গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন হত্যায় গ্রেপ্তার তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও এখনো শনাক্ত হয়নি মূল পরিকল্পনাকারীরা। তবে গাজীপুর নগরীর কোনাবাড়িতে এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ৯৯ কোটি টাকার বিল আদায় চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেলোয়ার খুন হয়েছেন বলে ধারণা করছে তদন্তকারী একটি সংস্থা। কোনাবাড়ির ওই এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ৩৩ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছিল। কিন্তু ঠিকাদাররা জাইকা, এডিবিসহ তিনটি দাতা সংস্থার নামে বিল করে ৯৯ কোটি টাকা আদায় করতে চেয়েছিলেন। আর এতে কোনাবাড়ি অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বাদ সাধলে বিরোধ তৈরি হয়। দেলোয়ার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের শীর্ষ ব্যক্তিদের অবহিত করার পরও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। এসব বিষয় আমলে নিয়ে সরকারের একটি সংস্থা ছায়া তদন্ত চালাচ্ছে। তবে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় যুক্ত প্রভাবশালীদের বাঁচাতে এরই মধ্যে উচ্চপর্যায়ে দেনদরবার শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেলোয়ার হত্যা মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে তিনজনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তারা। ওই তিনজন সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে সহকারী প্রকৌশলী সেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের শতকোটি টাকার বিল আটকে রাখার জন্যই পরিকল্পিতভাবে দেলোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে। প্রভাবশালী ঠিকাদারদের শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রকৌশলী দেলোয়ার। মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে খুঁজছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। মনিরের সঙ্গে কয়েকজন ঠিকাদারের ভালো সম্পর্ক আছে। মনির নিয়মিত নগরভবনে আসা-যাওয়া করতেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনজন গ্রেপ্তার হলেও কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেই রহস্য এখনো উদঘাটন হয়নি। মনিরের সঙ্গে অভিযুক্ত কয়েকজনের সুসস্পর্ক আছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দেলোয়ার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালীদের হাত থাকতে পারে। সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারদের ভালো সম্পর্ক আছে। কোনাবাড়িতে ৯৯ কোটি টাকার একটি বিল নিয়ে ঘাপলা আছে। এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে ওই টাকা খরচ হয়েছে বলে ঠিকাদাররা ফাইলে স্বাক্ষর নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেলোয়ার স্বাক্ষর করেননি। মূলত ওই রাস্তা মেরামত করতে ৩৩ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছিল। ৩টি দাতা সংস্থা কাজটির অর্থ দিয়েছিল। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি।’
তুরাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) এবং দেলোয়ার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তিন আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় অন্যদের সম্পৃক্ততার বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।’
এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেছিলেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন হয়নি।
গত ১১ মে দুপুরে আশুলিয়ার দিয়াবাড়ি বেড়িবাঁধের পাশের একটি জঙ্গল থেকে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী খাদিজা আক্তার বাদী হয়ে তুরাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২১ মে দেলোয়ার হত্যায় জড়িত অভিযোগে তার এক সহকর্মী সহকারী প্রকৌশলীসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।