কভিড-১৯ রুখতে হার্ড ইমিউনিটি কতটা কার্যকর

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ০৬:০৭ এএম

করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর হার্ড ইমিউনিটির পথে এগোতে চেয়েছিল কিছু দেশ। কিন্তু এই পদ্ধতি কার্যকর করতে না পারায় সে দেশগুলোকেও শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে লকডাউন। ব্যতিক্রম সুইডেন। তারা মে মাস নাগাদ হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করছে। দীর্ঘদিনের লকডাউনের ক্ষতি কমাতে এখন বিভিন্ন দেশ আবার হার্ড ইমিউনিটিতে আস্থা খোঁজার চেষ্টা করছে। হার্ড ইমিউনিটি কী, কীভাবে কাজ করে, কভিড-১৯-এ হার্ড ইমিউনিটি কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে বিভিন্ন দেশের ভাবনা

আমেরিকা : করোনা সংকটে বিশ্ব যখন দিশেহারা, তখন অনলাইনে ‘ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটন করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছেছে’ এমন একটি খবর বেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, অধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার কারণে নিজেদের ভেতর অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, যার কারণে ভাইরাস খুব বেশি ছড়াবে না। তবে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতেও পার্থক্য আছে। একদল সমর্থন দিচ্ছেন, অন্য দল বলছেন এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেসের পরিচালক ডক্টর অ্যান্থনি ফওসির মতে, ভাইরাসটি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওয়াশিংটনের ফ্রেড হাচিনসন ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড দি ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের জীব পরিসংখ্যানবিদ এলিজাবেথ হ্যালোরানের ভাষ্য হলো, ‘এ মুহূর্তে আমাদের জনগণের হার্ড ইমিউনিটি তৈরির খুব বেশি সে ক্ষমতা নেই। সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য আমরা ধীরে ধীরে সব খুলে দিচ্ছি, ধারণা করছি হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য সেটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু আমরা এখনো জানি না কতজন আক্রান্ত। আর তাই হার্ড ইমিউনিটি কীভাবে তৈরি হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে আশা করছি, এই পদ্ধতি অনুসরণের কারণে জনগণের মধ্যে ইমিউনিটি বাড়বে এবং হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে।’

বলা যায়, আমেরিকা এ মুহূর্তে একটি জটিল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ভাইরাস ছড়িয়ে সেটার মাত্রা নির্ধারণ করার জন্য বেশ কিছু শহরে ধীরে ধীরে কর্মস্থল, দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, যদি আবার আক্রান্তের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়তে থাকে, তখন আবার সব লকডাউন করে দেওয়া হবে।

সুইডেন : করোনাভাইরাসের কঠিন সময়ে অন্য দেশগুলোর চেয়ে একদম আলাদা পথে হেঁটেছে সুইডেন। অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশগুলোর মতো জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা দেয়নি, ব্যস্ত সড়কে অথবা ক্যাফে-রেস্টুরেন্টে দেখা গেছে মানুষের কোলাহল। সামাজিক দূরত্ব মানা কঠিন হতে পারে ভেবে হাইস্কুল ও ইউনিভার্সিটি বন্ধ করা হলেও ছোট শিশুরা নিয়মিত স্কুলে গেছে। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত খোলা ছিল। তবে সব যে গড়পড়তাভাবে আগের নিয়মেই চলেছে তা নয়। কিছু নিয়ম তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। যেমন নিজ দায়িত্বে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অসুস্থ হলে বাসায় থাকা, সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করা ইত্যাদি। সুইডেনের মানুষ এই বিধিনিষেধ মেনে চলেছে খুব সুন্দরভাবে। আগামী মে মাস নাগাদ সুইডেন হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমেরিকায় সুইডেনের অ্যাম্বাসেডর কারিন উলরিকা সম্প্রতি এমনটিই জানান আমেরিকার জাতীয় রেডিওতে।

বিশ্বব্যাপী তিন মিলিয়ন মানুষ এ মুহূর্তে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষের। মানুষ সুস্থ হবে, আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে এমন বলা হলেও প্রশ্ন উঠেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে এই হার্ড ইমিউনিটি কীভাবে বাঁচাবে আর এই ইমিউনিটি কতক্ষণইবা টিকে থাকবে।

ব্রিটেন : শুরুর দিকে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে বলেছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রধান বিজ্ঞান উপদেষ্টা প্যাট্রিক ভ্যালেন্স বলেছিলেন, ‘দেশে এক প্রকার হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে করে আরও মানুষ রোগ প্রতিরোধী হয়ে সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পারে।’ তবে প্রকোপ সামলানোর মতো যথাযথ হিসাবে হয়তো ব্রিটেনের ভুল ছিল। দেশটিতে বেড়েছে মৃত্যুর মিছিল, বরিস জনসন নিজেও আক্রান্ত হয়েছেন কভিড-১৯-এ। পুরো দেশ এখন লকডাউনে। এ সময় আরও বাড়ানো হয়েছে।

হল্যান্ড : ইউরোপের হল্যান্ড প্রথম থেকে হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব মেনে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ফলাফল খুব একটা আশাপ্রদ হয়নি। মার্চের মাঝামাঝি ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট্টে তাদের পরিকল্পনার কথা জানান। দেশটিতে তরুণদের সংখ্যা বেশি। তাই বয়স্কদের বাড়িতে রেখে তরুণ সমাজে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ভাইরাস ছড়িয়ে তার প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়াটাই ছিল মূল পরিকল্পনা। তবে শেষ পর্যন্ত হল্যান্ডকেও লকডাউনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

ব্রাজিল : করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্রাজিলের ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো কভিড-১৯-কে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ছোটখাটো ফ্লু’ হিসেবে। শুরু থেকেই ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে গৃহীত সামাজিক দূরত্বের নীতির সমালোচনা করেছেন তিনি। মার্চের শেষ দিকে ‘আমাদের সবারই এক দিন মরতে হবে’ মন্তব্য করে ব্রাজিলিয়ানদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান। তিনিও হয়তো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন হার্ড ইমিউনিটি দেশকে বাঁচাবে। এমন সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলার বদলে আরও জটিল করে তুলেছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রতিনিয়তই সক্ষমতা হারাচ্ছে দেশটি। গত সপ্তাহেই ব্রাজিলে আকস্মিকভাবে সংক্রমিত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। এরপরও দেশটিতে সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো চূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞ দল। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) ইনফেকশাস ডিজিজ বিভাগের ক্লিনিক্যাল পেডিয়াট্রিকস বিষয়ের অধ্যাপক কারিন নিয়েলসেন বলেন, বিষয়টি ব্রাজিলের জন্য ভয়ংকর রকমের দুর্যোগ হয়ে দেখা দিতে পারে। বর্তমান মহামারী পরিস্থিতি দেশটির বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও চাপে ফেলেছে। দেশটির সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন রোগীর ভিড় বেড়েই চলেছে। বড় শহরগুলোর হাসপাতালের আইসিইউতে এখন আসন সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

হার্ড ইমিউনিটি কী

হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে সুইডেন অন্যান্য দেশের চেয়ে সফল বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে অনেক দেশই। আর সে কারণে বড় দেশগুলোতেও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এ পথে হাঁটার কথা নতুন করে ভাবছে এখন।  হার্ড ইমিউনিটি আসলে কী? হার্ড ইমিউনিটি বলতে বোঝায়, যখন কোনো অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে আপনাআপনি প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ তারা রোগ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এতে করে যারা আক্রান্ত হয়নি, তাদের মধ্যেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এটি দুভাবে হতে পারে। এক, অনেক মানুষ একসঙ্গে একই সময়ে আক্রান্ত হবে এবং প্রাকৃতিকভাবে তাদের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হবে। দুই, ইমিউনিটির জন্য রোগের বিরুদ্ধে বেশির ভাগ মানুষকেই ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

কীভাবে হার্ড ইমিউনিটি কাজ করে

যখন অধিকাংশ মানুষ রোগে আক্রান্ত হয়ে যাবে, তখন ধীরে ধীরে রোগের বিস্তার কমে আসবে অথবা বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই শিকলটা ভেঙে গেলে আবার মানুষের মধ্যে ইনফেকশন ছড়ানো বন্ধ হয়ে যায়। তখন এটি যারা ভ্যাকসিন নেয়নি অথবা যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল, তাদের জন্য সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। যেমন বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু-কিশোর, গর্ভবতী নারী, যাদের অন্যান্য শারীরিক সমস্যা আছে এমন ব্যক্তি।

হার্ড ইমিউনিটি ও পরিসংখ্যান

কিছু রোগের জন্য, হার্ড ইমিউনিটি কার্যকর হতে পারে যদি জনসংখ্যার অন্তত ৪০ শতাংশের মধ্যে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, রোগের বিস্তার বন্দ করতে ৮০-৯৫ ভাগ জনসংখ্যার মধ্যে অবশ্যই ইমিউনিটি সিস্টেম তৈরি হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, ২০ জন ব্যক্তির মধ্যে যদি ১৯ জনেরই হামের ভ্যাকসিন দেওয়া থাকে, তবে হার্ড ইমিউনিটি এ ক্ষেত্রে কাজ করবে এবং রোগটিকে আর ছড়াতে দেবে না। এর অর্থ হচ্ছে, যদি একটি শিশুর হাম হয়, তবে সে বাদ দিয়ে তার আশপাশের সবার ভ্যাকসিন ইতিমধ্যে নেওয়া থাকতে হবে এবং তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে হবে। পরে এই ইমিউনের কারণে রোগ বিস্তার লাভ করবে না। যদি শিশুটির পাশে ভ্যাকসিনেটেড মানুষ কম থাকে, তবে রোগের বিস্তার দ্রুত হবে, কারণ তাদের কারও মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি নেই। এ মুহূর্তে যেহেতু কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি, তাই এ ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের কৌশল হিসেবে বিস্তৃত আকারে এবং ব্যাপকভাবে একে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, যখন কোনো রোগ সূচকীয় হারে ছড়াতে থাকে, তখন মোট জনসংখ্যার অর্ধেকও যদি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তবে মহামারী আর সেই হারে ছড়াতে পারে না। জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার হারের সঙ্গেও হার্ড ইমিউনিটির গাণিতিকভাবে সম্পর্ক আছে। এই জীবাণু ছড়ানোর হারকে Reproduction number, R0  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, করোনাভাইরাসের R0  ২ থেকে ২.৫-এর মধ্যে। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত মানুষের মাধ্যমে এই রোগ দুজনের মধ্যে ছড়াতে পারে। কোনো জনপদের একজন যদি ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে তার মাধ্যমে আরও দুজন মানুষের মধ্যে সেটি ছড়িয়ে পড়বে। এভাবে এই সংখ্যা ৪, ৮, ১৬, ৩২ ... হারে চলতে থাকবে। কিন্তু যদি সেই জনপদের অর্ধেক লোকের মধ্যেও রোগটি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়, তাহলে একজন মানুষের মাধ্যমে আক্রান্ত হবেন একজনই। অর্থাৎ ১, ১, ১ ... এভাবে চলতে থাকবে, যা আগের ছড়ানোর হারের তুলনায় অর্ধেক। সুতরাং যত বেশি মানুষ প্রতিরোধী হবে, সংক্রমণের হার তত কমে আসবে এবং একসময় শূন্যে নেমে আসবে।

প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

এ বিষয়টি ঘটে যখন কেউ কোনো নির্দিষ্ট রোগের সংক্রমণের পর সেটির প্রতিরোধক শক্তি অর্জন করেন। তখন শরীরের অভ্যন্তরে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে বাধ্য করে এই ইমিউন সিস্টেম। শরীরের অভ্যন্তরের জীবাণুকে চিনে নেওয়ার জন্য অ্যান্টিবডি হচ্ছে দেহরক্ষী। তবে একই রোগে যদি কেউ পরে কখনো আবার আক্রান্ত হন, তখন এই অ্যান্টিবডি জীবাণুর বিরুদ্ধে আর কাজ করবে না। প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ন্যাচারাল ইমিউনিটি) হয়তো হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কখনোই ভ্যাকসিনের মতো কাজ করবে না। এর কিছু কারণ হচ্ছে ইমিউন সিস্টেমের জন্য তাহলে সবাইকেই অন্তত একবার হলেও অসুস্থ হতে হবে, অসুস্থতা যে কোনো শারীরিক সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে, আর আপনি অসুস্থ হবেন কি না অথবা আপনার মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হবে কি না তা আপনি নিজেই জানেন না।

হার্ড ইমিউনিটির সফলতা

কিছু রোগের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি কাজ করেছে। যেমন নরওয়ের জনগণ এইচওয়ানএনওয়ান ভাইরাসের (সোয়াইন ফ্লু) ভ্যাকসিন এবং প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। এই নরওয়েতেই, বেশির ভাগ জনগণের মধ্যে ইমিউনিটি থাকায়, ২০১০ এবং ২০১১ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর হার কম ছিল।

২০১৫ সালে ব্রাজিলে জিকাভাইরাস মহামারী আকারে ধারণ করার দুই বছর পর একদল গবেষক সালভাদর শহরে ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ লোকের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গবেষণায় দেখা যায়, হার্ড ইমিউনিটি জিকাভাইরাসের বিস্তার রোধে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। দেশজুড়ে সোয়াইন ফ্লু এবং অন্যান্য মহামারী ছড়ানো বন্ধে হার্ড ইমিউনিটি সাহায্য করেছে। তবে এটি হয়েছে সবার অজান্তে। আবার, এটি যেসব রোগের ক্ষেত্রেই একইভাবে কাজ করে, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।

কভিড-১৯ এবং হার্ড ইমিউনিটি

এ মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব এবং বারবার হাত ধোয়াই কভিড-১৯-এর হাত থেকে নিজেকে দূরে রাখার একমাত্র উপায়। কভিড-১৯ ঠেকাতে হার্ড ইমিউনিটি কেন একমাত্র উপায় নয়, তার কিছু কারণ হচ্ছে ১. এখনো এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা যায়নি। কারণ একটি জনসংখ্যার মধ্যে হার্ড ইমিউনিটির অভ্যাস করাতে হলে ভ্যাকসিন একমাত্র নিরাপদ উপায়। ২. এখনো কভিড-১৯ নিয়ে নানা গবেষণা হচ্ছে, ৩. এই ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে সমাজের বয়স্ক এবং শারীরিক সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিরা দ্রুত আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন, ৪. তরুণ ও সুস্থ ব্যক্তিরাও এতে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে, ৫. অধিকাংশ মানুষ একসঙ্গে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। পর্যাপ্ত আইসিইউ ও ভ্যান্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকলে সেটি অনেক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হয়ে সেই রোগ প্রতিরোধী হতে হবে। এদিকে করোনাভাইরাস একদম নতুন ভাইরাস হওয়ায় এর সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের হাতে এখন খুব বেশি তথ্য নেই। তাই যারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, তারা কতটা এই রোগ প্রতিরোধী হচ্ছেন, সেটি নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না। তাই কভিড-১৯-কে রুখতে হার্ড ইমিউনিটি সমাধান নয়। বরং একবার যদি ভ্যাকসিন তৈরি হয়, তবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির মাধ্যমে যারা এ মুহূর্তে দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের মাঝে আছেন, তারা সুরক্ষা পেতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত