মার্ক মাত্র চার মিনিটের ছোট ছিলেন স্টিভ ওয়াহর চেয়ে। যমজ ভাই। ১৯৬৫ সালের ২ জুন সিডনিতে জন্ম। এখন দুজনে থাকেন সিডনির দুই প্রান্তে। অনুষ্ঠান কিংবা বড়দিন ছাড়া প্রায় দেখাই হয় না। তবে স্টিভের দাঁত ব্যথা হলে আজও নাকি মার্কের দাঁত ব্যথা হয়। একজনের জ্বর হলে অন্যজনও কয়েক দিন বাদে জ্বরে পড়েন। এই অদ্ভুত মিল ছাড়া ক্রিকেটার স্টিভ আর মার্কের মধ্যে কোনো মিল নেই।
স্টিভ ওয়াহ কালজয়ী দলনেতা। মার্ক ওয়াহ শিল্পী। ব্যাটিং এতটাই মনোহর ছিল যে, কেউ কেউ তার মধ্যে ভিক্টর ট্রাম্পারের ছায়া খুঁজতেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক সেঞ্চুরির পর অজি মিডিয়া তো ডন ব্রাডম্যানের প্রসঙ্গ টেনেছিল। স্টিভের পরিবর্তে দলে ঢুকেই ১৩৮ রানের সেই ‘পরাবাস্তব’ ইনিংস খেলেছিলেন মার্ক। তার রাজকীয় আবির্ভাবের পাঁচ বছর আগে টেস্ট অভিষেক হয় স্টিভের। ১৯৯০-৯১ অ্যাশেজ সিরিজে সিনিয়র ওয়াহ ফর্মে ছিলেন না। সিডনির হোম গ্রাউন্ডে তৃতীয় টেস্টে ১৪ রানে আউট হওয়ার পরেই স্টিভের বাদ পড়া নিশ্চিত হয়ে যায়। টানা দশ ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করতে না পারায় জানতেন বাদ পড়বেন। কিন্তু পরিবর্তে কে দলে ঢুকবে তা জানা ছিল না স্টিভের। যখন শোনেন তার পরিবর্তে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন যমজ মার্ক, তখন মিশ্র অনুভূতি হয়েছিল। মা বেভারলিকে বলেছিলেন, ‘আমি বাদ পড়েছি। কিন্তু প্রথমবারের মতো টেস্ট দলে জায়গা পেয়েছে মার্ক।’ বড় ছেলেকে কী বলে সান্ত¡না দেবেন বুঝতে না পেরে চুপ ছিলেন বেভারলি।
স্টিভরা ছিলেন চার ভাই। ক্রীড়াবান্ধব পরিবারে জন্ম। বাবা রজার ওয়াহ ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। মা ছিলেন শিক্ষিকা। দুজনে ভালো টেনিসও খেলতেন। তাদের চার ছেলে। যদিও স্টিভ এবং মার্কের মতো ডেন ও ড্যানিয়েল বিখ্যাত নন। তবে তারাও ক্রিকেট খেলতেন। বেশিদূর এগোতে পারেননি।
প্রায় এক যুগ স্টিভ ও মার্ক ছিলেন অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসঙ্গে ১০৮ টেস্ট খেলেছেন। আর সেই দলটাও যেমন-তেমন দল ছিল না। ক্লাইভ লয়েডের সর্বজয়ী দলের সঙ্গে স্টিভের দলের তুলনা হয়। পরিসংখ্যান দেখিয়ে কেউ আবার স্টিভের দলকেই এগিয়ে রাখেন। ৫৭ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৪১টায় জিতেছেন স্টিভ। আর ক্লাইভ লয়েড ৭৪ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে জিতেছেন ৩৬টিতে। অঙ্কের হিসাবে স্টিভ এগিয়ে। অতীত তো বটেই ভবিষ্যতেও কোনো টেস্ট অধিনায়ক তার রেকর্ডের ধারে-কাছে যেতে পারবেন কি না সন্দেহ। অবশ্য ইয়ান চ্যাপেলের মতো নিন্দুকেরা বলেন, স্টিভ খুব ভাগ্যবান অধিনায়ক। যিনি দারুণ টিম পেয়েছিলেন বলে অনবদ্য রেকর্ড গড়তে পেরেছেন। ম্যাকগ্রা আর ওয়ার্নের মতো দুজন ম্যাচ উইনিং বোলার থাকলে যেকোনো ক্যাপ্টেনই জিততেন।
কঠোর বিশ্লেষণের জন্য বিখ্যাত ইয়ান চ্যাপেলের চোখে স্টিভ স্বার্থপর ক্রিকেটার। ‘যিনি সব সময় নিজের স্ট্যাটাস, নিজের রান নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। চাপ নেবেন না বলে কোনো দিন ছয় নম্বরের ওপরে ব্যাট করতে যাননি। অমন সোনার টিম চাপ সামলে দেওয়ার পর ভদ্রলোক ব্যাট করতে যেতেন।‘ সত্যি কি তাই? প-িতরা বলেন, টেস্টে ছয় নম্বরে খেলা মানে দ্বিতীয় নতুন বলের মুখোমুখি হওয়া নিশ্চিত। তাছাড়া ওয়ানডের মতো টেস্টেও অনেকবার দলকে টেনে তুলেছে স্টিভের ব্যাট। তিনি ১৬৮ টেস্টে ১০৯২৭ রান করেছেন। গড় ৫১.০৬ । ছয় নম্বরের অন্যতম সেরা ভিভিএস লক্ষ্মণের গড় ৪৫.৯৭। খেলেছেন ১৩৪ টেস্ট। মন্তব্য করার সময় চ্যাপেল বোধহয় টেলএন্ডারদের নিয়ে ব্যাটিং করার চ্যালেঞ্জের ব্যাপারটা মাথায় নেননি।
ব্যাগি গ্রিনের সম্মানকে সবার ওপরে রাখতেন স্টিভ। এক সাক্ষাৎকারে নিজের অধিনায়কত্বের দর্শন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার জন্য জীবন দিয়ে লড়াই করো। মাঠে যাও নিজের সব কিছু নিয়ে। ছায়াতে কিচ্ছু রেখে যেও না। নিজেদের খেলাটাকে অন্য লেভেলে নিয়ে যাও। আর বিপক্ষকে ভয় পাওয়াও। এরা যেন কখনো মনে না করে যে উইকেটে কেউ পার্টি দিয়েছে।’ এই কঠিন মন্ত্রেই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বারবার। জীবনের শেষ ইনিংসে ৮০ রান করেছিলেন। আউট হয়েছিলেন শচিন টেন্ডুলকারের হাতে ক্যাচ দিয়ে। স্টিভ পরে বলেছেন ‘নিজেকে আজও বলি, এর চেয়ে ভালো শেষ আর কী হতে পারত!’
মার্ক ওয়াহ ১২৮ টেস্ট খেলে ৪১.৮২ গড়ে রান করেছেন ৮০২৯। দুজনই নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রোডাক্ট। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের কত বিখ্যাত নাম এই রাজ্য থেকে উঠে এসেছে ভিক্টর ট্রাম্পার, ফ্রেডরিক স্পোফোর্থ, জ্যাক গ্রেগরি, অ্যালান ডেভিডসন, রে লিন্ডওয়াল, কিথ মিলার, আর্থার মরিস, ববি সিম্পসন, নরম্যান ও’নিল, ডগ ওয়াল্টার্স। এই সরণিতে আর দুটি নাম যোগ করলে উজ্জ্বলতা বারবে বৈ কমবে না। নাম দুটি অবশ্যই স্টিভ ও মার্ক ওয়াহ।
