পাবনার আমিনপুর থানার ওসি এস এম মাইনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতা চার ইউপি চেয়ারম্যানের তিন মাসের ফোনালাপের কললিস্ট ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। আর এর নেপথ্যে পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগী ওই চার আওয়ামী লীগ নেতা। এমন অভিযোগ তুলে তারা গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ও পাবনার জেলা প্রশাসকের কাছে ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। অভিযোগ তদন্তে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও করেছে জেলা পুলিশ।
চার আওয়ামী লীগ নেতার করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, পাবনার বেড়া উপজেলার জাতসাখিনী ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল হক বাবু, মাসুমদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মিরোজ হোসেন, নতুন ভারেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান এম এ রফিকুল্লাহ এবং রূপপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম উজ্জলের তিন মাসের কললিস্ট কোনো ফৌজদারি মামলা কিংবা আদালতের আদেশ ছাড়াই গত ২৯ মে মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন আমিনপুর থানার ওসি মাইনুদ্দিন। পরে তা পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির এবং বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি ও পৌর মেয়র আবদুল বাতেনের কাছে তুলে দেন। এরপর ফেইসবুকের মাধ্যমে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন।
চেয়ারম্যানরা লিখিত অভিযোগে আরও বলেন, তারা চারজনই নিজ নিজ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি অথবা সম্পাদক। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক যোগাযোগের স্পর্শকাতর গোপন তথ্য এভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিষয়টি নিয়ে নোংরা মিথ্যাচার করছেন। সামাজিকভাবেও তাদের হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। আদালতের আদেশ কিংবা কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়া ওসি মাইনুদ্দিন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন উল্লেখ করে তাকে প্রত্যাহার ও বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাসুমদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মিরোজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৩ এপ্রিল পাশর্^বর্তী ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান কোরবান আলী সর্দার আমার ইউনিয়নের বাঁধের হাট এলাকায় ব্যক্তিগত কার্যালয়ের গুদাম থেকে ২২৯ বস্তা ত্রাণের চালসহ র্যাবের হাতে আটক হন। এ কারণে তাকে ১৪ এপ্রিল দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকেও সাময়িক বহিষ্কার করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। অভিযুক্ত কোরবান আলীর পক্ষে সুপারিশ করায় একই দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আবদুল বাতেনকেও দলের সকল পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করে জেলা আওয়ামী লীগ। এরপরও পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির ও বেড়া পৌর মেয়র আবদুল বাতেন এসব ঘটনায় আমাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে মিথ্যা প্রচারণা চালাতে থাকেন। সর্বশেষ এমপি মহোদয় ও বেড়া পৌর মেয়র প্রভাব খাটিয়ে ওসিকে দিয়ে কললিস্ট তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।’
রূপপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম উজ্জল অভিযোগ করে বলেন, ‘বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি আবদুল বাতেন ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান কোরবান আলী সরদারের ত্রাণ চুরি ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয় দেন। নিজ এলাকার বাইরে আমাদের ইউনিয়নগুলোতেও তারা মাদক ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন। এসব বিষয়ে এমপি মহোদয় ও আবদুল বাতেন সাহেবকে বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার হয়নি। উল্টো আমাদেরই হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
জাতসাখিনী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল হক বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণ চুরির ঘটনায় এমপি মহোদয় ও পৌর মেয়র আবদুল বাতেনের নির্দেশে প্রথম থেকেই আমিনপুর থানার ওসি র্যাবের অভিযানের পেছনে আমরা দায়ী প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিষয়টি প্রমাণ করতেই শুনেছি ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ওসি কল রেকর্ড তালিকা তাদের হাতে তুলে দেন। এই কললিস্ট নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে তারা এখন উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আমিনপুর থানার ওসি এস এম মাইনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। চাইলেই কারও কল রেকর্ড লিস্ট সংগ্রহ করা যায় না।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেড়া পৌর মেয়র আবদুল বাতেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কললিস্ট সংগ্রহের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্তা অস্বীকার করেছেন পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢালারচর ইউনিয়নে কোনো ত্রাণ চুরি হয়নি, প্রশাসনকে ভুল বোঝানো হয়েছে। চেয়ারম্যানরা মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। ফোন কললিস্ট দিয়ে আমি কী করব?’
ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠিত করে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সত্যতা পাওয়া গেলে ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
