বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আলোকিত মুখ

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

একটি ছবি কখনো কখনো ইতিহাসের দলিল হয়ে ওঠে। একটি মুহূর্ত, একটি অনুভূতি কিংবা একটি সমাজের অদেখা বাস্তবতা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে সময়ের সীমানা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। সেই শক্তিশালী মাধ্যমকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার, ফটোসাংবাদিক ও লেখক ফরিদ আহাম্মদ রনি।

ফেনী জেলার জোয়ার কাছার গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা রনির শৈশব থেকেই মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের নানা রূপের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় ফটোগ্রাফির জগতে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক হিসেবে তিনি কাজ করছেন। ক্যামেরার সামনে নয়, বরং ক্যামেরার পেছনে থেকেই মানুষের গল্প তুলে ধরতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। ফরিদ আহাম্মদ রনির বিশ্বাস, একটি সঠিক ছবি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে, আবার একটি হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই প্রতিটি ফ্রেম ধারণের আগে তিনি গুরুত্ব দেন গভীর পর্যবেক্ষণ, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতাকে। তার ছবিতে যেমন নান্দনিকতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি, পরিবর্তন ও মানবিক সংকটের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য এসেছে বহুভাষিক চিত্রগ্রন্থ ‘প্যারিসের ছবি’ (ওসধমবং ড়ভ চধৎরং) প্রকাশের মাধ্যমে। বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এই গ্রন্থটি শুধু একটি ফটোবুক নয়; এটি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়। প্যারিসের স্থাপত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা এবং নগরজীবনের সৌন্দর্যকে নিজের ক্যামেরার ফ্রেমে ধারণ করে তিনি নির্মাণ করেছেন এক ব্যতিক্রমী ভিজ্যুয়াল দলিল। এই গ্রন্থ আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক গ্রাঁ পালে প্রাসাদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘চেঞ্জ নাউ’ সম্মেলনে ফরিদ আহাম্মদ রনি তার ‘প্যারিসের ছবি’ বইটি মোনাকোর যুবরাজ আলবার্ট দ্বিতীয়, ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কপ-২১ সম্মেলনের সভাপতি লরেন্ট ফ্যাবিয়াস এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মেলিসা ফ্লেমিংয়ের হাতে তুলে দেন। বিশ্বনেতারা বইটির শিল্পমান ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের প্রশংসা করেন। এর আগেও তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং প্যারিসের মেয়র আন্নে ইদালগোর হাতে সরাসরি এই গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের দপ্তর থেকে প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র রনির সৃজনশীল কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ‘প্যারিসের ছবি’ গ্রন্থের নেপথ্যেও রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নিষ্ঠার গল্প। বিভিন্ন গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ফ্রান্স ও বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় তিনি এই প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দেন। ইতিমধ্যে দেশের ও দেশের বাইরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং আলোকচিত্রী বইটির প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি শহরের চিত্রায়ণ নয়, বরং দুই দেশের সংস্কৃতির মধ্যে এক সৃজনশীল সেতুবন্ধন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপজুড়ে শতাধিক আন্তর্জাতিক ইভেন্ট কভার করেছেন তিনি। কান চলচ্চিত্র উৎসব, জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন, চেঞ্জ নাউ সামিট, প্যারিস পিস ফোরাম, ইউনেস্কো ইয়ুথ ফোরাম, ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ইভেন্ট এবং ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে তার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। প্যারিস ফ্যাশন উইক, প্যারিস কার্নিভাল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী কভার করে ইউরোপীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় চিত্রও তুলে ধরেছেন। তার ক্যামেরা যেমন বিশ্বকে দেখেছে, তেমনি বিশ্বও তার ক্যামেরার মাধ্যমে নতুন করে দেখেছে বাংলাদেশকে। তার প্রতিটি ছবি, প্রতিটি প্রতিবেদন এবং প্রতিটি সৃজনশীল উদ্যোগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত