হাসপাতালে কেন চিকিৎসা নির্দেশনা নেই

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২০, ১২:০৮ এএম

সরকারি তথ্যানুসারে শনিবার পর্যন্ত দেশে কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৯৮ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি গেছেন ১১২ জন। মারা গেছেন ১৪০ জন। একই সময় পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৪ হাজার ৭৪৬ জন।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত রাজধানীর বিশেষায়িত এবং বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে সর্বোচ্চ এক হাজার রোগী ভর্তি ছিলেন।  সরকারি এই তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের বাইরে বা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩ হাজার ৭৪৬ জন।  অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ রোগী হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন।  টেলিফোনে নির্দেশনার মধ্য দিয়েই বাড়িতে থাকা রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর-এর পরিচালকও করোনা শনাক্ত হওয়া বিপুলসংখ্যক রোগীর বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, বাড়িতে থাকা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু করোনা শনাক্ত হওয়া রোগীরা কেন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন না তার সদুত্তর নেই। তবে, চিকিৎসক ও বিশ্লেষকরা বলছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনার চিকিৎসায় সঠিক নির্দেশনার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে আস্থাহীনতার কারণে রোগীরা হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত সরকারি জেনারেল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাধারণ রোগীর শরীরে করোনা শনাক্ত হলে, তাদের চিকিৎসার ব্যাপারেও নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন তৈরি করেনি। ফলে এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিজেদের মতো করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।  সে ক্ষেত্রে অনেক হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা ভর্তি হতে পারছেন না।  আবার তথ্য গোপন করে ভর্তি হওয়া রোগীদের থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে অন্যদের মধ্যে। ফলে ভয় পেয়ে অনেক হাসপাতাল করোনা শনাক্তকরণ ছাড়া রোগী ভর্তি করছে না। ফলে জটিল সাধারণ রোগীরাও মুমূর্ষু হয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনা বেসরকারি হাসপাতালে। এসব হাসপাতালে প্রথমেই সাধারণ রোগীদের করোনা শনাক্তের ন্যূনতম ব্যবস্থা না থাকায়, একের পর এক চিকিৎসক ও নার্সরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার করোনা হয়েছে জানার পর  চিকিৎসার মাঝপথেও রোগীদের ছুটি দিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। করোনার সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পরও সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি না হওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে না পারা খুবই ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে।

এমতাবস্থায় করোনা রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনাকালীন চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকা যথাযথ করোনা চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেমন সংকট তৈরি করছে, তেমনি হাসপাতালগুলোর মধ্য দিয়ে করোনার বিস্তারেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। বিশেষত চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা এভাবে করোনা সংক্রমণের প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছেন।  করোনা মোকাবিলার সম্মুখ যোদ্ধারা এভাবে ব্যাপক হারে সংক্রমিত হওয়ায় একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ছে, তেমনি আরেকদিকে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে তা প্রবল ভীতি সঞ্চার করছে। এমনিতেই মানসম্মত পিপিই-সহ যথাযথ সুরক্ষার অভাবে ভীত চিকিৎসক-নার্সরা এই পরিস্থিতিতে প্রবল মানসিক চাপের শিকার হচ্ছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলা যায়, করোনার চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে রোগীদের ভীতি-আস্থাহীনতা আর ব্যাপক হারে স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় সংক্রমিত হওয়া দুই সংকটেরই মূলে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য করোনাকালীন চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাব।          

এদিকে, রাজধানীতে করোনার চিকিৎসায় বিশেষায়িত ঘোষণা করা হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের সেবায় চিকিৎসক-নার্সরা মনোযোগী নন বলেও একের পর এক অভিযোগ আসছে সংবাদ মাধ্যমে। সরেজমিন প্রতিবেদনগুলোতেও দেখা যাচ্ছে সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং কীভাবে রোগীর সেবা করা হবে সে বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনার অভাবই এই সংকটের অন্যতম কারণ।  অন্যদিকে, চিকিৎসক-নার্সরা বলছেন, টানা কাজ করতে করতে তারা ক্লান্ত।  বিভিন্ন দলে ভাগ করে টানা ১৪ দিন ডিউটির ১৪ দিন বিশ্রামের রুটিনে কাজ করানো হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া এবং হোটেলে অবস্থান করার এই রুটিনে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা চিকিৎসক-নার্সরা মনোবল হারিয়ে ফেলছেন। এমন সময়ে করোনা রোগীর চিকিৎসায় আগামী ৭ দিনের মধ্যেই অতিরিক্ত ২ হাজার ডাক্তার ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগের  প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সরকারি ঘোষণা কিছুটা আশা জাগাচ্ছে। খেয়াল রাখা প্রয়োজন, জনবল নতুন কিংবা পুরনো যাই হোক যথাযথ করোনাকালীন চিকিৎসার যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে না পারলে এবং সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুসারে তাদের পরিচালিত করতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যাবে না। একই সঙ্গে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া করোনা রোগীদের তত্ত্বাবধানের বিষয়েও। দেশে করোনা রোগীর প্রায় আশিভাগই যেখানে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত