লুটের টাকায় মানত পূরণ

ন্যাশনাল ব্যাংকের খোয়া যাওয়া টাকার ৬০ লাখ উদ্ধার

আপডেট : ০৩ জুন ২০২০, ০৫:৫৮ এএম

দাগি অপরাধী আব্দুল হান্নান ওরফে ব্রিফকেস হান্নান। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই তার দীর্ঘদিনের পেশা। মানত ছিল বড় দান মারতে পারলে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদে (বড় মসজিদ) এক লাখ টাকা দান করবে। আর সে সুযোগ এসেও যায়। রাজধানীর পুরান ঢাকার বিভিন্ন শাখা থেকে উত্তোলন করা ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮০ লাখ টাকার একটি বস্তা গাড়ি থেকে টেনে নেয় হান্নান। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে পাগলা মসজিদে গিয়ে দিয়ে আসে এক লাখ টাকা। গত সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই জানিয়েছে আব্দুল হান্নান। পুলিশ হান্নান, তার স্ত্রী ও দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম গতকাল মঙ্গলবার তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হান্নান ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ১০ মে রাজধানীর পুরান ঢাকায় বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা তুলে প্রধান কার্যালয়ে নেওয়ার পথে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮০ লাখ টাকার একটি বস্তা গাড়ি থেকে খোয়া যায়। দিনেদুপুরে ঘটে যাওয়া ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। তদন্তে নেমে পুলিশ গত সোমবার রাতে ন্যাশনাল ব্যাংকের খোয়া যাওয়া ওই ৮০ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে। চারটি বস্তার মধ্যে টাকাগুলো রাখা ছিল। অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে। তারা হলো দলনেতা হান্নান ওরফে ব্রিফকেস হান্নান ওরফে রবিন ওরফে রফিকুল ইসলাম এবং তার সহযোগী মোস্তফা, মো. বাবুল মিয়া ও হান্নানের স্ত্রী মোছাম্মৎ পারভীন। অভিযানে গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। তাদের গতকাল মঙ্গলবার ডিবি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।

যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম আরও জানান, ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনায় করা মামলাটি কোতোয়ালি থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকটি টিম ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের এক পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সোমবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিম। লুট হওয়া বাকি ২০ লাখ টাকার বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘আসামিরা ওই টাকা নানাভাবে খরচ করেছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। আর চক্রের মূলহোতা হান্নানের বিরুদ্ধে ত্রিশটির বেশি মামলা আছে।’

হান্নানকে গ্রেপ্তার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার  সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, হান্নান ও তার সহযোগীরা মূলত টানা দলের (লাগেজ চুরি) সদস্য। গত ১০ মে দুপুরে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা নিয়ে যখন ব্যাংকের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা ও একজন সিকিউরিটি গার্ড ইসলামপুর শাখায় টাকা আনতে ওপরে ওঠেন, তখন একজন সিকিউরিটি গার্ড ও মাইক্রোবাসের ড্রাইভার গাড়িতে ছিল। এ সুযোগে হান্নানসহ তার অপর সহযোগীরা সেখানে এসে সিকিউরিটি গার্ড ও মাইক্রোবাসের ড্রাইভারের সঙ্গে ভাব জমিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলতে থাকে। টাকা আনতে দেরি হচ্ছে দেখে তারা গাড়ির চালককে দেখার জন্য ওপরে পাঠায়। ড্রাইভার ওপরে উঠলে হান্নানের সহযোগীরা সিকিউরিটি গার্ডকে বিভিন্ন কথাবার্তায় অন্যমনস্ক রাখে। আর হান্নান গাড়ির দরজা খুলে টাকার বস্তা নিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে রিকশায় করে আরমানীটোলার একটি বাসায় চলে যায়। পরে সে তার সহযোগীদের ২৫ হাজার করে টাকা দিয়ে বাকি টাকা সে নিজের কাছে রেখে দেয়। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে হান্নান জানায়, চুরি করা টাকার মধ্যে ২০ লাখ টাকা সে বিভিন্নভাবে খরচ করে। এরমধ্যে এক  লাখ টাকা কিশোরগঞ্জ পাগলা মসজিদে দানের মানত ছিল, সেটা দিয়েছে। কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করেছে এবং স্ত্রী পারভীনের গহনা বন্ধক ছিল সেগুলো ছাড়িয়েছে।

অতিরিক্ত উপকমিশনার আজাদ আরও বলেন, টাকা খোয়া যাওয়ার পরের দিন থানা পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য টাকাবাহী গাড়ির দায়িত্বে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা, গাড়িচালক ও দুজন নিরাপত্তাকর্মীকে আটক করে এক দিনের রিমান্ডে এনেছিল। তারা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। তবে টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সোমবারের অভিযানে গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে গেন্ডারিয়া ও যাত্রাবাড়ী থানায় আলাদা দুটি মামলা করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত