বেশ কিছুদিন ধরে এমন আশঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছিল সবার মধ্যে। অবশেষে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়, তাও প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল। আর এ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সংক্রমিত এলাকাগুলোতে জনসাধারণের জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। গত ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় এ-সংক্রান্ত জারিকৃত ঘোষণায় বলা হয়, যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করায় লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েছে এবং লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। হাঁচি, কাশি ও পরস্পর মেলামেশার কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে এ রোগের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এ রোগের একমাত্র প্রতিষেধক হলো পরস্পর থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করা। জনসাধারণের একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা নিষিদ্ধ করা ছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ঘোষণায় বলা হয়, যেহেতু বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এ রোগের সংক্রমণ ঘটেছে, সে কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১ নম্বর আইন)-এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলো। সংক্রমিত এলাকাগুলোর জনসাধারণের জন্য কিছু কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নির্দেশনাগুলো হলো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রশমনে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারবেন না। এ আদেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে ‘সংক্রামক রোগ আইন’-এর ক্ষমতাবলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে জেলা-উপজেলা লকডাউন করে প্রশাসন।
বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সব কাজ সারা দিন ফেলে রেখে আসর ওয়াক্তের (শেষ বেলায়, দিন শেষের ঘণ্টাখানেক আগে) সময় জোরেশোরে শুরুর প্রবণতার বাইরে আসার প্রয়োজন ছিল অন্তত করোনাভাইরাস মোকাবিলার ক্ষেত্রে। যা হোক, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে করোনাযুদ্ধেও একটি অতি কঠিন ক্রান্তিকাল পার করছে। করোনা সংক্রমণের মূল লক্ষ্য যেহেতু সমাজ, সংসার ও পরিবার এমনকি আপনজন থেকে আলাদা করা ব্যক্তি, সেহেতু ব্যক্তির ‘সচেতনতা’, নিজেকে নিরাপদ রেখে অন্যকে বাঁচানোয় ‘দায়িত্বশীল’ হওয়ার কঠিন ব্রত তার সামনে। সে ব্রত পালনে তার চাই দৃঢ়চিত্ত মনোবল, মানসিক শক্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্থতার সংজ্ঞা দিয়েছে, Health is a state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmity অর্থাৎ রোগবালাই মুক্ত হলেই শুধু নয়, শারীরিক বা দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সবলতাই সুস্থতা। সুস্থতার এ সংজ্ঞা একজন ব্যক্তি বা ব্যষ্টির জন্য যেমন সত্য, ব্যষ্টির সমষ্টি পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্যও প্রযোজ্য। একবিংশ শতাব্দীতে এ পর্যন্ত সর্ববৃহৎ মহামারী বলে বিবেচিত করোনাভাইরাস বৈশ্বিক বিচরণে যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে, তাতে পৃথিবীর তাবৎ নাগরিকের ব্যক্তিগত শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শান্তি ও সামাজিক সুরক্ষা সংকটের সম্মুখীন আর এর জন্য বর্তমান কিংবা আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাও দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। উচ্চবিত্ত বাদে মধ্যবিত্তসহ অন্যান্য সবাই (৯৬ শতাংশের বেশি মানুষ) স্বাভাবিক জীবনযাপনে ও ধারণে প্রাণান্ত সংগ্রামে। এ পরিস্থিতিতে মহামারী করোনা মোকাবিলায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ঠাসা বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত এবং সমন্বয়হীন কর্মসূচি পালনের সময় মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য। অনেক আপনজনের মৃত্যুসংবাদ শুনতে হবে, সমবেদনা জানাতে যাওয়া যাবে না, এহেন পরিস্থিতিতে অনেক কিছু মেনে নিয়ে নিজেকে আত্মশক্তিতে সোপর্দ করতে হবে। দেশ-বিদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল চিত্র দেখে আস্থাহীনতায় আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে, যা মানসিক অশান্তির উপসর্গ। অথচ মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী মোকাবিলায় প্রাণশক্তি বা প্রতিষেধক হতে পারে। বাংলাদেশে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তৎপরতায় (যা মাননীয় উচ্চ আদালতও ৫ মার্চ সরকারকে তাগিদ দিয়েছিল) বিলম্ব, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়ে উঠলে আস্থাহীন অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কান্ডারিকে হুঁশিয়ার করে দিতে নজরুলের ছিল সেই আহ্বান, ‘ওরা হিন্দু না মুসলিম? এই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারি বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’। গৃহীত সব পদক্ষেপে, দোষারোপে, বিচ্যুতির পরিবর্তে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এ যুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ঐশ্বর্য মতানৈক্যের মাশুল দিতে দিতে যেন শেষ না হয়।
এটা উপলব্ধির অবশ্যই অবকাশ রয়েছে যে, মহামারী করোনা নানা ক্ষেত্রে মানুষের সীমালঙ্ঘনের প্রতিফল। প্রকৃতির প্রতিশোধ। খাদ্য স্বভাব ও উপায় উপকরণ থেকে শুরু করে মৌলিক অধিকার অস্বীকৃতি, সুশাসন নির্বাসন, পারস্পরিক দোষারোপে জবাবদিহিবিহীনতায়, পরিবেশ দূষণ-দুষকর্মে সদাচার, সহমর্মিতার, সত্যম শিবম সুন্দরের সহ-অবস্থানের সুযোগ যখন হয় তিরোহিত, প্রতিবিধানে জাগতিক বা বাহ্যিক বিচারব্যবস্থা হয় অপারগ, তখন তার মতো প্রতিশোধ প্রতিবিধানের একটা পথ বেছে নেয় প্রকৃতি। করোনা তেমন এক প্রকার উপায় বা উপলক্ষ। তাবৎ ঐশী গ্রন্থে সৃষ্টিকর্তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যখন যে জনপদ, সম্প্রদায় নানাভাবে বাড়াবাড়ি করেছে স্বভাবে, বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনায়, তখন তাদের ওপর নিপতিত হয়েছে অশেষ দুর্ভোগ। উদ্ধত উদভ্রান্ত অনেক জনপদকে উল্টিয়ে দেওয়ার উপমা টেনে, ‘ফল ফসল ও জীবনের অশেষ ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা অনুশোচনার উপলব্ধিকে করা হয়েছে জাগ্রত’। সুতরাং করোনাকে নয়, সবার সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করা প্রয়োজন। অনুশোচনা, অনুতাপ থেকে মার্জনা প্রার্থনা, প্রকৃতির সম্পদ অপব্যবহার, সুযোগের অপপ্রয়োগ, অন্যের অধিকার হরণের মতো আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা থেকে ফিরে আসার অয়োময় বাধ্যবাধকতাই করোনাকালের দাবি।
চিন্তা থেকে কাজের উৎপত্তি। চিন্তা বা নিয়ত বা কর্মপরিকল্পনা পল্লবিত হয় আত্মায়। পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এই আত্মার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ঠিক থাকা জরুরি। কেননা, ভালো-মন্দ, ভূত-ভবিষ্যৎ জ্ঞান পরমাত্মার এখতিয়ার। যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী যেমন সব সময় হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নির্দেশনা মতো কাজ করে, হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে রসদপ্রাপ্তিতে বিপত্তি ঘটে, শত্রুর অবস্থানের নিশানা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে দিশেহারা হয়ে শত্রুর কব্জায় চলে যেতে পারে ওই বাহিনী। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, তার জীবনসংগ্রামে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই সে পাবে প্রেরণা, অশুভ শক্তি, পথ বা প্রবণতা থেকে ফিরে আসা, বিপদ তারণের মদদ, বিপদে সৃষ্টিকর্তার কাছে জানাবে ফরিয়াদ ও চাইবে মার্জনা। এটাই তার মনের শক্তি ও সান্ত্বনা অর্জনের পথ। করোনা মহামারী প্রকৃতির প্রতিশোধ, নানাবিধ সীমালঙ্ঘনের অভিঘাত ও প্রতিফল। সুতরাং এ থেকে নিষ্কৃতি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় অনতুপ্ত অনুশোচনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তা পাওয়াই তার মানসিক শান্তি ও শক্তি। চীন থেকে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, সিঙ্গাপুর, ইরান, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য সর্বত্র যার যার ধর্ম বিশ্বাসমতো সৃষ্টিকর্তার প্রতি আবেদন-নিবেদনে নত করোনাক্লিষ্ট রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান থেকে সবাই।
বিধাতার প্রতি নৈবেদ্য, তার স্মরণ সব সমাজে অনবদ্য সাধনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মানুষে মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের ব্যাপক ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে বিধাতার কাছে তার নৈবেদ্য নিবেদনের কাব্য ‘গীতাঞ্জলি’র গান বা কবিতাগুলোর জন্য। স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার উপলব্ধি এবং তারই কাছে এর পরিত্রাণ প্রার্থনাই আজকের সংকট মোকাবিলার জন্য অপরিহার্য।
লেখক
সাবেক সচিব
এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান
