করোনাভাইরাসের প্রকোপে চারদিকে শুধু আপনজন হারানোর করুণ আর্তনাদ। এই মৃত্যু মিছিলের কিছু গল্প আমাদের সামনে এলেও বেশিরভাগই থাকে অজানা। ১৩ এপ্রিল কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত না হলেও এই মহামারীকালের করুণ পরিণতি বরণ করেন নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী জিন ঝেনের বাবা। পুরো শহরজুড়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনায় ঝিন এক মাস বাবাকে দেখতে পারেননি। নিরুপায়, শোকার্ত ঝেন ইন্টারনেটে শেয়ার করেছেন জীবনের এই কঠিন সময়ের ঘটনা। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
লকডাউনের আগে
নিউ ইয়র্ক শহরের তারকাদের জন্য বিখ্যাত একটি জিমের নাম ‘ডগপাউন্ড’। এই জিমে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন জিন ঝেন। প্রচুর ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ঝেন নিয়মিত সময় দিতেন পরিবারকে। পরিবারের সদস্য বলতে মা আর বাবা। গত চার বছর ধরে ঝেনের বাবা বয়সজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন। এরই মধ্যে স্ট্রোকেও আক্রান্ত হন তিনি। বাবার সেবায় যেন কোনো ত্রুটি না হয়, তাই একটি নার্সিং হোমে তাকে ভর্তি করিয়ে দেন ঝেন। ঝেনের বাবা বেশ অসুস্থ ছিলেন। স্ট্রোক এবং বয়সজনিত অসুখের কারণে শারীরিক এবং মানসিকভাবে তিনি বেশ দুর্বলও হয়ে পড়েছিলেন। একদমই হাঁটতে পারতেন না, হুইল চেয়ার ছাড়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তাকে নেওয়া যেত না। হাত নাড়াতে পারতেন না বলে নিজ হাতে খাবার খাওয়ারও শক্তি ছিল না তার। কোনো কিছু না করতে পারলেও ব্যথার অনুভূতি ঠিকই টের পেতেন।
নার্সিং হোমে রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেন তিনি সেখানে সব সময় যথাযথ সেবা পান, চিকিৎসার কোনো ত্রুটি না হয়। এরপরও ঝেন এবং তার মা নিয়মিত তার কাছে গিয়ে থাকতেন। প্রতিদিন পালা করে তারা হাসপাতালে যেতেন। কাজের চাপের ওপর ভিত্তি করে ঝেন কখনো সপ্তাহে পাঁচ দিন, আবার কখনো সাত দিনই বাবাকে দেখতে যেতেন। কিন্তু তার মা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব সময় থাকতেন। প্রথম বছরে তো তিনি পুরো রাতই বাবার সঙ্গে বসে থাকতেন। এরপর যখন রাতে সাক্ষাৎকারীদের থাকতে নিষেধ করা হলো, তখন থেকে আর থাকেননি। মা আর ঝেন মিলে বাবার দেখাশোনার জন্য কাজ ভাগ করে নিতেন। মা তিনবেলার খাবার রান্না করে সঙ্গে নিতেন আর ঝেন বাবার গোসল, তাকে বিছানায় শোয়ানো, সপ্তাহে একবার চুল কেটে দেওয়া এই কাজগুলো করতেন। শরীরের রক্ত সঞ্চালন যেন স্বাভাবিক থাকে এবং হাড় যেন ক্ষয়ে না যায় সেজন্য নিয়মিত বাবার শরীরে মেসেজ করে দিতেন ঝেন।
বাবার মৃত্যু
এতক্ষণ ঝেন আর তার বাবার যে ঘটনা বর্ণনা করা হলো- সেটুকু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির আগের সময়ের। প্রতিদিনের রুটিনে সবই চলছিল নিয়মমাফিক। মন খারাপের গল্পটা শুরু হয় ঠিক এর পর থেকে, যখন করোনার প্রকোপ পুরো নিউ ইয়র্কে ছড়িয়ে পড়ে। ১২ মার্চ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিনের মতো একদিন ঝেন আর তার মা অসুস্থ বাবাকে দেখতে নার্সিং হোমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ঘোষণা এলো, পুরো শহরের সব নার্সিং হোমে বাইরের মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম জারি থাকবে। এমন নির্দেশের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না ঝেন। লকডাউনের ঘোষণা আসতে পারে এমন একটি আভাস ঝেনকে একজন নার্স দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা যে সন্ধ্যায় শুনে পরেরদিনই বাস্তবায়িত হয়ে যাবে এটা তিনি বুঝেই উঠতে পারেননি! তারা বুঝতেও পারছিলেন না কতদিন এই লকডাউন চলবে, কতদিনে তিনি বাবাকে দেখতে পাবেন। ১১ মার্চ ঝেন তার বাবাকে প্রতিদিনের মতো গোসল করিয়েছেন, চুল-দাড়ি-নখ কেটে দিয়েছেন। সেটাই ছিল জীবিত বাবার সঙ্গে ঝেনের শেষ দেখা।
বাবাকে দেখতে না পাওয়া, বাবার যতœ নিতে না পারা, বাবাকে নিজ হাতে খাবার খাওয়াতে না পারা- কোনো ঘটনাই ঝেনের জন্য সহজে মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। মা এবং ঝেন শুধু চেয়েছেন এই কঠিন অবস্থা দ্রুত কেটে যাক। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই তারা ছুটে যাবেন নার্সিং হোমে। কিন্তু নিয়তি বোধহয় এমনটা চাচ্ছিল না। বাবাকে শেষবারের মতো দেখে আসার এক মাস পর তারা একটি ফোন পান যেটি তারা কখনোই পেতে চাচ্ছিলেন না। জানানো হয়, বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন। চিকিৎসক তাকে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবু তাদের মানসিকভাবে যে কোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন আসে জীবনের সবচেয়ে বড় কঠিন খবরটি নিয়ে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাবাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। যে ভয়াবহ রোগ সবার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, অথচ সে রোগে তার বাবা মারা যায়নি এটাই ঝেনকে কষ্ট দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এই ভাইরাসের কারণে তৈরি করা নতুন নতুন নিয়মের কারণে বাবাকে জীবিত অবস্থায় আর দেখতে পেলেন না তিনি। এই কষ্ট সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে এটাই ঝেনকে বেশি পোড়াচ্ছে। একদিন পর ঝেনকে নার্সিং হোম থেকে চিকিৎসক আবার কল করেন। জানান, তার বাবার মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাকে। এই খবর শুনে ঝেনের মা বলেছিলেন, গত এক মাস ধরে তিনি হয়তো তাদের অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে তিনি চলেই গেলেন। ঝেন বিশ্বাস করেন, বাবার চলে যাওয়ার সময় অবশ্যই বেশি কষ্ট হয়নি। কোনো ব্যথা ছাড়াই বাবা ধীরে ধীরে আজীবনের জন্য চোখ বুজেছেন।
বাবার সঙ্গে শেষ কথা প্রসঙ্গে ঝেন
১১ মার্চ আমি আসার সময় বাবাকে বলেছিলাম, ‘ভালো ছেলে হয়ে থেকো, খাবার খেয়ো, ফ্লুইড নিয়মিত নিয়ো। আমাদের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা কোরো।’
সেই একটা দিনই আমি বাবার কাছ থেকে বিদায় নিইনি কারণ আমি জানতাম আমি তাকে আবার দেখব। অথচ সেটাই ছিল আমার আর মায়ের বাবাকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখা। লকডাউনের এই সময়ে আমরা বাবার সঙ্গে ভিডিওতে কথা বলার চেষ্টা করেছি। প্রথম দিন বাবা জানতে চেয়েছিলেন, আমি কবে তাকে দেখতে যাব। দ্বিতীয় দিন বাবা কোনো কথা বলতে পারেননি। মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে চিনতে পারছেন না বা আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না। শেষবার তিনি আর আমাকে চিনতেই পারেননি। আমি তাকে খুব জোরে জোরে ডাকছিলাম। কিন্তু তিনি কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কেন তিনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না। অথচ তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি খুব আরাম করে টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন। নার্সকে বললাম, আমি আবার কল করব। নার্সকে বলেছিলাম যেভাবেই হোক আমি আসব। নার্স আমাকে সোমবারে যেতে বললেন। কারণ সেদিন তাদের স্টাফ কম থাকে। ইস্টার সানডের পর আমি সোমবারের অপেক্ষা করছিলাম। অথচ সেই সোমবার এলো কিন্তু বাবা হারানোর খবর নিয়ে।’
বাবাকে নিয়ে ভিডিও
বাবার নিয়মিত যত্ন নিয়ে ঝেন ১৭ এপ্রিল ইউটিউবে হৃদয়স্পর্শী একটি ভিডিও আপলোড করেন। ভিডিওতে গত কয়েক বছরের বেশ কিছু ঘটনা যুক্ত করেছেন ঝেন। ভিডিওতে ঝেনের বক্তব্য, ‘২০১৬ সাল থেকে বাবাকে রিহ্যাবে নিলেও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে পেমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়, কারণ বাবার খুব একটা উন্নতি হচ্ছিল না। তখন আমি নিজেই বাবার ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট হয়ে গেলাম। শিখে নিলাম কীভাবে বাবাকে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি দিতে হবে। কিন্তু পড়াশোনা আর কাজের চাপে প্রতিদিন বাবাকে নিয়মিত থেরাপি দিতে পারছিলাম না। ধীরে ধীরে বাবার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে বাবাকে বাড়ির কাছে একটি নার্সিং হোমে ভর্তি করিয়ে দিই। দুপুরে খাবার সময় তার সঙ্গেই সময় কাটাতাম। আমার সহকর্মীরাও শুরুর দিকে বাবার থেরাপিস্ট হিসেবে সাহায্য করত। বাবা পুরোপুরি বিছানা নির্ভর হয়ে পড়লেন। শারীরিক কোনো কাজ নিজে করার ক্ষমতা
ছিল না তার। গোসল করা, বাথরুম করা, পোশাক পরিবর্তন, খাবার খাওয়া সবকিছুর জন্য তিনি আমার আর মায়ের ওপর নির্ভর হয়ে পড়লেন। বাবাকে আমি যেভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিচ্ছি (ভিডিওতে দৃশ্যমান) সেটা নিয়ে আসলে কথা বলে লাভ নেই। কারণ গত কয়েক বছর ধরে বাবাকে কোলে নিয়ে এভাবেই আমি জায়গা পরিবর্তন করি। তাকে গোসলের চেয়ারে বসিয়ে সাবান দিয়ে ভালো করে পুরো শরীর পরিষ্কার করে দিই। সময়ের ওপর নির্ভর করে সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন হলেও বাবাকে গোসল করিয়ে দিতাম। গোসল শেষে রোজ কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করে দিতাম। তার নাক পরিষ্কার করার কাজটাও নিয়মিত করতাম যেন শ্বাস নিতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়। প্রতি তিন সপ্তাহে অন্তত একবার বাবার চুল কেটে দিতাম। বাবাকে দেখতে যেন একদম পরিচ্ছন্ন লাগে তাই প্রতি ১/২ সপ্তাহে তাকে শেভ করিয়ে দিতাম। সত্যি বলতে, নার্সিং হোমে সম্ভবত সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মানুষটি আমার বাবাই ছিলেন। বাম হাত একদমই নাড়াতে পারতেন না, ডান হাত খুব ধীরে কিছুটা নাড়াতে পারতেন। তার সব কাপড় তার সাইজের চেয়ে ১/২ সাইজ বড় ছিল যেন সেগুলো একদম ঢিলেঢালা হয়, কাপড়ে যেন তার কোনোরকম অস্বস্তি না হয়। কাজগুলো আমি একাই করতাম যেন মাকে নতুন করে কিছু করতে না হয়। প্রথম বছরে বাবার পাশে দিন রাত ২৪ ঘণ্টা একটি চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে মায়েরও ব্যাক পেইনের সমস্যা শুরু হয়ে যায়।
বাবার সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। তিনি নিজের ব্লাডারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। এক সময় বিছানাতেই প্রস্রাব করে দিতেন কারণ এটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। বিছানার চাদর, কম্বলসহ বাবা নিজেও ভিজে যেতেন। নতুন করে আবার তাকে পরিষ্কার করতে হতো। বিছানা থেকে উঠতে পারতেন না বলে তার শরীরে ঘা হয়ে যেত। সেজন্য ওষুধও দিতাম। হাসপাতালের খাবার বাবা খেতে চাইতেন না। মা তিনবেলা বাবার জন্য খাবার রান্না করতেন। বলতে গেলে, বাবা যা খেতে চাইতেন তাই নিতাম বলে খাবারের রুচিতে বাবার মতকেই প্রাধান্য দিতে হতো।
সপ্তাহে একদিন বাবাকে নিয়ে আমরা বাইরে খেতে যেতাম। অবশ্যই যে রেস্টুরেন্টে হুইল চেয়ারের অনুমতি আছে সেখানে। নার্সিং হোমের বাইরে এ সময়টুকু আমাদের খুব আনন্দে কাটত। প্রতিবার বাবাকে রেখে আসার সময় আমাকে তিনি বলতেন, ‘সাবধানে যেয়ো’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০১৯ সালের মে মাসে, মায়ের নার্ভ পেইন এত বেড়ে যায় যে তাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়। এর তিন মাস পরেই ছিল আমার বিয়ে। প্রচুর প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল সে সময়। মা চেয়েছিলেন অপারেশন পরে করাতে। কিন্তু তাকে অপারেশনের জন্য জোর করি কারণ আমি জানতাম এরপর মা ভালো হয়ে যাবে। এই সময়টুকু আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। ঘরের কাজ করা, বিয়ের প্রস্তুতি, বাবা-মা দুজনেরই দেখাশোনা সব এক হাতে করতে হচ্ছিল। মা যেহেতু বাবাকে দেখতে দুই মাস যেতে পারেননি তাই সবকিছু আমাকেই করতে হচ্ছিল। বাবার কাপড় ধোয়া, বিছানা থেকে বাবাকে একা ওঠানো-নামানো, বিছানা গোছানো এগুলো আসলে কঠিন কিছু ছিল না, কিন্তু কাজ বেড়ে গিয়েছিল অনেক। আমি বা মা ছাড়া কোনো নার্সের হাতে বাবা খাবার খেতেন না। তাই দুপুরে খাবার সময়ে কাজ থেকে ফিরে রেডি হয়েই বাবার কাছে চলে আসতাম। হুইল চেয়ারে বসিয়ে বাবাকে লবিতে রেখে আসতাম যেন আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত নার্সরা বাবাকে দেখে রাখতে পারেন। শেষ পর্যন্ত বাবা-মা দুজনেই আমার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন। আমার জন্য সে মুহূর্তটি সত্যিই অনেক আবেগঘন ছিল কারণ এত অসুস্থতা সত্ত্বেও বাবা সে দিনটি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পেরেছিলেন।
