হার্বি টেইলর : প্রোটিয়াদের প্রথম সুপারস্টার

আপডেট : ০৫ মে ২০২০, ০৬:০৬ এএম

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি তখনো। এর আগেই হার্বি উইলফ্রেড টেইলর ক্রিকেটে নামডাক করে ফেলেছেন। আর করবেনই না কেন? ম্যাটিং পিচের মাস্টার ছিলেন যে! শয়ে শয়ে রান করেছেন। নিজের দেশ দক্ষিণ অফ্রিকার নেতৃত্বও দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার, রয়্যাল ফিল্ড আর্টিলারিতে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছেন তিনি।

১৮৮৯ সালের ৫ মে ডারবানের নাটালে জন্ম হার্বি টেইলরের। তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার। আজ তার ১৩১তম জন্মদিন।

২৩ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক টেইলরের। টেস্ট ক্রিকেটের তখন প্রথম যৌবন। কথাটা শুনতে একটু কেমন কেমন লাগছে না? ক্রিকেটের প্রপিতামহ ডব্লিউ জি গ্রিস ততদিনে অবসর নিয়ে ফেলেছেন। ইংল্যান্ডের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে আর্চি ম্যাকলারেনকে। সেই সময়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা। তার আগে ক্রিকেট মানেই ছিল ইংল্যান্ড নয়ত অস্ট্রেলিয়া। এর বাইরে আফ্রিকার উঠে আসা, তারপর নিউজিল্যান্ড ও উইন্ডিজের যোগদানকে তাই টেস্ট ক্রিকেটের উন্মেষকাল বলা যায়। পছন্দ না হলে সেই সময়কে ক্রিকেটের সাদাকালো যুগ কিংবা মান্ধাতা আমলও বলতে পারেন। তো সেই সময়ই অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে দাপিয়ে ক্রিকেট খেলেছেন হার্বি টেইলর। শুধু খেলেননি, দলকে জিতিয়েছেনও। আদর্শ ম্যাচ উইনার বলতে যা বোঝায় টেইলর ছিলেন তাই। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৪২টা টেস্ট খেলেছেন। সেঞ্চুরি করেছেন ৭টি। মজার ব্যাপার এই ৭ সেঞ্চুরির তিনটিতে তার দল জিতেছিল। অন্য যে ম্যাচটি দক্ষিণ আফ্রিকা জেতে সেখানেও ৯১ রান করেছিলেন টেইলর। তার খেলা ৪২ টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ও পেয়েছে মাত্র চারটিতে।

হার্বি টেইলরের একক কৃতিত্বে ভাস্বর হয়ে আছে এমন একটি টেস্টের কথা বলা যাক। টেস্ট তখন অনন্তকাল ধরে চলত। মানে হার-জিত না হওয়া পর্যন্ত খেলা থামানোর কোনো নিয়ম ছিল না। জাহাজে চড়ে সাগরে ভাসতে ভাসতে দিন-সপ্তাহ-মাস ধরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পারি জমাতেন ক্রিকেটাররা। এমন সময়ই ১৯২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়েছিল ফ্রঙ্ক মানের ইংল্যান্ড। জোহানেসবার্গে খেলেছিল প্রথম টেস্ট। টস জিতে আগে ব্যাট নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। যদিও ভালো করতে পারেনি। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪৮ রানে অল আউট হয়। জবাবে ইংল্যান্ডও সুবিধা করতে পারেনি। ১৮২ রানে অল আউট হয়েছিল তারা। সামান্য লিড নেওয়ার পর ইংলিশদের দিকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ঝোঁকার কথা ছিল। তা হয়নি কেবল অধিনায়ক হার্বি টেইলরের কারণে। ইংলিশ বোলিংকে তুলোধুনো করে ১৭৬ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ৩১০ মিনিট উইকেটে ছিলেন। মেরেছিলেন ২৫টি বাউন্ডারি। সতীর্থ উইলিয়াম ব্রানকে নিয়ে দলকে ৪২০ রানের পাহাড়ে পৌঁছে দেন। ফলে জোহানেসবার্গ টেস্ট জেতার জন্য ইংল্যান্ডের সামনে ৩৮৭ রানের টার্গেট নির্ধারিত হয়। স্যান্ডহাম, ক্যারি, উলিদের ইংল্যান্ড মাত্র ২১৮ রান করতে পেরেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট জিতেছিল ১৬৮ রানে। পাঁচ টেস্টের সিরিজে ১-০তে এগিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য ২-১-এ সিরিজ জিতেছিল ইংল্যান্ডই। হার্বি টেইলরের সেই ইনিংস বিশেষ ছিল নানা কারণে। সেই টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসটি ছিল ৫০ রানের, যা করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রান। ইংল্যান্ডের কোনো ব্যাটসম্যান হাফসেঞ্চুরি করতে পারেননি।

দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ১৮ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন হার্বি। তার অধিনায়কত্বের ক্যারিয়ার দুই পর্বে বিভক্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে। মোট ৪২ টেস্টে ৪০.৭৭ গড়ে ২৯৭৬ রান করেছেন। ৭ সেঞ্চুরির সঙ্গে ছিল ১৭ হাফসেঞ্চুরিও। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই বেশি উজ্জ্বল ছিলেন হার্বি টেইলর। ২০৬ ম্যাচে ৩০টি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। ৪১.৮৬ গড়ে রান করেছেন ১৩১০৫। হাফসেঞ্চুরি ছিল ৬৪টি।  মাঠের এই কৃতিত্বের পাশে যোদ্ধা হার্বির কৃতিত্ব কেউ মনে রাখেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। রীতিমতো কামান দেগে যুদ্ধ করেছেন। বেঁচে ফেরার পর আবার ব্যাট হাতে নিয়েছেন। ক্রিকেট ছাড়ার পর কেপটাউনে ছোট বাচ্চাদের কোচিং করাতেন। ১৯৭৩ সালে কেপটাউনেই ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত