শ্রীপুর হত্যাকান্ডে দুর্ধর্ষ এক কিশোর গ্রেপ্তার

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১৮ এএম

গাজীপুরের শ্রীপুরের জৈনাবাজার এলাকার একটি বাড়িতে গত বুধবার রাতে প্রবাসীর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত রবিবার রাতে পারভেজ নামে ১৭ বছরের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদে পারভেজ এ হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। সে জানিয়েছে, টাচ মোবাইল চুরির উদ্দেশ্যে ওই বাড়িতে ঢুকলেও চিনে ফেলার কারণে একে একে চারজনকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা এবং দুই মেয়েকে ধর্ষণ করে।

গতকাল সোমবার বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে গাজীপুর পিবিআই কার্যালয়ের ইউনিট ইনচার্জ নাসির আহমেদ শিকদার এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, পারভেজ আবদার গ্রামের কাজিম উদ্দিনের ছেলে। গ্রেপ্তারের পর চারজনকে একাই খুন করেছে বলে স্বীকার করেছে সে। পরে তার তথ্যে, ঘর থেকে রক্তমাখা পোশাক, মাটিতে পুঁতে রাখা মোবাইল ফোন ও পায়জামার পকেট থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।

গত বুধবার রাতে জৈনাবাজার আবদার এলাকার একটি বাড়িতে প্রবাসী রেদোয়ান হোসেন কাজলের স্ত্রী ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক স্মৃতি আক্তার ফাতেমা (৪৫), তাদের বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নূরা (১৬), ছোট মেয়ে হাওরিন হাওয়া (১২) ও বাকপ্রতিবন্ধী ছেলে ফাদিলকে (৮) গলা কেটে হত্যা করা হয়।

পিবিআই কর্মকর্তা জানান, মামলার তদন্তের শুরুতেই আগের বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ, এলাকার বখাটে, মাদকাসক্তসহ বিভিন্নজনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে এসব তথ্য পর্যালোচনা করে পারভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পারভেজ জানায়, গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টায় প্রবাসী কাজলের স্ত্রী ও বড় মেয়ের টাচ মোবাইল চুরির উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী বাবুলের বাড়ির পেছন দিক দিয়ে দেয়ালে বের হয়ে থাকা ইট বেয়ে ছাদে ওঠে। পরে ব্লেড দিয়ে ছাদে কাপড় শুকানোর দড়ি কেটে ছাদের গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে তা বেয়ে একটু নিচেই দোতলার বাথরুমের ফাঁকা দিয়ে বাড়িতে ঢোকে।

এরপর নূরা ও হাওরিনের কক্ষে গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। এক ঘণ্টা পর সবাই ঘুমিয়ে গেছে ভেবে নিচতলায় নেমে রান্নাঘর থেকে বঁটি নিয়ে দোতলায় ওঠে। মোবাইল নেওয়ার জন্য নূরার মা স্মৃতির কক্ষের দরজা খোলার চেষ্টা করে সে। শব্দে জেগে গিয়ে বাথরুম ও আশপাশ কেউ আছে কি না দেখতে যান স্মৃতি। তিনি পারভেজকে চিনতে পেরে চিৎকার দেন। এ সময় হাতে থাকা বঁটি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে জখম করে পারভেজ। স্মৃতি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যান। মায়ের আর্তচিৎকারে নূরা জেগে গেলে তাকেও কুপিয়ে জখম করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ফাদিল ও হাওরিনকে কোপায় পারভেজ। সে প্রথমে নূরাকে এবং ওড়না দিয়ে স্মৃতির হাত-পা বেঁধে পরে অর্ধমৃত হাওরিনকে ধর্ষণ করে। সবার মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা কাটে।

নাসির আহমেদ জানান, সবাইকে হত্যার পর পারভেজ স্মৃতির গলার চেইন, কানের দুল, কান ও নাক ফুল, হাওরিনের কান থেকে দুটি স্বর্ণের রিং খুলে নেয়। পরে আলমিরা খুলে দুটি স্বর্ণের চেইন, একটি আংটি, একটি লাল রঙের ছোট ডায়েরি এবং স্মৃতির কক্ষ থেকে দুটি স্মার্টফোন নিয়ে পায়জামার পকেটে রাখে। এরপর হাত-মুখ ধুয়ে পেছনের গেট খুলে বাড়ি চলে যায় বলে জানান তিনি।

এ হত্যাকাণ্ডের আগে ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পারভেজ নীলিমা নামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছিল। এ হত্যা মামলায় বয়স বিবেচনায় সে হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর থেকে মামলা প্রত্যাহারে নীলিমার পরিবারকে ভয়ভীতি দিতে থাকে। এ বিষয়ে ২০১৮ সালে ২৮ আগস্ট নিরাপত্তা চেয়ে পারভেজ, তার বাবা কাজিম উদ্দিন, মা কামরুন্নাহার ও আবুল কালামের নামে শ্রীপুর থানায় জিডি করেন নীলিমার বাবা হাসান ওরফে ফালান।

পারভেজ এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত। মাদক সম্পৃক্ততা ও বখাটেপনার কারণে সবাই তাকে এড়িয়ে চলত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-অর রশিদ। পরিবারের সদস্যরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভালো পথে আনতে পারেনি বলে তিনি জানান।

পারভেজের চাচা আসাম উদ্দিন বলেন, ‘পারভেজ অনেক আগেই মাদক সেবন ও বিক্রি করে আসছে। টাকার জোরে শিশু হত্যা মামলা থেকে পার পেয়ে যায় সে। ওই মামলায় শাস্তি পেলে এমন নৃশংস ঘটনা সে ঘটাতে পারত না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত