সারা দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতায় ঝালকাঠিতে সেই সংখ্যাটি তুলনামূলক কম। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার ৩৩ দিন পর জেলায় প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ২৫ দিনে জেলায় রোগী বেড়েছে মাত্র ১০ জন।
সিভিল সার্জন অফিসের দাবি, এখন পর্যন্ত যত রোগী শনাক্ত হয়েছে তাদের সবারই সংক্রমণের উৎস নিশ্চিত করে লকডাউনের মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে পাশের জেলায় বরগুনায় ৩৪ জন, পটুয়াখালীতে ৩০ জন, বরিশালে ৪০ জন আক্রান্ত এবং ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পিরোজপুরে গতকাল পর্যন্ত ৯ জন করোনা রোগী পাওয়া গেছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত ৮৩৫ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৪ দিন পূর্ণ হওয়ায় ৬৮০ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে পুলিশের এসআই সুস্থ হয়ে বাড়িতেই পর্যবেক্ষণে আছেন।
রবিবার পর্যন্ত জেলাটিতে মোট ৩৭০ জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে ২৮২ নমুনার পরীক্ষার ফল পাওয়া গেছে।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, গত ১১ এপ্রিল ঝালকাঠিতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর চার দিন আগে জেলার সদর উপজেলার বিন্নাপাড়া গ্রামে এক দম্পতি ঢাকা থেকে তাদের ৬ মাসের শিশুসন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। করোনা উপসর্গ থাকায় ৯ এপ্রিল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠালে ১১ এপ্রিলের রিপোর্টে তাদের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। এরপর ১৬ এপ্রিল একই গ্রামের ইউপি সদস্য করোনায় আক্রান্ত হন। এর আগে তিনি আক্রান্ত ওই দম্পতির বাড়িতে যাতায়াত করতেন। ইউপি সদস্য আক্রান্ত হওয়ার খবরে প্রশাসন আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে ওইদিন রাতেই লকডাউন ঘোষণা করে ঝালকাঠি সদর।
গত ১৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এক এসআই ঝালকাঠির গ্রামের বাড়িতে আসেন। করোনার উপসর্গ না থাকলেও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসার কারণে তার রক্তের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠালে ১৯ এপ্রিল তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। বর্তমানে পুলিশের এই এসআই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় আছেন।
সদরের বাইরে নলছিটি উপজেলায় গত ২২ এপ্রিল একজন পুরুষের দেহে করোনা সংক্রমণ পাওয়া যায়। তিনিও এর কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রামে এসেছিলেন। এর কয়েক দিন পর ২৭ এপ্রিল একই উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক চিকিৎসকের দেহে করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। তিনি হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়েই আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
এরপর গত ২৮ এপ্রিল জেলার রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একজন জ্যেষ্ঠ সেবিকা করোনায় আক্রান্ত হন। করোনায় কীভাবে আক্রান্ত হয়েছেন জানতে চাইলে ওই জ্যেষ্ঠ সেবিকা মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন এই হাসপাতালে চাকরি করার সুবাধে আমার কাছে উপজেলার বাইরে থেকেও অনেকে চিকিৎসা পরামর্শ নিতে আসেন। আর বেশিরভাগ সময় রাতে ডিউটি থাকায় অনেকে জরুরি সেবা নিয়ে চলে যায়। আমি যাদের সেবা দিয়েছি তাদের হয়তো কারও করোনা পজিটিভ ছিল। সেখান থেকেই আমি আক্রান্ত হয়েছি।
এ ছাড়াও ৩০ এপ্রিল জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একজন ইপিই সুপারভাইজার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
সবশেষ গত রবিবার পৌর এলাকার একজন প্রবাসীর স্ত্রী ও একজন লবণশ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রবাসীর স্ত্রী বাজার থেকে ওই লবণশ্রমিক নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা জাহাজের লোকদের সংস্পর্শে থেকে আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদার বলেন, প্রথম থেকেই আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা সচেতন ছিল। তারা জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে খোঁজখবর রেখেছেন। হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। যারা জ্বর বা সর্দি কাশিতে আক্রান্ত ছিল তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগে ডাক্তারসহ সবাই করোনা মোকাবিলায় নিজের অবস্থান থেকে কাজ করেছেন বলেই এখনো পাশের অন্যান্য জেলার চেয়ে ঝালকাঠিতে আক্রান্ত কম হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জোহর আলী বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রথম যেটা দরকার সেটা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সমগ্র জেলাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছি, হাট-বাজারগুলোকে উন্মুক্ত স্থানে দূরত্ব বজায় রেখে বসার ব্যবস্থা করেছি। বিশেষ করে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের কন্টাক্টিং সোর্স যারা ছিলেন তাদেরকে খুঁজে বের করে হোম কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করেছি। সেটাই এখনো আমাদের বড় সফলতা।
