অর্ধেক বোনাস প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে শ্রমিকরা

আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ০৩:০৯ এএম

গত বছরের মতো এবারও অর্ধেক (৫০ শতাংশ) ঈদ বোনাসের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। তারা ঈদের আগেই বকেয়া বেতন, শতভাগ বোনাস ও ঈদ উপলক্ষে আট দিন ছুটির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।

শিল্পপুলিশ জানিয়েছে, প্রায় কাছাকাছি দাবিতে গতকাল সোমবার সারা দেশে ৫৩টির বেশি কারখানায় বিক্ষোভ হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৩১টি বেশি। রবিবার ২২ ও শনিবার ১৮টিসহ চলতি মাসে ২৯৮টি কারখানায় বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এরই মধ্যে গতকাল বিকাশ ও নগদে বেতন না পেলে বিকেল ৪টার পর নতুন করে কিছু কারখানায় বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। যদিও এ সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশবিরোধী কিছু চর পোশাকশিল্পকে নষ্ট করতে কতিপয় শ্রমিক নেতার ইন্ধনে করোনার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মাঠে নামাচ্ছেন। তারা কেউই শিল্পবান্ধব শ্রমিক নন। প্রয়োজনে ঈদের পর এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ছুটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইন মেনে উৎসবের ছুটি দেওয়া হচ্ছে। তারা কী করে সাত-আট দিন ছুটি দাবি করে? আমরা বেতন, বোনাস ও ঈদ ছুটির জন্য শ্রম আইন অনুসরণ করছি।’

গত শনিবার স্বরাষ্ট্র ও শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে বিজিএমইএসহ মালিক সংগঠনের বৈঠকে শ্রমিকদের গতবারের মতো ৫০ শতাংশ ঈদ বোনাস ঈদ ছুটির আগেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া বাকি ৫০ শতাংশ আগামী ছয় মাসের মধ্যে সমন্বয় করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক, সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিকেএমইএ সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান, সাবেক নৌমন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খান, শ্রমিক নেতা আমিরুল হক, বাবুল আক্তার, তাসলিমা আখতার, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শ্রমিক নেতা ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বৈঠকেই শতভাগ বোনাস দাবি করেন। কিন্তু তাদের সেই দাবি মানা হয়নি। তার ওপর অনেক কারখানায় এপ্রিল ও মে মাসের বেতন দেওয়া হয়নি। ফলে কারখানাগুলোতে মূল মজুরির শতভাগ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন।

বিজিএমইএর সচিব মেজর মো. রফিকুল ইসলাম (অব.) জানান, শনিবারের  সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উৎসব ভাতা দেওয়ার জন্য বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত সব কারখানা মালিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের গতবারের মতোই ঈদ বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেসব মালিকের সামর্থ্য আছে, তারা ঈদের আগেই শতভাগ দেবেন। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারা ৫০ শতাংশ দেবেন। তবে কেউ ৫০ শতাংশের কম দিতে পারবেন না। কিন্তু অনেক মালিক বোনাস দূরে থাক, বেতনই ঠিকমতো দিচ্ছেন না। ফলে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সহিংস আচরণ করছেন।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোশরেফা মিশু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের মে মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস ঈদের আগেই দেওয়া উচিত ছিল মালিকদের। কিন্তু সেটি তো হয়নি। বরং অনেক কারখানায় মার্চ-এপ্রিলের বেতন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। অনেকে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে শ্রমিকদের রাস্তায় নামায় ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

শিল্পপুলিশের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল যেসব কারখানায় বিক্ষোভ ও শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে টঙ্গী বিসিকে বেলি সীমা গার্মেন্টস ও ব্রিজ অ্যাপারেলস, শ্রীপুরের কনফিডেন্স টেক্স ওয়্যার, আশুলিয়ার কাইস্যাবাড়ির প্রোডেন্ট ফ্যাশন, আশুলিয়ার নরসিংপুরে হা-মীম গ্রুপ, ডেকো ডিজাইন, গাজীপুরের গাছা বোর্ডবাজারের স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, আশুলিয়ার জামগড়ার ইয়াগী বাংলাদেশ, ফতুল্লায় তামি নিট ফ্যাশন, গাজীপুরে বাঘেরবাজারের গোল্ডেন রিপোর্ট লিমিটেড, সাভারের হান অ্যাপেয়ারেলস, কলমার তিতাস নিটওয়্যার, শিমুলতলার নাভানা নিট কম্পোজিট, আশুলিয়া সরকার মার্কেটের সাতারা গ্রুপ, কোনাবাড়ীর ডেল্টা গ্রুপ, টঙ্গীর পার্ল প্রিন্স, কালিয়াকৈরের এসএফ জিন্স, নরসিংহপুরের স্নো হোয়াইট, ডিকে নিট, ডেকো ডিজাইন, রূপগঞ্জের উত্তরা জুট অ্যান্ড ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ফতুল্লা বিসিকে তামিয়া নিট ফ্যাশন, রূপগঞ্জে গ্রাম টেক্স ডায়িং, চট্টগ্রাম ইপিজিডে ইউএফএম (বিডি), হবিরবাড়ী হরনবিল-১, আশুলিয়ার বি-বাংলা, গাজীপুরের বাসন কড্ডা এলাকায় মাস্টার চ্যাম, আশুলিয়ায় ফৌজিয়া অ্যান্ড ফাহিম, মরাইয়ের জয়পাড়া এলাকায় মম ফ্যাশনের শ্রমিকরা শতভাগ বোনাস ও বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

এছাড়া চট্টগ্রামের ফ্যাশন ওয়াচ লিমিটেড-১, ফ্যাশন ওয়াচ লিমিটেড ইউনিট-২ প্রিয়ম গার্মেন্টসের শ্রমিকরা মনসুরাবাদ-ডাবলমুরিং সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। মালিকপক্ষ সেখানে গেলে শ্রমিকরা তাদের ওপর চড়াও হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পপুলিশের এসএসপি কামরুল ইসলাম আহত হন। একপর্যায়ে বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করা হয়।

শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে বিজিএমইএর এক নেতা বলেন, ‘আমরা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে বেতন-বোনাস দিচ্ছি। তারপরও শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। আর আট দিনের ঈদ ছুটি এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করতে গেলে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়বে।’

শিল্পপুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদ ঘিরে পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের আন্দোলন একটু বেশি। আমরা দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত