বিচারিক আদালতের অসংখ্য আইনজীবী শুনানির বাইরে

আপডেট : ১৮ মে ২০২০, ০৭:১০ এএম

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে আইনজীবী, সাক্ষী ও আসামিদের শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম সম্প্রতি শুরু হয়েছে। উচ্চ আদালতে এ পদ্ধতিতে শুনানি নিয়ে তেমন সমস্যা না থাকলেও অধস্তন আদালতে নানা বিড়ম্বনার কথা বলছেন আইনজীবীরা। এরই মধ্যে এ পদ্ধতিতে শুনানিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষে মত দেখিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতির নেতা ও আইনজীবীরা। তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে আইনজীবীদের বড় অংশ মামলার আবেদন ও শুনানির বাইরে রয়েছেন। নবীন আইনজীবীরা এর সঙ্গে ধাতস্থ হলেও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অনেকেই বিড়ম্বনা ও অস্বস্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে জামিনসংক্রান্ত নথি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আদালত থেকেই সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘আদালত কর্র্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০’-এর খসড়া অনুমোদন লাভের পর ৯ মে এ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে আপাতত আসামিদের জামিনের শুনানি হচ্ছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টে একাধিক ভার্চুয়াল বেঞ্চে অতি জরুরি ফৌজদারি, দেওয়ানি, রিট মামলাসহ বিভিন্ন মামলার শুনানি ও আদেশ হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে ভার্চুয়াল শুনানি শেষে গতকাল রবিবার আরও ৩ হাজার ৪৪৭ আসামি জামিন পেয়েছেন। এ নিয়ে অধস্তন আদালতে গত কয়েক দিনে ৭ হাজার ৬৪২ আসামি জামিন পেলেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম বাংলাদেশে নতুন ধারণা। আইনজীবীদের প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যায় পড়তে হবে, সেটি অনুমিতই ছিল। কিন্তু বিরূপ এই সময়ে এ ধরনের আদালতের কোনো বিকল্প ছিল না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে শুরু হবে, এ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। তাই সব আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্টদের এর সঙ্গে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হতে হবে। পাশাপাশি সুফল পেতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটসহ প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকেই প্রযুক্তির মাধ্যমে মামলার শুনানি করে এর সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছেন। আদালত একেবারে বন্ধ থাকার চেয়ে এভাবে মামলা হওয়া ভালো। অন্তত কিছু মানুষ তো উপকৃত হচ্ছে, বিচার পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অধস্তন আদালতে অনেক আইনজীবীর কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস, অ্যান্ড্রয়েড ফোন, কম্পিউটার-ল্যাপটপ নেই। তাই এর সঙ্গে সংযুক্ত ও যোগাযোগ করতে পারছেন না তারা। তরুণ আইনজীবীরা পারলেও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা অনেকেই তা পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার এবং আইনজীবী সমিতিগুলো আইনজীবীদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমি আশা করি। যাতে সব আইনজীবী এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন এবং সমান সুযোগ পান।’

সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বলেন, করোনা সংকটের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল কোর্টের সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যেহেতু প্রক্রিয়াটা হঠাৎ করেই হয়েছে তাই প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক। এটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ও ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগবে।

অধস্তন আদালতের কয়েকজন আইনজীবী জানান, ভার্চুয়াল আদালত চালু হলেও আইনজীবী সমিতির নির্দিষ্ট বুথ থেকে ওকালতনামা, বেইল বন্ড ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প আগের নিয়মেই সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া জামিনের আবেদন করতে কারাগার থেকে নথিতে আসামির স্বাক্ষর করিয়ে আনতে হচ্ছে। অসংখ্য আইনজীবীর কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন নেই। ওয়েবক্যাম ও স্ক্যানার চালাতেও তারা অভ্যস্ত নন। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘ভিডিও কনফারেন্সে শুনানি হলেও কিছু বিষয়ের জন্য আমাদের আদালতে যেতেই হচ্ছে। যে কারণে সুরক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। এ ছাড়া যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত উপকরণ যাদের রয়েছে তারাই কেবল শুনানি করতে পারছেন। আমরা যারা সাধারণ আইনজীবী তাদের জন্য এটি আরও সহজীকরণের দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রমে সুফলের পাশাপাশি আমাদের অস্বস্তিও রয়েছে। যারা জুনিয়র আইনজীবী তাদের জন্য খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। কারণ তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ। কিন্তু সিনিয়র আইনজীবীদের ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে শুনানি কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সম্প্রতি একটি মামলায় আমি শুনানি করতে গিয়ে একাধিকবার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। শুনানি করতে দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। নানা সমস্যার কারণে আইনজীবীদের বেশির ভাগ এ পদ্ধতিতে শুনানি করতে পারছেন না। অনেকেই এর সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করছেন। তাদের কোনো প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়নি যার মাধ্যমে এই কাজগুলো করা সম্ভব। এখন কীভাবে এটিকে আরও সহজীকরণ করা যায় এবং সীমিত আকারে আদালত চালুর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, আমরা সে অপেক্ষায় আছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত