এ আখ্যানের একদিক যদি চব্বিশ পরগনার উত্তর দিক হয়, অন্যদিক তা হলে চরম দক্ষিণ। দুদিকই অখণ্ড বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। তবে সেসব পুরনো দিনের গল্প কার আর ভালো লাগে। সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। আছে শুধু বিবর্ণ অতীত। একরাশ ধূসর স্মৃতি। আর এই সময়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকার অসহ্য যন্ত্রণা। এখন আর দুই পাড়ে কেউই আমরা ভালো নেই। তা কাউকেই বলে দিতে হবে না। ফেইসবুকে, ফোনে, মেইলে শুধুই আকুতি নিয়ে বলে ওঠা, ‘ভালো আছি। ভালো থেকো।’ কে আছি কে নেই, কেউই জানি না। দুই বাংলার এই ভালোবাসা কখনো কোনো কাঁটাতার কেড়ে নিতে পারে না। করোনা মহামারীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে আম্পান ঝড় সুন্দরবন ও তার কাছের দুই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার হতদরিদ্র মানুষদের একেবারে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে। গ্রামের পর গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ নেই। খাবার জলের সমস্যা। পুকুরের মাছ মরে ভেসে উঠছে। অধিকাংশ মাটির বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। নদীর বাঁধের ওপরে লোকে কোনোরকমে ফের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে। বহু বছর ধরে সুন্দরবনকে চিনি। কত কত জোয়ার-ভাটা প্রত্যক্ষ করেছি, শীত গরম বর্ষায় ঘুরে বেড়িয়েছি সাবা, রাঙ্গাবেলিয়া, বাসন্তী, রামগঙ্গা, পাথরপ্রতিমা, সাতজেলিয়া, ছোটমোল্লাখালি আরও কত কত অঞ্চল। মৌসুনি ঘোড়ামারার ভাঙন দেখেছি কাছ থেকে। বর্ষার রায়মঙ্গলে নদীতে রাত কাটালে অতি বড় সাহসীরও বুকের রক্ত ঠা-া হয়ে যায়। কোনো এক লক্ষ্মীপুজোর মাঝরাত্তিরে গোমর নদীর বাঁধ ভেঙে জল ঢুকছে বলে আতঙ্কিত গ্রামের মানুষের হাঁকডাকে বাঁধ বাঁচাতে ছুটে যাওয়ার কথা বিপন্ন মানুষের মুখ দেখতে দেখতে ফের মনে পড়ছে ।
কিন্তু আমি এবার সুন্দরবনের পরিস্থিতি নিয়ে কিছু লিখব না। বড় গাছ ভেঙে পড়লে আশপাশের ছোট ছোট অনেক গাছেরও ক্ষতি হয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই লোকের চোখ পড়ে বড়র দিকেই। তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয় সবাই। কেউ ফিরেও তাকায় না ঝড়ের দাপটে মাটিতে নোওয়ানো ছোট ছোট গাছের দিকে। সুন্দরবনের বিপর্যস্ত বিশাল এলাকা তাই বড় গাছ। সবাই সেখানে ছুটে ছুটে যাচ্ছে রিলিফ নিয়ে। টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে, কাগজের পাতায় পাতায় সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু সুন্দরবন নিয়ে কথকতা। তা কিছুটা নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। পৃথিবীর অন্যতম সেরা বদ্বীপ, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জনপদের বিপদগ্রস্ত হওয়া যে কোনো সংবেদী মানুষের প্রাণ কাঁদবেই।
কিন্তু চারপাশের আরও অনেক অঞ্চল প্রচারের বিন্দুমাত্র আলো না পেয়ে একেবারে নির্বান্ধব হয়ে পড়ে আছে। তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। কেউ শব্দটা বলা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। অনেক সাধারণ তরুণ করোনার ভয় পাশে সরিয়ে নিজের নিজের সামান্য ক্ষমতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিপন্ন মানুষের বিপদে। একটা কথা বলা দরকার যে, এবার এই করোনা ও আম্পান বিপর্যয়ে যেভাবে অনেক সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা সরকারি ত্রাণের তোয়াক্কা না করে সরাসরি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা কিন্তু তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে যথেষ্ট ভরসা জোগায়। এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল, আমলা সবাই ছুটছেন সুন্দরবনের নানা জায়গায়। ফলে ক্যামেরার লেন্সও এখন সেদিকেই।
সুন্দরবন বলতে আমরা মোটামুটি যে জনপদকে চিনি তার বাইরে আছে আর এক বৃহত্তর জনপদ। দেগঙ্গা, বালান্ডা, ভাঙ্গড়, হাড়োয়া নিয়ে এই জনপদের প্রাচীন নাম ছিল বারগোপপুর। তার কাছাকাছিই চন্দ্রকেতুগড়। অবিভক্ত বাংলার ঐতিহাসিক জনপদ। হাড়োয়ার পীর গোরাচাঁদ আজও প্রবল জীবন্ত হয়ে সব সম্প্রদায়ের জনমনে রয়ে গেছেন। এখনো গ্রামে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে অলস দুপুরে আপনি শুনতে পারবেন আলখাল্লা গায়ে ফকির চিৎকার করে বলে উঠছেন, ‘পীর গোরাচাঁদ মুশকিল আসান।’
বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নারকোলবেড়িয়াও কিন্তু কাছেই। গানে গল্পে কথকতায় বেঁচে আছেন তিতুমীরও। এই সুন্দরবন সংলগ্ন বিশাল এলাকা জেগে ওঠে চাঁদ রাতে ও ঈদের ভোরে। এলিট পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মুসলিম ও নিম্নবর্গের হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকার কথা অনেকে জানেন না, জানতেও চান না। আম্পান বিপর্যয় এইসব ঐতিহ্যের ভূগোলকে এক্কেবারে তছনছ করে দিয়েছে। শঙ্করপুর, নজরনগর, অখণ্ডবেড়িয়া, বকজুড়ি, মাজনপুর গ্রামের পর গ্রামে এখনো সব জায়গায় আলো নেই। মূলত কৃষি ও মাছের ভেড়িকেন্দ্রিক অর্থনীতির পুরো চালিকাশক্তিই সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে। হাড়োয়ার কাছে স্রেফ সোনাইপুকুর ও শঙ্করপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে দেড় লাখ লোকের বাস। তাদের বড় অংশই আজ আক্ষরিক অর্থে পথের ভিখারি হয়ে গেছে। পুরো ঘর ভেঙে গেছে যাদের তাদের জন্য সরকারের বরাদ্দ হাজার কুড়ি টাকা। সুন্দরবনের মূল অংশে যেটুকু যা রিলিফ যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেগঙ্গা হাড়োয়ার নিরন্ন জনতার সেটুকুও জুটছে না। ফলে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হলেও সুরাহার কোনো আশা এই মুহূর্তে অন্তত দেখতে পাচ্ছি না।
এ যদি হয় পশ্চিমবঙ্গের কৃষিনির্ভর এলাকার এক টুকরো ছবি, পাশাপাশি আর এক আখ্যানের চালচিত্র দেখতে যেতে হবে আর এক ঐতিহাসিক জনপদে। যে জনপদের ‘কুখ্যাতি’ কলকাতার এলিট সংখ্যাগুরু সমাজে কান পাতলেই শুনতে পাবেন। মেটেবুরুজ, মহেশতলা, আক্রা, চটা, নুঙ্গি, সন্তোষপুর ও শিল্পসমৃদ্ধ বাটানগর। মেটেবুরুজের খ্যাতি আওধের নবাব ওয়াজিদ আলী শার কলকাতায় আসার পর থেকে। আর বাটা কোম্পানির কারণে বাটানগর। কিন্তু এখন এই মেটেবুরুজ ও বাটানগরের মধ্যে বিস্তৃত বিপুল এলাকার জনগণের মূল রোজগার পোশাক শিল্পের দৌলতে। মেটেবুরুজের দর্জিশিল্পের খ্যাতি এখন পৃথিবী জুড়ে। রবিবারে এখানে যে হাট বসে সেখানে একদিনেই কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। দর্জিদের অধিকাংশই মুসলিম হলেও বিরাট এই জনপদে হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বসবাস দীর্ঘদিন ধরেই। মোটের ওপর শান্তিতেই। মেটেবুরুজের কিছু এলাকায় অবাঙালি মুসলমানের বাস থাকলেও আক্রা, চটা, নুঙ্গি ও আশপাশের এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজনই বাঙালি।
কয়েক লাখ মানুষ যে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তা আজও পুরোপুরি অসংগঠিত। অর্থনৈতিক বৈষম্যও প্রবল। মালিক কোটিপতি কিন্তু তার কর্মচারীদের পেটে ভাত নেই। অথচ গত তিরিশ বছর ধরে এই অঞ্চলে নানা কারণে বাড়বাড়ন্ত হয়েছে এই পোশাক শিল্পের। তার আগে মেটেবুরুজ বাদ দিলে আক্রা চটা নুঙ্গি সন্তোষপুর সর্বত্রই অর্থনীতির উৎস ছিল বাটা কোম্পানি-কেন্দ্রিক। বাটা মহেশতলা তখনো গ্রাম। লোকসংখ্যা খুব কম। এ কথা বলছি দেশভাগের আগে। জনসংখ্যা বাড়তে লাগল স্বাধীনতার পর থেকে। বাটার রমরমা কমতে লাগল নানা কারণে। তার পর থেকেই মানুষ বেঁচে থাকতে আঁকড়ে ধরল এই পোশাক শিল্পকে। কেউ জামা বানায়। কেউ আবার বোতাম সেলাই করে-অজস্র ধরনের কাজ। আয় সপ্তাহে মোটামুটি আটশ থেকে পনের শো। কিন্তু সাম্প্রতিক এদেশের অর্থনীতিতে যে মন্দা তার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে বিরাট এই কলকাতার প্রান্তিক জনপদে। নোট বাতিল, জিএসটি’র পরে যেটুকু যা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল লকডাউন এসে তা আধমরা করে দিল। আর পুরো মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেল এই আম্পান ঝড়ের পর। প্রাণবন্ত জনপদে এখন শুধুই হাহাকার।
কিন্তু কোনো আখ্যানের শেষে শুধুই হতাশা নয়। বেঁচে থাকে হার না মানা লড়াইয়ের কাহিনীও। যে কাহিনী বর্ণময় রূপকথার মতো। সকাল থেকে রাত আপনি ঘুরে বেড়ান মেটেবুরুজের রাস্তায়, কিংবা আক্রা মহেশতলার নিশ্চিন্তপুর, কাজিপাড়া, মোল্লাপাড়া, আক্রা ডাকঘরের আশপাশে। দেখবেন বিধ্বস্ত মানুষের পাশে একদল স্বপ্ন দেখা তরুণ নীরবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভালোবাসার। প্রচারের অনেক দূরে থাকা ওই তরুণরাই এই অন্ধকারে আলো দেখায়। ওরাই ভবিষ্যৎ, আগামীর সম্ভাবনা ।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
