করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনীতির অবস্থা এখন নাজুক। সব হিসাবনিকাশ ওলটপালট হয়ে গেছে। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। সহসা আসছে না নতুন কোনো বিনিয়োগ। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে ফের চাঙ্গা করতে আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট ট্যাক্স কমানোর ঘোষণা আসছে। তবে তা ঢালাওভাবে সব খাতে নয়, শুধু উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে জড়িত পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত শিল্পে এ ট্যাক্স কমানো হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে নানামুখী পদক্ষেপ থাকবে। যেমন কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ প্রসারিত করা হবে। আবাসন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কের পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য আসছে একগুচ্ছ সুখবর। এ ক্ষেত্রে করপোরেট কর কমানো, বিনিয়োগ চাঙ্গা করা, রপ্তানিতে প্রণোদনা, আমদানি শুল্ক ছাড়সহ নানা সুবিধা রাখা হচ্ছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় এসব বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৫ বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির ট্যাক্স হার ৩৫ শতাংশ বহাল আছে। এরপর তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও কয়েক দফায় ব্যাংকের করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়। কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির ট্যাক্স কমানো হয়নি। এবার উৎপাদনশীল খাতের কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানো হতে পারে।
বর্তমানে করপোরেট করের কয়েকটি স্তর রয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ। তালিকাবহির্ভূত বা সাধারণ কোম্পানির করহার ৩৫ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪০ শতাংশ। মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। সিগারেট কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ। মোবাইল অপারেটরে ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর বিদ্যমান রয়েছে। এ ছাড়া পোশাক খাতে করপোরেট কর ১০-১২ শতাংশ। বস্ত্র খাতে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ, পাটকলে ১০ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু দুটি স্তরে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করহার কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে এ করহার ৩৫ শতাংশ। নতুন বাজেটে তা ৩২ শতাংশ করা হতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে করপোরেট করহার কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে করপোরেট কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামীতে এটি ৩৫ শতাংশ করা হতে পারে। এ ছাড়া নতুন বাজেটে আয়করে ছাড় আসতে পারে। বর্তমানে সর্বনিম্ন করহার ১০ শতাংশ। এটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের করপোরেট করহার অনেক বেশি। পুঁজিবাজারে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার অনেক বেশি আছে। এটি কমানো যেতে পারে। তবে করপোরেট কর কমালেই হবে না, অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত এবং ‘ইজ অব ডুয়িং’ বিজনেসে উন্নতি করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে গতানুগতিক প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শুধু প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় না। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। সেটি করতে হবে।
গত ৬ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা এখনো বহাল আছে। এরপরের অর্থবছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের ট্যাক্স আড়াই শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ ও সিগারেট খাতে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হয়। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও বহির্ভূত ব্যাংকের করপোরেট ট্যাক্স আরও আড়াই শতাংশ কমিয়ে যথাক্রমে সাড়ে ৩৭ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ করা হয়।
আগামী বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ও অঞ্চলে বিনিয়োগে কর ছাড় দেওয়া হবে। বর্তমানে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে কর ছাড় রয়েছে। আগামী বাজেটেও তা অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে শিল্প ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। বিদ্যমান করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যায়। আবাসন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে এ সুযোগ নেওয়া যায়। আসন্ন বাজেটে ক্ষেত্রবিশেষে জরিমানা উঠিয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যাবে। এনবিআর আর কোনো প্রশ্ন করবে না। আগামী দুই বছরের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হতে পারে। পুঁজিবাজারসহ কয়েকটি খাতে এ সুযোগ দেওয়া হতে পারে। মূলত বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে গার্মেন্ট সেক্টরে চার ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়ে থাকে। এটি যথাক্রমে চার, চার এবং দুই শতাংশ। ইউরোপ ও আমেরিকায় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। এটি বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে। আগামী বাজেটে ওষুধ খাতেও রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে ওষুধ খাত ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পায়। আগামী বাজেটে এটি বাড়িয়ে ১১-১২ শতাংশ করা হতে পারে। মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং অপারেশনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ওষুধ খাতের মতোই প্রণোদনা পাবে। এ ছাড়া চামড়া, পাদুকা, পাটসহ অন্যান্য শিল্পও একই ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই রপ্তানি খাতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হতে পারে।
