সংকট কাটাতে সময় চাইলেন অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীলতায় ফিরতে এবং চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের অন্তত আরও দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বাজেট সংলাপে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু কিছু বিষয়ে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। সেসব বিষয় চিহ্নিত করে তা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে নতুন অর্থবছরে (২০২৬-২৭) উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন তদারকি জনগণকে জানাতে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। যেখনে প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সবাই অবগত থাকবে। 

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ।

সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পের বড় বোঝাও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই জনস্বার্থের পরিবর্তে বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য নেওয়া হয়েছিল। যেসব প্রকল্প বাতিল করা সম্ভব, সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে। যেগুলো পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব, সেগুলো পুনরায় করা হচ্ছে। তবে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো শেষ করা ছাড়া সরকারের আর কোনো বিকল্প নেই। অথচ এসব প্রকল্পের অনেকগুলো থেকেই কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যাবে না।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকটসহ বড় বড় অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কয়েক মাসে সম্ভব নয়। অতীতে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় এখন নতুন করে অনুসন্ধান, আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে, যা সম্পন্ন করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগে। এ কারণেই দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতা এবং পরে সমৃদ্ধির পথে নিতে সরকারকে অন্তত দুই বছর সময় দিতে হবে। মন্ত্রী আশা করেন, তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির পথে এগোবে।

সভায় পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান সরকারের তিন মাস পর পর বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশের পরামর্শ দেন। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা নয়, আমরা একটা ড্যাশবোর্ড করছি। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে তদারক করা হবে। আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এটি চালু করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি, সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়মিত দেখা যাবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা উন্নয়নকাজের জন্য থোক বরাদ্দ দিয়েছি, পরিচালন ব্যয়ের জন্য রাখিনি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে আমরা নিয়মকানুন সহজ করার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো যেন সবাই ঠিকভাবে মেনে চলে, সে জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটা ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। দেশের কোনো নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি মনে করেন, এই নিয়মকানুন ভঙ্গের বা সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণে তারা কোনোভাবে বাধা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তারা এই ওয়েবসাইটে জানাতে পারবেন। এই পুরো বিষয় তদারকি করার দায়িত্ব থাকবে সেই টাস্কফোর্সের। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।

ব্যাংক ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত ১০ বছর ধরেই আমি বলে আসছি যে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া উচিত নয়। সরকার ১০ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে টাকা নিলে বেসরকারি খাতের জন্য টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। সরকার এই উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে কীভাবে তা পরিশোধ করবে, তখন সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা ধীরে ধীরে ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে বাজার-ভিত্তিক ও বিকল্প অর্থায়নের দিকে নজর দিচ্ছি।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও নির্ধারিত সময়সীমা কেন বারবার অতিক্রম হচ্ছে, সেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে কাজ করছে সরকার। এ বিষয়ে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই। শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য—এই চার মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ হয় কমেছে, নয়তো স্থবির রয়েছে। একই সঙ্গে পটুয়াখালী ইপিজেড ও জামদানি ভিলেজের মতো কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অবাস্তব এবং ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বলে মন্তব্য করেন। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ ও নিয়মিত হিসাব সংসদ ও জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন আর বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং টিকে থাকার উপায় হয়ে উঠেছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ব্যয় সংকোচনের জন্য খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে এবং সংসার চালাতে একাধিক কাজ বা চাকরিতে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে তাদের জীবনে মানসিক চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নতুন ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সামনে বর্তমানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো কর্মসংস্থানের সংকট, বিনিয়োগের সংকট এবং শিক্ষার গুণগত মানের সংকট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত