যুগলবন্দি দুই অপশক্তি

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৩:২৭ এএম

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অবদান হচ্ছে মৌলবাদ, যা ফিরে ফিরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, পাশাপাশি স্বাধীনতা-বিরোধীদের কখনো কখনো। মৌলবাদের উত্থানে সমগ্র বিশে^র জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান নামক দুর্বৃত্তরা ফ্যাসিবাদী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়ে তারা জনগণের সব মৌলিক অধিকারই হরণ করে নিয়েছে, মেয়েদের বিশেষভাবে কোণঠাসা করে এবং টিকতে দিচ্ছে না প্রাচীন প্রস্তর মূর্তিগুলোকেও। দুই হাজার বছর আগের বৌদ্ধভাস্কর্যগুলো ধ্বংস করে নিজেদের বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। তালেবানদের ওই কাজের নিন্দা করেনি এমন দেশ নেই বললেই চলে। কিন্তু ওই দুর্বৃত্তরা দমেনি। ফ্যাসিবাদীরা দমে না। হিটলার যেমন করে বই পুড়িয়েছে, তালেবানরাও তেমনি করেই মূর্তি ভেঙেছে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদের মধ্যে মিলবার কোনো জায়গা নেই। মৌলবাদ পশ্চাৎপদ, পুঁজিবাদ হচ্ছে আধুনিক। চেহারাসুরৎ, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। কিন্তু দুয়ের মধ্যে আদর্শগত ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে এবং কেমন করে অস্বীকার করব এই সত্য যে, আদর্শিক ঐক্যই হচ্ছে মূল ব্যাপার, তার বাইরে যা রয়েছে তা অমৌলিক, অনেকাংশে পোশাকি। আদর্শিক ঐক্যটা এখানে যে, উভয় মতবাদী ব্যক্তির স্বার্থকে প্রধান করে তোলে সমষ্টির স্বার্থকে উপেক্ষা ও পদদলিত করে। মৌলবাদীরা মোক্ষ খোঁজে। সে মোক্ষ অবশ্যই ব্যক্তিগত। তাদের ধর্ম চর্চাটাকে মনে হয় অলৌকিক, আধ্যাত্মিক। কিন্তু আসলে সেটা পুঁজি সঞ্চয়। তাদের পুণ্য এক প্রকারের পুঁজি বটে, ব্যক্তিগত পুঁজি; এর ক্ষেত্রে ইহকাল-পরকাল উভয় ভূমি পর্যন্ত প্রসারিত। তারাও মুনাফাতন্ত্রী। নিজের পুঁজি বৃদ্ধির জন্য মৌলবাদীরা অন্যের ওপর অত্যাচার করে, মানুষ মারতে পর্যন্ত পিছপা হয় না, ভাস্কর্য ভাঙতে তাদের হাত কাঁপে না। অন্ধকারকে লালন করে, অন্ধবিশ্বাসকে উত্তেজিত করে তোলে, সমষ্টিগত অগ্রগতিকে ঠেলতে থাকে পেছন দিকে। সবাইকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেরা এগোতে চায়। নিজেরা নয়, চূড়ান্ত বিচারে প্রত্যেক মৌলবাদীই ব্যক্তিগত, নিজের জন্য কাজ করছে; নিজের মুক্তি ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না।

মৌলবাদীরা আবার ভোগবাদীও বটে, তাদের স্বর্গ ভোগের উপকরণ দিয়ে ঠাসা। পুঁজিবাদীদের স্বর্গের সঙ্গে তাদের স্বর্গের মৌলিক কোনো ব্যবধান নেই। পুঁজিবাদের আদর্শিক মুখচ্ছবি দুটি। একটি উদারনীতিক, অপরটি ফ্যাসিবাদী; উদারনীতি অত্যন্ত ভদ্র, ফ্যাসিবাদ ভয়ংকররূপে আক্রমণাত্মক। কিন্তু ভেতরে তাদের একই কারবার। উদারনীতি ভান করে নিরপেক্ষতার কিন্তু সংসারে নিরপেক্ষতা বলে তো কিছু নেই, বিশেষ করে সেই পরিস্থিতিতে, যেখানে লড়াই চলছে শুভের সঙ্গে অশুভের, ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে সমষ্টিগত মঙ্গলের। এই যুদ্ধে উদারনীতি যদি বলে সে নিরপেক্ষ তাহলে বুঝতে অসুবিধা কোথায় যে, আসলে সে ব্যক্তির পক্ষেই, সমষ্টির পক্ষে নয়। উদারনীতি অবাধ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে, যার অর্থ সে প্রবলের সমর্থক, দুর্বলের বিপক্ষে। ফ্যাসিবাদও তাই; সেও প্রবলকে বিকশিত করতে চায়, দুর্বলকে লাঞ্ছিত করে। দুয়ের মধ্যে তফাত ওই ভদ্রতারই। ফ্যাসিবাদ ভদ্রতার ধারে ধারে না, সে নগ্ন উন্মোচিত, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি তার সমর্থনটা উগ্র ও প্রত্যক্ষ, রাখঢাক করে না। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরাও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই রক্ষা করতে চায়, তারাও ব্যক্তিস্বার্থ দেখে, সমষ্টি স্বার্থের বিপরীতে। তারাও উগ্র, তারাও ভয়ংকর। মৌলাবাদী ও পুঁজিবাদীরা যে পরস্পরের আপনজন সেটা পরিষ্কার হয় সমাজতন্ত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা লক্ষ করলে। উভয়েই সমাজতন্ত্রবিরোধী।

তার কারণ সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে বড় করে তোলে না; ব্যক্তিকে সে রক্ষা করতে চায় সমষ্টিকে বিকশিত করে। একের বোঝা সে দশের ওপর চাপায় না; বোঝাটিকে দশের সম্পত্তিতে পরিণত করে, যাতে দশজনই চলতে পারে সমান বেগে, অগ্রগতি ঘটে সবার। পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রকে শত্রু মনে করে; পুঁজিবাদ চায় অল্পলোকের মঙ্গল, অন্য সবার শোষণ ঘটিয়ে। ধর্মীয় মৌলবাদ বলে সমাজতন্ত্রকে সে ঘৃণা করে, কারণ সমাজতন্ত্র হচ্ছে বস্তুবাদী। কিন্তু মৌলবাদীরাও ভেতরে ভেতরে বস্তুবাদীই, তারাও সুখ চায়, যে সুখ বস্তুর দখলদারির ওপর নির্ভর করে, যে জন্য তালেবানরা মাদ্রাসায় থাকে না, অস্ত্র হাতে নিয়ে সিংহাসন দখলে লিপ্ত হয়। আর বিশে^র সর্বত্রই দেখা যায়, দেখা গেছে অতীতেও যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে পবিত্র বলে মনে করে; ধনী ধনীই থাকবে, যেমন গরিব থাকবে গরিব, শুধু দেখতে হবে সবাই ধর্মের পথে আসে কি-না, নাকি বিচ্যুত হচ্ছে।

ওদিকে পুঁজিবাদ যে মৌলবাদকে পুষ্ট করে সে ব্যাপারটাও অস্পষ্ট নয়, যদিও তাকে অস্পষ্ট রাখার চেষ্টা চলে। পুঁজিবাদ দারিদ্র্য ও বৈষম্য এবং অজ্ঞতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করে থাকে। দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা মৌলবাদের প্রধান আশ্রয়। পুঁজিবাদী বৈষম্য দারিদ্র্য উৎপাদনের কারণ এবং ওই বৈষম্য গরিব মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সামাজিক বৈষম্যের প্রতিপালক; ওই রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিকাংশ মানুষকে বঞ্চিত ও বিচ্ছিন্ন করে রাখে। বিশেষ করে প্রান্তিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে দেখা যায় শ্রমজীবী মানুষের জন্য রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিপীড়নের অতিনিষ্ঠর যন্ত্র। পীড়িত মানুষ বিচার পায় না, আশ্রয় পায় না, প্রতিশ্রুতিও পায় না। সেই সঙ্গে তারা দেখে অল্প কিছু মানুষ যারা বলে তারা ইহজাগতিক, আচ্ছাদন নেই উদারনীতির, সেই মানুষগুলো পরম বিলাস ও অপচয়ের জীবনযাপন করছে; দেখে ক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের ক্রোধ ও ক্ষোভ প্রকাশের কোনো গণতান্ত্রিক পথ যেহেতু খোলা পায় না তাই চলে যায় ধর্মের দিকে। ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদীরা এই ব্যবস্থার চমৎকার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে; তারা সমর্থক পায়, অনুসারী পেয়ে যায়, তাদের হিংস্রতা আরও উগ্র হয়ে ওঠে। দেশে মৌলবাদ আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। একদিক দিয়ে এটা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত। কেননা বাংলাদেশের অভ্যুদয় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান ও পরাভূত করে। কিন্তু পরাভূত শক্তি আবার ফিরে এসেছে। তার পরাজয়টা কেবল যে সশস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেছিল তা নয়, ঘটেছিল আদর্শিকভাবেও। তাহলে কেন তার পুনরুত্থান? কেমন করে?

বোঝা যায় যে, মৌলবাদীরা তাদের আদর্শিক পরাজয়টিকে মেনে নেয়নি। দৈহিকভাবে হেরে গিয়ে এবং ধাওয়া খেয়ে পালিয়েছিল মাত্র, পরে পরিস্থিতি আগের মতো প্রতিকূল নেই দেখে ফিরে এসেছে। এই যে পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়া, এর প্রধান উপাদান কী? সেটা হলো পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ওই যে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে সমষ্টির তুলনায়- এই নীতিটি আগের রাষ্ট্রগুলোতে কার্যকর ছিল, মনে হয়েছিল বাংলাদেশে তা থাকবে না, কেননা বাংলাদেশ হবে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক, সেখানে রাষ্ট্র হবে সবার সাধারণ সম্পত্তি, যার দরুন রাষ্ট্র তার শোষণকারী ভূমিকা ছেড়ে রক্ষাকারীর ভূমিকা নেবে এবং সমাজে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সেটাই ছিল স্বপ্ন। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। যার ফলে অধিকাংশ মানুষের জীবনে দুঃস্বপ্ন নেমে এসেছে, এমন দুঃস্বপ্ন, যা ছিল কল্পনার বাইরে, কারণ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় তাদের আশা দিয়েছিল, ভাবার সাহস জুগিয়েছিল যে স্বপ্ন দূরে নয়, নিকটবর্তী বটে।

সমাজের প্রায় সবাই এখন পুঁজিবাদী। ব্যক্তিগত মুনাফা চায়। অন্যের ভালোমন্দ সম্পর্কে আগ্রহ কমছে, ক্রমাগত সংকীর্ণ, স্বার্থবুদ্ধিসর্বস্ব ও হতাশ হয়ে পড়ছে। হতাশা একটি ভয়ংকর ব্যাধি। ধর্মসহ নানাবিধ মাদকাসক্তি ওই ভূমিতে লালিত পালিত হয়। প্রতিশ্রুতি ছিল যে, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। রাষ্ট্র তা করেনি। বস্তুত রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে কেবল যে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে তা নয়, সেখানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে যুক্ত করেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের তৎপরতা তো রয়েছেই, জাতীয়তাবাদী বলে পরিচিত বড় রাজনৈতিক দলগুলোও প্রায় প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতেই ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে চলেছে।

এসব মিলিয়েই বাস্তবতা অনভিপ্রেত। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও দার্শনিক ইহজাগতিকতাকে উৎসাহিত করছে না, বরঞ্চ মানুষকে প্ররোচিত করছে উল্টো দিকে যেতে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারকেরা দু’ভাগে বিভক্ত, উদারনীতিক ও বামপন্থি। উদারনীতিতে বিশ্বাসী যারা তারা জনগণের ওপর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। কেননা তারা ভদ্রলোক এবং জনবিচ্ছিন্ন। তদুপরি তারা হচ্ছেন বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমর্থক, যে ব্যবস্থাকে শ্রমজীবী মানুষ মনেপ্রাণে ঘৃণা করে, যদিও প্রকাশ করার পথ পায় না। উদারনীতিকরা ব্যক্তির বিকাশকে সমর্থন করেন, সমষ্টির বিপরীতে। তারা রাষ্ট্রের অনুগ্রহপুষ্ট, নানাভাবে। তাদের দৃষ্টান্ত বা আদর্শ কোনোটাই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইহজাগতিকতার প্রকৃত সমর্থক হচ্ছেন বামপন্থিরা। কিন্তু কিছুটা নিজেদের দার্শনিক দুর্বলতা, কিছুটা পরদেশনির্ভরতা এবং অনেকটা রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার বৈরিতার কারণে তারা প্রবল হতে পারেননি। জনগণ বিক্ষুব্ধ, তাদের সেই বিক্ষোভ বাম দিকে যাবে এমন পথ এখনো তৈরি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ ডান দিকেই যাচ্ছে এবং ডানপন্থিদেরও ডানে যাদের অবস্থান সেই মৌলবাদীরা সুবিধা করে নিচ্ছে।

পুঁজিবাদ ও মৌলবাদ একে অপরের পরিপূরক। পুঁজিবাদ সমাজে চরম বৈষম্য ও অজ্ঞতা সৃষ্টি করে, যার ফলে হতাশাগ্রস্ত মানুষ মুক্তির খোঁজে ধর্মান্ধতা বা মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই দুই অপশক্তির যুগলবন্দি রুখতে শিক্ষার প্রসার এবং মানবিক সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। পুঁজিবাদ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মৌলবাদকে উসকে দেয় এবং মৌলবাদী শক্তিগুলো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে নির্বিঘেœ চলতে সাহায্য করে। পুঁজিবাদ মানুষকে কেবল মুনাফালোভী ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বঞ্চনাবোধ তৈরি হয়, তা কাজে লাগিয়ে মৌলবাদীরা তাদের ভিত্তি শক্ত করে। এই ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে মানুষের শুভবোধকে জাগিয়ে তোলা।

লেখক :  ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত