করোনাকালে পরোপকারিতা

আপডেট : ০৫ জুন ২০২০, ০৭:২০ এএম

করোনা বিপর্যয়ের সূচনাকাল থেকে জোর দিয়ে প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে, ‘আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই কাম্য।’ বাস্তবে মানুষ এ ব্যাপারে যতটা সচেতন, এর চেয়ে ঢের বেশি আতঙ্কিত। তার চেয়েও বড় কথা, নানা ধরনের অপবাদ ও কলঙ্কের শিকার হচ্ছেন অনেকে। এই আতঙ্ক ও অপবাদের কার্যকর মোকাবিলা না করে শুধু চিকিৎসা ও আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে করোনা মহামারীর তা-বজনিত বহুমুখী ক্ষতি নিরসন কঠিন হতে পারে।

দিন যত যাচ্ছে, করোনা ততই ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় মানুষ পরস্পরকে এ জন্য দায়ী করে অপবাদ দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং এ রোগে কেউ মারা গেলে তার গোসল, দাফন-কাফন, জানাজা ও কবর দিতে বাধা দেওয়া হয়। মৃত্যুর সময় কেউ কাছে আসে না, বাড়ির আঙিনায় সারা দিন লাশ পড়ে থাকলেও কেউ ধরে না। করোনা নিয়ে এমন অহেতুক আতঙ্ক, ভয়, অপবাদ ও দোষারোপের ভয়ানক অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এ মুহূর্তেই এমন আতঙ্ক ও অপবাদকে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। এ জন্য এলাকাভিত্তিক প্রশাসনের সহায়তায় টিম গঠন করতে হবে। এতে থাকবেন রাজনীতিক, সমাজসেবী, ধর্মীয় নেতা আর প্রশাসনের কর্মকর্তা। তদুপরি, গণমাধ্যমে যথার্থ তথ্য দিয়ে করোনা বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, যেকোনো ক্রান্তিকালে ব্যক্তি কি পরিবারের মানসিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা যেমন প্রকাশিত হয়- বিপরীত দিকে বিভাজন, অমানবিকতা, অসহযোগিতাও প্রকাশ পায়। ভয়ংকর করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এক বৈশ্বিক যুদ্ধের আকারে। করোনা আমাদের জাতীয় জীবনের বিপদ, এটা একার কিংবা শুধু সরকারের লড়াই নয়। নির্দিষ্ট কোনো ধর্মাবলম্বীর নয়। এটা ধর্ম-বর্ণ, জাতি ও লিঙ্গকেন্দ্রিক কোনো রোগ নয়। পুরো মানবসমাজকে দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তায় ফেলেছে করোনা। বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের সমস্যা প্রকটতর করে তুলেছে। এই মহাদুর্যোগ সরকারের একার পক্ষে সামাল দেওয়া মোটেই সম্ভব নয়। এ জন্য পূর্ণমাত্রায় দরকার সামাজিক পরোপকারিতার মনোভাব, সংহতি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত ও ছোট ছোট দলগত উদ্যোগে বিপন্ন মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহযোগিতা ও লাশ দাফনসহ নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক তৎপরতা চলছে। অনেকে একেবারে নিভৃতেও সহযোগিতা করছেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে লাখ লাখ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করোনাদুর্যোগে কোনো না কোনো প্রতিকারমূলক কিংবা সহযোগিতার কাজে নেমেছে। বিপন্ন মানুষের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় বলে মনে করি। কারণ, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে একটি সমাজের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, মানবতাবোধ ও পরার্থপরতার প্রকাশ ঘটে। এটাই মানবতাবোধ, এ জন্যই বলা হয়; মানুষ মানুষের জন্য।

ইসলামের শিক্ষা একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, সমবেদনা ও সহমর্মিতা। দান-খয়রাত, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়কে ইসলাম আলাদা গুরুত্ব দেয়। তাই করোনা সংকটে প্রয়োজন অনুযায়ী উদার ও মানবিক বার্তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ইসলাম শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়, এর মূল বাণীই হচ্ছে মানবতার উৎকর্ষ। আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য আর মানুষসহ সব সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা। করোনার দহনকালে তাই পরোপকারের মনোভাব নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে লাখ লাখ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করোনাদুর্যোগে কোনো না কোনো প্রতিকারমূলক কাজে নেমেছে, বিপন্ন মানুষের সহযোগিতা করছে। এ উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় বলে মনে করি।

মানবতার ধর্ম ইসলাম বারবারই শত্রু-বন্ধু নির্বিশেষে সবার উপকারের শিক্ষা দেয়। উপকার নানাভাবে করা যেতে পারে। কারোনাকালে বিপদগ্রস্ত যেকোনো মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারে সহযোগিতা করতে পারি, করোনায় অসুস্থকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারি। এ ছাড়া নানাভাবে পরোপকার করা যায়, যদি তা ছোট ক্ষেত্র হয়। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ-খবর নেওয়া প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। অসুস্থ মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়ালে সাহায্যকারীর প্রতি আল্লাহ অনেক খুশি হন।

ইসলাম ধর্মে সব মানুষ তথা গোটা মানব সমাজের উপকার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলাম মনে করে, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশ্বাসের পর সবচেয়ে বিজ্ঞচিত কাজ হচ্ছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের উপকার করা এবং অন্যের কল্যাণ কামনা করা। উপকারভোগী যে ধর্মেরই হোক।’ ইসলামের দৃষ্টিতে ধার্মিকতা হচ্ছে বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তবে এই ধার্মিকতা আরও বেশি সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে যখন একজন ধার্মিক মানুষ পরোপকার করে এবং অন্যের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে। অনেকে নিজেকে পরোপকার থেকে দূরে রাখতে নানা অজুহাত দেখান। তারা বলেন, তাদের তো ধন-সম্পদ নেই। কিন্তু অনেক ধন-সম্পদের মালিক হলেই কেবল পরোপকার করা যাবে এ ধারণা একেবারেই অমূলক। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাটাই মূল বিষয়। প্রত্যেক মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরোপকারী হতে পারেন।

পরোপকার নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। পরোপকার অনেক ধরনের। পরোপকার করা যেতে পারে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়েও। শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক কর্মকান্ডে অন্যকে সহযোগিতা করা যেতে পারে। সমাজে নানা রকমের মানুষের বসবাস। আমাদের চারপাশে রয়েছে নানা পর্যায়ের মানুষ, তাদের জীবনে রয়েছে নানা সমস্যা। তাদের সেই সমস্যা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও পরোপকার।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত