স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ নামেমাত্র বাড়ছে

আপডেট : ১০ মে ২০২০, ০৪:৪৬ এএম

করোনাভাইরাসজনিত কভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবের পর দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভঙ্গুর চিত্র ফুটে উঠেছে। করোনায় সংক্রমিত হয়ে অধিকাংশ মানুষ সেবা যেমন পাচ্ছে না, তেমনি অন্যান্য রোগীও চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগসহ (সিডিপি) বিভিন্ন মহল। কেননা এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সর্বনিম্ন। এরপরও আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অল্প বাড়ছে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকছে ১২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) এডিপি বরাদ্দের চেয়ে সামান্য বেশি। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, স্বাস্থ্য বিভাগের চাহিদা অনুসারেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এর বেশি বরাদ্দ দিলেও ব্যয় করা যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো বা মেশিন ক্রয় নয়, স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। মানুষ বিদ্যমান অবকাঠামোতেই সেবা পাচ্ছে না।

পরিকল্পনা কমিশন আগামী অর্থবছরের এডিপির বরাদ্দ ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বিভাজনের খসড়া তৈরি করেছে। খসড়া প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে ১২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ১০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ২ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের মূল এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ১১০ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছরের এডিপিতে চলতি বছরের চেয়ে বরাদ্দ বাড়ছে ১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপির সিলিং দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদার ভিত্তিতে এই অর্থ বিভাজন করা হয়েছে। এখানে স্বাস্থ্য বিভাগও ব্যতিক্রম নয়। সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনার আলোকেই করা হয়েছে।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিকল্পনা উইংয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেকে স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়ন বরাদ্দ দ্বিগুণের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা যতটুকু বরাদ্দ চেয়েছি এটা ঠিক আছে। কারণ বরাদ্দ নেওয়ার পর তা ব্যয়ও করতে হবে। রাতারাতি আমাদের সামর্থ্য বেড়ে যাবে কি?’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি উত্তরণের পর যদি এডিপির অর্থ ব্যয়ে গতি আসে, তবে সংশোধিত এডিপিতে আরও বরাদ্দ চাওয়া হবে।’ 

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে সংশোধিত এডিপিতে এই বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ১১০ কোটি টাকা, অর্থবছরের ৬ মাস পর বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল এডিপির চেয়ে বরাদ্দ বেড়েছে ১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এশিয়ার অন্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে কম। করোনাভাইরাসের এই সময়টাতে বোঝা গেল দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কত নাজুক। উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এখন প্রশ্ন থাকে, মন্ত্রণালয়ের ব্যয় করার মতো সামর্থ্য রয়েছে কি না। এক্ষেত্রে সক্ষমতা না থাকলে বাড়াতে হবে।’  তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন ব্যয় বলতে শুধু অবকাঠামো বা মেশিন ক্রয় নয়, স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোকেও  বোঝায়।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনার এই সময়টাতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ আইসিইউ বেড, মানসম্মত ল্যাবরেটরি, জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন প্ল্যান্ট অথবা স্টোরেজ এবং প্রান্তিক পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত। এখানে বিল্ডিং বা মেশিন ক্রয়ের চেয়ে সেবার মান বাড়ানো জরুরি। এজন্য বিদ্যমান জনবল কাঠামোকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেবার মান বাড়াতে কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে সেটা চিহ্নিত করতে হবে।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি এডিপিতে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ৫৭টি প্রকল্প আছে। সম্প্রতি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থায় দুটি বড় প্রকল্প পাস করা হয়। এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ সহায়তা দিয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম বলেন, ‘প্রয়োজনের স্বার্থে যেকোনো সময় প্রকল্প নেওয়া যায়। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য খাতে দুটি প্রকল্প পাস হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে পাস করা দীর্ঘসূত্রতার বিষয়। তবে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের চেয়ে অনুন্নয়ন বরাদ্দ বেশি বাড়বে বলে আশা করি। এ ছাড়া বাজেটে থোক বরাদ্দও রাখা হতে পারে।’ 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মূল এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এই এডিপি পাস করার জন্য শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

উল্লেখ্য, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের একটি চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনটিতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ ব্যয় করত। সেটা সর্বশেষ বাজেটে কমে দশমিক ৮৯ শতাংশে এসেছে। এর মানে হলো, দেশের জিডিপির আকার বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়েনি। ফলে জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্যে ব্যয় কমেছে। প্রতিবেদনে ৪৮টি দেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের মতো আর কোনো দেশই এত কম হারে ব্যয় করে না। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ড স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৯ শতাংশের বেশি ব্যয় করে।

গতকাল শনিবার সিপিডি তাদের বাজেট প্রস্তাবনায় বলেছে, আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসহ ৪টি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত নাজুক, তা করোনাভাইরাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত