাদের বৈধতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তবে চীনা নেতাদের এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি এ পর্যন্ত ধীর।

৩ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রেসিডেন্ট শি স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেশের ‘অর্থনীতিকে একটি যুক্তিসঙ্গত মাত্রার বাইরে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করার’ তাগিদ দিয়ে আসছেন। তিনি বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির অংশীদারত্ব স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং একটি ‘দায়িত্বশীল বড় শক্তি’ হিসেবে চীনের ভূমিকা পরিপূর্ণভাবে পালনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। অন্যদিকে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি খোছিয়াং বৈদেশিক বিনিয়োগ স্থিতিশীল করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। উৎপাদন ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তিনি। অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে চাঙ্গা করার জন্য চীনের অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকগুলোকে মধ্যমেয়াদি তহবিল সরবরাহ করা এবং সুদের হার হ্রাস করা। ৩০০টিরও বেশি বড় চীনা কোম্পানি ব্যাংকের কাছে ঋণ চেয়েছে। তাদের চাওয়া ঋণের পরিমাণ কমপক্ষে ৮২০ কোটি ডলার। পরিষেবা শিল্পের পুনরুদ্ধারকে প্রণোদনা দিতে কমপক্ষে ১০টি অঞ্চলের সরকার সরাসরি জনগণকে কুপন দিচ্ছে। তবে শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বলেছে, ২৪ মার্চ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মাত্র ৭১ দশমিক ৭ ভাগ আবার কার্যক্রম শুরু করেছে।

চীন অবশ্য তার কৌশলগত স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই চলছে। বৈশ্বিক চাহিদার সুযোগ নিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণের উৎপাদন বাড়িয়েছে সেদেশের কোম্পানিগুলো। তেলের দাম হ্রাস পাওয়ার সুযোগ নিয়ে চীন প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল কিনে রেখেছে। এতে তার তেলের কৌশলগত মজুদ বেড়ে প্রায় ৩ কোটি টনে উঠেছে। তবে চীনের প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি এবং অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভর করবে। মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশ এখনো করোনা মহামারী সামলাতে লড়ছে। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য থাকবে সীমিত এবং তাদের অগ্রাধিকারের তালিকার নিচের দিকে। দেশগুলো এখন ঠান্ডা মাথায় ভাববে এবং বর্তমান বাণিজ্যনীতিগুলো আবার খতিয়ে দেখবে। ভারতকেও তাই করতে হবে। সরবরাহের জন্য (বিশেষ করে জরুরি পণ্যের ক্ষেত্রে) একটিমাত্র দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বন্ধ করার বিষয়টি সবারই অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে। অন্যদিকে জীবাণুযুদ্ধের সম্ভাবনাটি খুব জোরালো বলে ভাবমূর্তির বিষয়টি চীনের জন্য জটিল ব্যাপার হবে। করোনা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। দেশটি মহামারী সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য সময়মতো বহির্বিশ^কে দিয়েছে কি না সে প্রশ্ন উঠেছে। করোনা মহামারী সম্পর্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা চীনের আটকে দেওয়াটা সন্দেহকে কেবল আরও বাড়িয়েই দিয়েছে।

লেখক : ‘সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’র সভাপতি এবং ভারত সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়।

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত