দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ভাইরাসটিতে মৃত্যুর সংখ্যাও। কেবল গত দুই সপ্তাহে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশে করোনাকালের যেকোনো সপ্তাহের মৃত্যু থেকে অনেক বেশি। গতকাল বুধবার দেশে করোনা শনাক্তের ৮৮তম দিনে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিন ৩৭ জনের মৃত্যু হলো। এটি এখন পর্যন্ত এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে গত রবিবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর প্রথম মৃত্যু হয় গত ১৮ মার্চ। গতকাল করোনা শনাক্তের ৮৮তম দিনে এসে দেশে সরকারি হিসাবে সর্বমোট মৃত্যু দাঁড়াল ৭৪৬ জনে। এর মধ্যে প্রথম মাসে মারা গেছেন মাত্র ১২ জন, দ্বিতীয় মাসে ১৭৪ জন এবং তৃতীয় মাসের গতকাল পর্যন্ত ২৮ দিনে মারা গেছেন ৫৬০ জন। এর মধ্যে আবার গত ৭ দিনেই মারা গেছেন ২০২ জন। তার আগের ৭ দিনে ১৫৮ জন এবং তারও আগের ৭ দিনে মারা গেছেন ১১৭ জন। শেষ দুই সপ্তাহে মারা গেছেন ৩৬০ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। যদিও এর বাইরে আরও অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন, যাদের পরীক্ষা না হওয়ায় করোনা শনাক্ত করা যায়নি। শেষদিকে মৃত্যু বাড়ার সঙ্গে রোগী শনাক্তও অনেক বেড়েছে। যত বেশি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, তত বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। গতকাল সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে এযাবৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই দিনে দেশে নমুনা পরীক্ষাও হয়েছে এযাবৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
গতকাল বুলেটিনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) ৫০টি ল্যাবে নমুনা সংগৃহীত হয়েছে ১৫ হাজার ১০৩টি। পরীক্ষা হয়েছে ১২ হাজার ৫১০টি। এসব পরীক্ষায় নতুন করে ২ হাজার ৬৯৫ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এদিন শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন আরও ৩৭ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন আরও ৪৭০ জন।
তিনি জানান, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৫২টি ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়ে এলেও গতকাল থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাদের ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া জামালপুরের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ল্যাবের মেশিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় আপাতত পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। তাই গতকাল ৫০টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এসব ল্যাবে গতকাল পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৮৩টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় সর্বমোট ৫৫ হাজার ১৪০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন মোট ৭৪৬ জন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ হাজার ৫৯০ জন। এ পর্যন্ত শনাক্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও সুস্থতার হার ২১ দশমিক ০২ শতাংশ।
সর্বশেষ মৃত ৩৭ জনের বিষয়ে বলা হয়, তাদের মধ্যে পুরুষ ২৮ ও মহিলা ৯ জন। তাদের ১৯ জন ঢাকা বিভাগের, ১৩ জন চট্টগ্রাম, ২ জন রংপুর, ১ জন সিলেট ও ১ জন খুলনা বিভাগের। হাসপাতালে মারা গেছেন ৩১ জন, বাসায় ৫ জন এবং মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে ১ জন। তাদের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে ১ জন, ৩১-৪০-এর মধ্যে ৩ জন, ৪১-৫০-এর মধ্যে ৫ জন, ৫১-৬০-এর মধ্যে ১২ জন, ৬১-৭০-এর মধ্যে ১২ জন এবং ৭১-৮০ বছরের মধ্যে ৪ জন।
বুলেটিনে আরও জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ৩৯৫ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ৬ হাজার ৪৯৮ জন। আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তর করা বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানানো হয় বুলেটিনে। এ ছাড়া সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে আরও ২ হাজার ৪২৮ জন। বর্তমানে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইনে আছেন মোট ৫৭ হাজার ৮২৮ জন। স্বাস্থ্য বাতায়ন-১৬২৬৩, ৩৩৩ ও আইইডিসিআরের হটলাইনে ২৪ ঘণ্টায় কভিড ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক কল এসেছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬টি। স্থল, সমুদ্র ও বিমানপথে ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রবেশ করেছে ১ হাজার, তাদের প্রত্যেককে স্ক্রিনিং করা হয়।
মৃত ব্যক্তি থেকে করোনা সংক্রমণের প্রমাণ নেই : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, মৃত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিন ঘণ্টা পর মৃতদেহে ভাইরাসটির আর কার্যকারিতা থাকে না। তাই মৃতদেহ থেকে ভাইরাসটি ছড়ানোর আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া করোনায় মৃত ব্যক্তিকে দাফনের জন্য ডেডিকেটেড কবরস্থানের প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, করোনায় মৃত ব্যক্তিকে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করে দাফন এবং সৎকার করা যায়। নিয়ম অনুযায়ী, মৃতদেহের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বডিব্যাগ অথবা পলিথিনে মুড়িয়ে পারিবারিক কবরস্থানেই দাফন করা যায়।
